Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

দাবানলের ভয়াল থাবায় ফ্রান্স, নিয়ন্ত্রণে প্রাণপণ লড়াই

Icon

হাসান ইলিয়াছ তানিম, প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৯:১০ পিএম

দাবানলের ভয়াল থাবায় ফ্রান্স, নিয়ন্ত্রণে প্রাণপণ লড়াই

ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল দিন যত গড়াচ্ছে, ততই ভয়ংকর হয়ে উঠছে পরিস্থিতি। স্পেন সীমান্তসংলগ্ন পিরেনিজ-ওরিয়ঁতাল অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে জ্বলতে থাকা আগুন সোমবার আরও বিস্তৃত হয়েছে। 

তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং ঘণ্টায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার বেগে বইতে থাকা দমকা বাতাস আগুনকে মুহূর্তেই এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। এতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়েছে। প্রশাসনের আশঙ্কা, আবহাওয়া অনুকূলে না এলে আরও এলাকা খালি করতে হতে পারে।

আগুনের লেলিহান শিখায় ইতোমধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৬০০ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে। পাহাড়ঘেরা বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কোথাও আগুন গাছের মগডাল ছুঁয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, কোথাও আবার ধোঁয়ার ঘন চাদরে ঢেকে যাচ্ছে পুরো জনপদ। দিনের বেলাতেও অনেক এলাকায় সূর্যের আলো ম্লান হয়ে পড়েছে। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বেড়েছে, বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগীদের জন্য।

হঠাৎ করেই আগুন জনবসতির কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জরুরি সতর্কবার্তা জারি হওয়ার পর অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ওষুধ ও সামান্য কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশে রওনা হয়। কেউ নিজের পোষা প্রাণীকে সঙ্গে নিতে পেরেছেন, আবার কেউ শেষ মুহূর্তে সবকিছু ফেলে শুধু জীবন বাঁচাতেই ছুটেছেন। অনেক পরিবারকে স্কুল, ক্রীড়া কমপ্লেক্স ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। ৭৫০ জনের বেশি দমকলকর্মী, প্রায় ২০০টি অগ্নিনির্বাপণ যান, ৯টি পানিবাহী বিমান এবং একাধিক হেলিকপ্টার আগুন নেভানোর কাজে নিয়োজিত রয়েছে। কিন্তু প্রবল বাতাসের কারণে একদিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও অন্যদিকে নতুন করে আগুন ছড়িয়ে পড়ছে। এতে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ বলেছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আবহাওয়া অনুকূলে না আসা পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে। তিনি জানান, মানুষের জীবন রক্ষাই এখন সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও জরুরি সেবাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে এবং বনাঞ্চলে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

দাবানলের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাইক্লিং প্রতিযোগিতা ট্যুর দে ফ্রান্স-এও। নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিযোগিতার একটি স্টেজের ফিনিশিং এলাকায় দর্শকদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছে। আয়োজকরা জানিয়েছেন, জরুরি উদ্ধারকাজ ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপে তাপপ্রবাহ ও খরার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে বনাঞ্চল অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে পড়ছে এবং সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গ থেকেও বড় ধরনের দাবানল সৃষ্টি হচ্ছে। 

চলতি বছর ফ্রান্সে দাবানলের মৌসুমও স্বাভাবিক সময়ের আগেই শুরু হয়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের আরেকটি সতর্ক সংকেত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফরাসি আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা নেই। ফলে আগুনের বিস্তার পুরোপুরি থামাতে আরও সময় লাগতে পারে। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আগুনের বিস্তার রোধ করা এবং বনাঞ্চল রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ফরাসি প্রশাসন।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .