ফ্রান্সের বিক্ষোভ আলোচনায় ‘বিসমিল্লাহ’ যেভাবে এলো
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সমর্থনে গত সপ্তাহে রাস্তায় নেমে আসেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। বিক্ষোভের সময় অনেকের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় ব্যতিক্রমী একটি স্লোগান—‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশেলে তৈরি এই বাক্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আরবি শব্দ ‘বিসমিল্লাহ’র অর্থ ‘আল্লাহর নামে শুরু’, অন্যদিকে ফরাসি বাক্যাংশ ‘সে লে তেনেব্র’ বলতে বোঝায় ‘এটি অন্ধকার’। দুটি ভিন্ন ভাষার শব্দ মিলিয়ে তৈরি হওয়া স্লোগানটির সরাসরি অর্থ খুব একটা স্পষ্ট নয়। তবে এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ব্যঙ্গ, প্রজন্মগত দূরত্ব এবং পুলিশের নজরদারি নিয়ে তরুণদের ক্ষোভ।
গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ঘাটতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ শুরু হয়। পরে সেই আন্দোলন বড় আকার ধারণ করে এবং একপর্যায়ে সহিংসতায় রূপ নেয়। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত তরুণদের মধ্যে আলোচিত স্লোগানটি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের দূরত্ব প্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।
যেভাবে স্লোগানটির উৎপত্তি
ধারণা করা হচ্ছে, স্ন্যাপচ্যাটে পাঠানো একটি বার্তা থেকেই এই স্লোগানের সূত্রপাত। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে ঢোকার চেষ্টা চলার সময় বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়।
বার্তার শুরুতে ছিল ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ বাক্যটি। ফ্রান্সের তরুণদের মধ্যে প্রচলিত আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্র কথ্যরীতির অনুকরণে এটি লেখা হয়েছিল বলে মনে করা হচ্ছে। এরপর বার্তায় বলা হয়, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব।’
মামাদৌ ও আবদুল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে একই ধরনের বার্তা একাধিকবার পাঠানো হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
বার্তাগুলোর ভাষা ও উপস্থাপনাকে অনেক স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারকারী হাস্যকর মনে করেন। তারা বার্তাগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। তবে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গের হাতিয়ার
অনেক তরুণের ধারণা, বার্তাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাঠানো হতে পারে। তাদের সন্দেহ, আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের জায়গায় প্রবেশ করে আন্দোলনের পরিকল্পনা জানার চেষ্টা করা হচ্ছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।
এরপর বিক্ষোভকারীরা বাক্যটিকে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগান হিসেবে গ্রহণ করেন। তাদের মতে, আন্দোলনের মধ্যে অনুপ্রবেশের চেষ্টা কিংবা তরুণদের সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের ধারণাকে উপহাস করার মাধ্যম হয়ে উঠেছে এটি।
ফ্রান্সে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের বিষয়টিও এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ, আরব বংশোদ্ভূত এবং সাবেক ফরাসি উপনিবেশগুলোর অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের অনেকে মনে করেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য ও পক্ষপাতের শিকার হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, নতুন বার্তাগুলোও তরুণদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর প্রবণতা প্রকাশ করে।
অন্যদিকে, ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বার্তাগুলো তাদের কোনো কর্মকর্তা পাঠিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা শনাক্ত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা কখনো কখনো অনলাইনে ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করেন।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, তদন্তকারী কর্মকর্তারা ছদ্মনাম ব্যবহার করে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের যোগাযোগ শনাক্ত ও সংরক্ষণ করতে পারেন। পরবর্তী সময়ে এসব তথ্য আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করা হতে পারে।
কেন তরুণদের মধ্যে এত জনপ্রিয় হলো স্লোগানটি?
আন্দোলনকারীদের কাছে বাক্যটি শুধু একটি মজার কথা নয়; বরং এটি তরুণ প্রজন্ম ও সরকারের মধ্যে দূরত্বের প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের দাবি যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। একই সঙ্গে আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের সরকারি প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও তারা ব্যঙ্গ প্রকাশ করছেন।
ফ্রান্সের একটি প্রভাবশালী শিক্ষার্থী ইউনিয়নের মুখপাত্র সাবরিন খারবাচ বলেন, তরুণেরা সাধারণত এভাবে কথা বলেন না। তার মতে, স্লোগানটিকে নিজেদের করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে তরুণেরা বোঝাতে চেয়েছেন, তাদের আন্দোলনে নজরদারি বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা তারা বুঝতে পারছেন এবং তা সত্ত্বেও নিজেদের সংগঠিত রাখতে সক্ষম।
বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদির মতে, স্ন্যাপচ্যাটের বার্তাগুলো কর্তৃপক্ষের পূর্বধারণা বা পক্ষপাতের বিষয়টি সামনে এনেছে। তার বক্তব্য, কারা ব্যারিকেড তৈরি করছে কিংবা কারা ভাঙচুর করতে পারে—এমন ধারণা যেন আগেই করে নেওয়া হয়েছিল।
প্যারিসের এক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফেদ্রে কেমেনও স্লোগানটিকে তরুণদের নিয়ে তৈরি একটি ব্যঙ্গাত্মক কৌতুক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, বাক্যটি তরুণদের ভাষা ও আচরণকে অনুকরণ করার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টার মতো শোনায়।
কেমেন আরও বলেন, স্লোগানটিকে অনেকে বর্ণবাদের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। কারণ, এর মাধ্যমে এমন একটি ধারণা তৈরি হতে পারে যে ভাঙচুর বা সহিংসতার সঙ্গে আরব বংশোদ্ভূত তরুণেরাই জড়িত।
ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে স্লোগান
ফ্রান্সে জনপ্রিয় হওয়ার পর ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি বেলজিয়াম ও জার্মানির অনুরূপ বিক্ষোভেও ব্যবহার করা হয়েছে।
সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বাক্যটি উচ্চারণ করেন। ভিডিওতে তিনি জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের আরও কিছু পরিচিত অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করেন। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ‘সিক্স-সেভেন’ মিমের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অঙ্গভঙ্গিও ছিল।
স্লোগানটির জনপ্রিয়তার সঙ্গে ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলন’-এর হাস্যরসেরও কিছু মিল রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলনের সময় একটি ব্যঙ্গাত্মক শব্দকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ করে নিয়েছিলেন। ভারতের প্রধান বিচারপতির তরুণ ও বেকারদের নিয়ে করা বিতর্কিত মন্তব্যের পর সেই শব্দকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদের একটি ধারা তৈরি হয়।
