বিক্ষোভে অগ্নিগর্ভ ফ্রান্স
প্যারিসে আন্দোলনকারীর মৃত্যুতে উত্তেজনা
Advertisement
হাসান ইলিয়াছ তানিম, প্যারিস (ফ্রান্স) থেকে
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফ্রান্সজুড়ে আজ নতুন বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সংঘাত এড়াতে দেশটির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এ অবস্থায় শুক্রবার প্যারিসের কাছে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলাকালে এক আন্দোলনকারী নিহত হন। এ ঘটনায় দেশটিতে উত্তেজনা আরও বাড়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় আজ ফ্রান্সজুড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ৭০ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হবে।
জীবনযাত্রার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয়বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশছোঁয়া দাম ও শিক্ষাব্যবস্থাসহ সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্সে এ বিক্ষোভ চলছে। গত সপ্তাহান্তে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠার জেরে আজ বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার। কিন্তু তাতেও থামেনি বিক্ষোভ। প্যারিসের কেন্দ্রস্থলে পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ জনতার মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পালটাধাওয়ার মাঝে এক বিক্ষোভকারী মারা যান। প্যারিস পুলিশ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, মৃত ব্যক্তি সরাসরি পুলিশের সঙ্গে হাতাহাতি বা সহিংসতার চোটে মারা যাননি। আন্দোলন চলাকালে জলকামান, টিয়ারশেল ও ধোঁয়ার মধ্যে তীব্র উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) হন। রাজপথে হঠাৎ ঢলে পড়ার পর উদ্ধারকারীরা তাৎক্ষণিক চিকিৎসার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো যায়নি।
এ ঘটনা নিয়ে প্যারিস প্রসিকিউটর কার্যালয় থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের একাংশের দাবি, রাজপথে পুলিশের অতিরিক্ত কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ফলে সৃষ্ট ধোঁয়াশা ও আতঙ্কের কারণেই ওই ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হন।
সংঘর্ষ, ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যাপক গ্রেফতার : গত কয়েকদিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দেশটির বিভিন্ন শহর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনকারীরা কয়েক জায়গায় ব্যাংক, গাড়ি ও বিভিন্ন সুপারমার্কেটে হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করে। বিশেষ করে লিমোজে শহরের ঐতিহ্যবাহী টাউন হলে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সহিংসতায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে এ পর্যন্ত সারা দেশ থেকে প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করেছে ফরাসি স্বরাষ্ট্র বিভাগ। অন্যদিকে আন্দোলনকারীদের দমনে গিয়ে এবং সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে প্রায় ১০০০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।
সেনা মোতায়েন ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা : আজ আন্দোলনকারীরা আবার বড় ধরনের মহাসমাবেশ ও সড়ক অবরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ বিক্ষোভ প্রতিহত করতে ফরাসি সরকার সম্পূর্ণ নজিরবিহীন সামরিক ও রাজনৈতিক কৌশল হাতে নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, শনিবার সারা দেশে প্রায় ৭০ হাজার সশস্ত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে। স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, জাতীয় সংসদ, বিমানবন্দর এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলোর সুরক্ষায় সেনাবাহিনীকেও রাজপথে নামানো হয়েছে। আকাশে ড্রোন ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে সহিংসতার ঝুঁকি থাকা একাধিক প্রধান শহরে রাতে কারফিউ জারি করা হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা ও আন্দোলনকারীদের অবস্থান : সরকারের স্পষ্ট পরিকল্পনা হলো, তারা আর কোনো ধরনের ভাঙচুর বা অগ্নিসংযোগ সহ্য করবে না। সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সীমিত আলোচনার বার্তা দিলেও রাজপথে যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে সঙ্গে সঙ্গে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করবে এবং টিয়ারশেল, জলকামান ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করে ভিড় ছত্রভঙ্গ করে দেবে। অন্যদিকে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ নাগরিকদের সমন্বয়ে গঠিত আন্দোলনকারী জোট পিছু হটতে নারাজ। তাদের দাবি, অর্থনৈতিক সংস্কারের বাস্তব পদক্ষেপ না পাওয়া পর্যন্ত রাজপথে তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই চলবে। সরকারের এই কঠোর অবস্থান এবং আন্দোলনকারীদের কঠোর জেদের কারণে আজ ফ্রান্সজুড়ে চরম অস্থিরতার শঙ্কা রয়েছে।
