Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

সোলাইমানির বন্ধু আয়াতুল্লাহ খামেনির জীবন কেমন ছিল?

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৬, ০৩:৪৯ পিএম

সোলাইমানির বন্ধু আয়াতুল্লাহ খামেনির জীবন কেমন ছিল?

কাসেম সোলাইমানি ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত তেহরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিল খামেনির। তার জীবনটাই ছিল ঘটনাবহুল ও সংগ্রামমুখর। 

১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের মাশহাদ শহরে এক ধর্মীয় পণ্ডিতের ঘরে জন্ম নেওয়া আলী খামেনি নিজ শহরের ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্রে পড়াশোনা করেন, পরে যান শিয়া মুসলিমদের পবিত্র নগরী কোমে।

১৯৬২ সালে তিনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধাচরণকারী আয়াতুল্লাহ খোমেনির ধর্মীয় আন্দোলনে যোগ দেন।

তরুণ আলী খামেনি খোমেনির একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হয়ে ওঠেন। তার নিজের ভাষায়, তিনি যা করেছেন এবং এখন যা বিশ্বাস করেন, সবই খোমেনির ইসলামী ভাবধারা থেকে প্রাপ্ত।

আলী খামেনি শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং বেশ কয়েকবার গ্রেফতারও হয়েছিলেন।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর, আলী খামেনি বিপ্লবী পরিষদে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হন এবং ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরকে সংগঠিত করতে সহায়তাও করেন। এই বিপ্লবী গার্ড ইরানের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৯৮১ সালের জুন মাসে, তেহরানের একটি মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন। তার ওপর ওই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল দেশটির বামপন্থি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর। এই ঘটনায় তার ডান হাত পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

দুই মাস পর, একই বিদ্রোহী গোষ্ঠী ইরানের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ-আলী রাজাইকে হত্যা করে।

রাজাইয়ের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি হিসেবে আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। আট বছর ধরে আনুষ্ঠানিক এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তিনি।

ওই সময় তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মির হোসেইন মুসাভির সঙ্গে নানা মতবিরোধে জড়ান। কারণ তিনি মনে করতেন, মুসাভি ইরানের ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সংস্কার আনতে চাইছেন।

সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত 

১৯৮৯ সালের জুনে খোমেনির মৃত্যুর পর বিশেষজ্ঞ পরিষদ (ধর্মীয় আলেমদের একটি পরিষদ) আলী খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে। যদিও তিনি সংবিধানে নির্ধারিত শিয়া ধর্মগুরুদের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদমর্যাদা বা 'গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ' উপাধি অর্জন করতে পারেননি।

পরে ইরানের সংবিধানে সংশোধন আনা হয়। সংশোধনীতে বলা হয়েছিল যে, সর্বোচ্চ নেতাকে ইসলামী পাণ্ডিত্য অর্জন করতে হবে এবং আলী খামেনি নির্বাচিত হতে পারবেন। পরে রাতারাতি তাকে হোজ্জাতুল ইসলাম থেকে আয়াতুল্লাহ পদে উন্নীত করা হয়েছিল।

ইরানের সংবিধানে তখন আরও একটি পরিবর্তন আনা হয়। প্রধানমন্ত্রী পদ বাতিল করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির হাতে অধিক ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। ইরানের সংবিধানও পরিবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত করে রাষ্ট্রপতির হাতে বৃহত্তর কর্তৃত্ব ন্যস্ত করা হয়েছিল।

নিজের শাসনামলে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ ছয়জন প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব পালন করেন। যাদের অনেকেই খামেনির কর্তৃত্বকে কিছুটা চ্যালেঞ্জ করলেও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেননি।

১৯৯৭ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন সংস্কারপন্থি নেতা মোহাম্মদ খাতামি। খাতামি পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন।

খাতামি প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও তখন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

খাতামির পরে তার উত্তরসূরি হিসেবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন রক্ষণশীল নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। আহমাদিনেজাদকে কেউ কেউ আয়াতুল্লাহ খামেনির অনুসারী মনে করতেন।কিন্তু অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতি নিয়ে আহমাদিনেজাদ সরকারের অবস্থান তখন ইরানে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। একই সাথে আহমাদিনেজাদ নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির চেষ্টা করলে সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সঙ্গে তার বিরোধিতা হয়।

সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা

২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদের বিতর্কিত পুনঃ-নির্বাচন ইরানে ইসলামি বিপ্লবের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলনের জন্ম দেয়। সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ওই নির্বাচনের ফলাফল বৈধ বলে ঘোষণা দেন এবং তীব্র আন্দোলন দমনে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন। এই দমন অভিযানে অনেক বিরোধী কর্মী নিহত হন, গ্রেফতার হন হাজার হাজার মানুষ।

২০১৩ সালে ইরানের উদারপন্থি নেতা হাসান রুহানি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং বিশ্বশক্তিগুলোর সাথে ঐতিহাসিক পরমাণু চুক্তি করেন। এই চুক্তি খামেনির সম্মতিতেই সম্পন্ন হয়। তবে রুহানির নাগরিক অধিকার প্রসার ও অর্থনৈতিক সংস্কার উদ্যোগে বাধা দেন সর্বোচ্চ নেতা খামেনি।

২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে ইরানের ওপর আবারও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে সাধারণ ইরানিদের অর্থনৈতিক দুর্দশা আরও বাড়তে শুরু করে। রুহানি সেই চাপ সামলাতে ব্যর্থ হন এবং ২০১৯ সালের নভেম্বরে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়।

২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকের মাটিতে একটি ড্রোন হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে। সোলেইমানি আয়াতুল্লাহ খামেনির ঘনিষ্ঠ মিত্র ও ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন।

এই হামলার পর খামেনি সোলেইমানি হত্যার প্রতিশোধের ঘোষণা দেন। ইরাকের দুটি মার্কিন ঘাটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইরান। পরে তিনি বলেছিলেন, ইরাকে অবস্থিত দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের প্রতিশোধমূলক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল 'আমেরিকার গালে চপেটাঘাত'।

খামেনি তখন জোর দিয়ে বলেছিলেন, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়।

শীর্ষ নেতা হিসেবে আয়াতুল্লাহ খামেনি বহুবারই ইসরাইল রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০১৮ সালে তিনি ইসরাইলকে 'একটি ক্যানসার আক্রান্ত টিউমার' আখ্যা দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইসরাইলকে মুছে ফেলার ফেলার হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

তিনি প্রকাশ্যে হলোকাস্ট বা 'ইহুদি গণহত্যা' আদৌ ঘটেছিল কি-না, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

২০১৪ সালে তার টুইটার অ্যাকাউন্টে উদ্ধৃত একটি বার্তায় বলা হয়েছিল, 'হলোকাস্ট এমন এক ঘটনা যার বাস্তবতা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে, আর যদি ঘটেও থাকে, সেটা কীভাবে ঘটেছিল, তাও স্পষ্ট নয়।'

২০২০ সালে, আয়াতুল্লাহ খামেনি এবং ইরানের সরকার দুটি বড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল।

প্রথম সংকটটি শুরু হয় ওই বছর ৮ জানুয়ারি। তখন ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ভুল করে ইউক্রেন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্সের একটি যাত্রীবাহী বিমান তেহরানের কাছে ভূপাতিত করে। এতে বিমানে থাকা ১৭৬ জন যাত্রীর সবাই নিহত হন। যাদের অনেকেই ছিলেন ইরানি নাগরিক।

ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার ফলে ইরানের ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কট্টরপন্থী সংবাদপত্রগুলি তার পদত্যাগের দাবি জানায় এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভের নতুন ঢেউ ওঠে দেশটিতে।

সেসময় ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করতে গুলির ব্যবহারও করে বলে অভিযোগ ছিল।

সে সময় শুক্রবারের জুমার নামাজের বিরল এক খুতবায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেন, বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় তিনি মর্মাহত। 

তবে তিনি তখন সামরিক বাহিনীর পক্ষই নিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইরানের শত্রুরা এই ট্র্যাজেডিকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। 

আর দ্বিতীয় হচ্ছে, ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে, ইরানে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ছড়িয়ে পড়ে।

আয়াতুল্লাহ খামেনি প্রথমে করোনাভাইরাসের হুমকিকে খাটো করে দেখেছিলেন, বলেছিলেন যে ইরানের শত্রুরা এটিকে ভয় দেখানোর কৌশল হিসেবে অতিরঞ্জিত করছে।

Advertisement

Advertisement

ঘটনাপ্রবাহ: ইরান-ইসরাইল সংঘাত


আরও পড়ুন

সম্পর্কিত খবর

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সিনেটর

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সিনেটর

ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি বৈঠক

ক্যাম্প ডেভিডে ট্রাম্প প্রশাসনের জরুরি বৈঠক

ইরান ঘিরে আরও তিন রণতরিসহ ২০০০ সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

ইরান ঘিরে আরও তিন রণতরিসহ ২০০০ সেনা পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

হরমুজ থেকে ৫০০ কিমি দূরে সরে গেছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বহর: ইরান

হরমুজ থেকে ৫০০ কিমি দূরে সরে গেছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বহর: ইরান

নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বললেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী

নেতানিয়াহুকে ‘যুদ্ধাপরাধী’ বললেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী

যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

যুদ্ধ বন্ধে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

আরও পড়ুন

বন্ধুত্ব থেকে বৈরিতা, যেভাবে বদলে গেল ইমরান-নওয়াজের সম্পর্ক

বন্ধুত্ব থেকে বৈরিতা, যেভাবে বদলে গেল ইমরান-নওয়াজের সম্পর্ক

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তোলপাড় পাকিস্তান, প্রদেশ ভাঙার নতুন চাল সেনাপ্রধানের

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তোলপাড় পাকিস্তান, প্রদেশ ভাঙার নতুন চাল সেনাপ্রধানের

বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, অংশ নিয়েছেন প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষার্থী

বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, অংশ নিয়েছেন প্রায় ৯০ হাজার শিক্ষার্থী

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলায় ১১ ভারতীয় আহত

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলায় ১১ ভারতীয় আহত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম