Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

ইন্ডিয়া টুডের বিশ্লেষণ

জেন-জির ক্ষোভে উত্তাল ইউরোপ, তবে কি আসছে নতুন ‘আরব বসন্ত’?

Advertisement

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০১:০৮ পিএম

জেন-জির ক্ষোভে উত্তাল ইউরোপ, তবে কি আসছে নতুন ‘আরব বসন্ত’?

বিক্ষোভস্থলে ফ্রান্সের পতাকা হাতে এক বিক্ষোভকারী। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

শিক্ষার সংকট, আকাশছোঁয়া বাড়িভাড়া, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠেছে ইউরোপের তরুণ প্রজন্ম। ফ্রান্স থেকে ইতালি, স্পেন থেকে আলবেনিয়া—বিভিন্ন দেশে রাজপথে নেমেছেন হাজারো মানুষ। কোথাও বিক্ষোভ গড়িয়েছে সংঘর্ষে, কোথাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে দখল ও ধর্মঘট। আর এসব আন্দোলনকে ঘিরে উঠেছে এক বড় প্রশ্ন—ইউরোপ কি নতুন কোনো ‘আরব বসন্তের’ মুখোমুখি?

বিশ্বজুড়ে যখন যুদ্ধ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও রাজনৈতিক বিভাজন মানুষের জীবনকে অস্থির করে তুলছে, তখন ইউরোপের রাজপথেও দেখা দিয়েছে নতুন অস্থিরতা। ফ্রান্সের প্যারিস থেকে ইতালির মিলান, স্পেনের মাদ্রিদ থেকে আলবেনিয়ার তিরানা—বিভিন্ন শহরে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে তরুণেরা।

কোথাও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থা ও বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদ, কোথাও বাড়িভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ। আবার কোথাও বেকারত্ব, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর আস্থাহীনতা মানুষকে রাজপথে নামিয়েছে। ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম ও আলবেনিয়ায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন অধিকারকর্মীদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে।

ইউরোপের অন্তত ৯টি দেশে বিক্ষোভ ও ছাত্র আন্দোলনের এই বিস্তার অনেককে মনে করিয়ে দিচ্ছে ২০১০ সালের শেষ দিকে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া ‘আরব বসন্তের’ কথা। সেই আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছিল মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। পতন ঘটেছিল দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা একাধিক শাসকের।

তবে ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি আরব বসন্তের সঙ্গে মেলাতে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের কারণ ও দাবি এক নয়। আরব বসন্তের সময় বহু দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটানো ছিল আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ্য। ইউরোপের বর্তমান বিক্ষোভগুলো হচ্ছে মূলত প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে, যেখানে আন্দোলনকারীদের বড় অংশ রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুরোপুরি উলটে দেওয়ার বদলে সংস্কার ও জবাবদিহি চাইছেন।

ফ্রান্স থেকে ছড়াচ্ছে প্রতিবাদের ঢেউ

ইউরোপের বর্তমান অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফ্রান্স। গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবরের সপ্তাহান্তে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভে অংশ নেন কয়েক লাখ মানুষ। কোথাও মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিস, মার্সেই, লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের খবর পাওয়া যায়।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের দেওয়া তথ্যমতে, গত ১৭ অক্টোবর দেশজুড়ে ১১০টি বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। তবে আন্দোলনকারীদের আয়োজকেরা অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা আট লাখ বলে দাবি করেন। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। 

এই আন্দোলনের সূত্রপাত আরও আগে। গত ২১ সেপ্টেম্বর ক্রেতেই শহরের লিসে সাঁ-একজুপেরি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, জরাজীর্ণ ভবন ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী নিয়ে গাদাগাদি করে ক্লাস করার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামেন। পরে সেই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ট্রেড ইউনিয়ন এবং মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ।


ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে একে ‘বেপরোয়া’ বলে অভিহিত করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ফরাসিরা কীভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে এমন করতে পারে?’

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশটিতে অভিবাসন নিয়েও রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভকে অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করে মন্তব্য করেন। তার ভাষায়, ‘এটি স্কুল নিয়ে নয়, বরং ইসলাম একটি একসময় মহান দেশকে দখল করতে চাইছে।’

ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থি নেত্রী মেরিন লে পেনও কয়েক দশকের অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনকে বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী করেছেন।

এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন ও নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং প্যারিসের এইচইসি বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে বলেন, ‘ফ্রান্স এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। এখন এর প্রভাব ফ্রান্সের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।’


তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সব দেশের আন্দোলনকে একটিমাত্র আন্দোলন হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বিভিন্ন দেশে আলাদা আলাদা কারণে বিক্ষোভ হচ্ছে। কিন্তু শিক্ষায় অপর্যাপ্ত অর্থায়ন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার মতো কিছু বিষয়ে তাদের মধ্যে মিল রয়েছে।

ইতালি ও বেলজিয়ামে সংঘর্ষ, শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালিতেও শিক্ষার্থীরা ১৬ অক্টোবর রাজপথে নামেন। শিক্ষা খাতে অর্থায়ন, সামরিক ব্যয় এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির প্রতিবাদে তুরিন ও রোমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দখল করেন কিছু শিক্ষার্থী। ফরাসি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কৌশল অনুসরণ করেই তারা বিদ্যালয় দখলের পথ বেছে নেন।

ইতালিতে ১৬ অক্টোবরের ‘নো মেলোনি ডে’ বা ‘মেলোনি নয় দিবস’-এর বিক্ষোভে শিক্ষার্থীরা বিদেশি শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ভর্তির ওপর প্রস্তাবিত সীমার প্রতিবাদ জানান। তাদের স্লোগান ছিল, ‘আ স্কুলা নেসুনো এ স্ত্রানিয়েরো’—অর্থাৎ, ‘স্কুলে কেউ বিদেশি নয়’। একই সঙ্গে তারা শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিও তোলেন। ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসা এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকারের নতুন একটি জাতীয় ডিক্রিতে কিছু শ্রেণিকক্ষে অ-ইতালীয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩০ শতাংশে সীমিত করার বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুলে বোরকা ও নিকাব পরা নিষিদ্ধ করতে একটি ব্যবস্থা আনার কথাও জানিয়েছেন মেলোনি।


গত ১৭ অক্টোবর মিলানে বিক্ষোভের একপর্যায়ে পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। মুখোশ পরা কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও পাথরের চাঁই ছুড়ে মারেন। বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

বেলজিয়ামেও শিক্ষা খাতে ব্যয় সংকোচন, ফি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে। লিয়েজ শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্টিন কিছু ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, সেগুলো ছিল ‘নিছক সহিংসতা’। ইউরোনিউজের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

 বাড়ছে বাড়িভাড়া, নিজের ঘর যেন স্বপ্ন

ইউরোপের চলমান আন্দোলনের অন্যতম বড় কারণ আবাসনসংকট। বিশেষ করে তরুণদের জন্য নিজের সামর্থ্যের মধ্যে বাসা পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে বাড়িভাড়া, আবাসনের অভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ তীব্র হয়েছে।

স্পেনে আবাসনসংকট এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু। দেশটিতে ৮৭ বছর বয়সি মারিকারমেন আবাসকালকে তার বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনার পর সেপ্টেম্বরে প্রতিবাদ আরও জোরালো হয়। তার বাড়িভাড়া উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গিয়েছিল বলে খবর প্রকাশিত হয়। পরে তার মৃত্যুর ঘটনা উচ্ছেদ ও আবাসনকে ঘিরে ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়।

মাদ্রিদে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও বিক্ষোভ করেন। একই সময়ে আবাসনের অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্দোলনকারীরা আবাসিক সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ তহবিলগুলোর ওপর বিধিনিষেধ আরোপের দাবি জানান।

প্রতিবেশী পর্তুগালের রাজধানী লিসবনেও ১৭ অক্টোবর বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়। সেখানে বাড়িভাড়া, মজুরি, পেনশন এবং অবনতিশীল জনসেবার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিক্ষোভকারীরা।

এর আগে ১৫ অক্টোবর ভোরে পোর্তোতে আবাসনের দাবিতে গড়ে ওঠা একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদী শিবির উচ্ছেদের সময় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের মারধর করেছে বলে অভিযোগ ওঠে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ওই ঘটনায় প্রতিবন্ধী একজন ব্যক্তিসহ ৩৭ জন আহত হন। অভিযোগে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাটি।


আবাসনসংকটের প্রভাব তরুণদের ওপর কতটা গভীর, তা উঠে এসেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্যে। সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইউরোপে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের  ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি চারজনের একজনের বেশি, অতিরিক্ত মানুষের সঙ্গে গাদাগাদি করে বসবাস করতেন।

এই পরিসংখ্যান শুধু আবাসনের সংকটই তুলে ধরে না; বরং তরুণদের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার পথে বাধাগুলোরও ইঙ্গিত দেয়। কাজ পেলেও বাড়িভাড়া, দৈনন্দিন খরচ ও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর স্বাধীনভাবে থাকার সামর্থ্য অনেকেরই হচ্ছে না।

আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি

ইউরোপের অন্য দেশগুলোর তুলনায় আলবেনিয়ার বিক্ষোভে রাজনৈতিক দাবি আরও স্পষ্ট। সেখানে দুর্নীতির অভিযোগ, বেকারত্ব এবং সরকারের ওপর দীর্ঘদিনের অসন্তোষ আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তি।

১৭ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে জড়ো হন হাজারো তরুণ বিক্ষোভকারী। প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগের দাবিতে এটি ছিল টানা পঞ্চম দিনের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীরা দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ছোড়েন। জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে।


এই অস্থিরতার পেছনে রয়েছে কয়েক মাস ধরে জমে থাকা ক্ষোভ। সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, বেকারত্ব এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিতর্কিত উপকূলীয় উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।

তবে এদি রামা পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, বিরোধীরা অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।

জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও তরুণদের প্রতিবাদ

ইউরোপের বিক্ষোভের বিস্তার শুধু বড় সংঘর্ষের খবর পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও গ্রিসেও শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। তবে এসব দেশে আন্দোলনের মাত্রা ও তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম।

জার্মানির বার্লিনে ১৬ অক্টোবর আন্দ্রেয়াস-গিমনাজিয়ামের প্রবেশপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের প্রতিবাদের কারণ বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার প্রস্তুতি এবং শিক্ষা খাতে আরও বিনিয়োগের দাবি। একই সঙ্গে তারা ফ্রান্সের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিও সংহতি প্রকাশ করেন।


অস্ট্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট কমানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হচ্ছেন।

গ্রিসে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে আবাসন ব্যয়, বাসস্থানের সংকট, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামরিক ব্যয় বৃদ্ধি। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনসংকট ও শিক্ষানীতি নিয়ে আন্দোলনের পাশাপাশি ক্লাস বর্জনেরও ডাক দেওয়া হয়েছে।

অধ্যাপক আলবার্তো আলেমান্নো আল জাজিরাকে বলেন, গ্রিসে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জনের আহ্বান জানাচ্ছেন, জার্মানিতেও তারা সংগঠিত হচ্ছেন। অস্ট্রিয়ায়ও আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে এবং পরবর্তী সপ্তাহে আরও সংগঠিত কর্মসূচি হতে পারে।

তরুণদের ক্ষোভে কি নতুন আরব বসন্তের ইঙ্গিত?

ইউরোপের বর্তমান অস্থিরতাকে আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করার পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মিল। দুই ক্ষেত্রেই তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত হওয়ার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি গভীর অসন্তোষ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

কুয়েতি বংশোদ্ভূত মার্কিন সাংবাদিক আহমেদ এলদিন তার সাবস্ট্যাক প্রবন্ধ ‘ইউরোপস আরব স্প্রিং’-এ ইউরোপের বিক্ষোভের সঙ্গে ২০১১ সালের আরব বসন্তের তুলনা করেছেন। তার মতে, অর্থনৈতিক দুর্দশা, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রতি তরুণদের ক্ষোভ দুই আন্দোলনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য তৈরি করেছে।

তিনি সতর্ক করে লেখেন, ‘ইউরোপের সরকারগুলোর কাছে বিদ্রোহ দমন করার জন্য ট্যাংকের চেয়ে নীরব পদ্ধতি রয়েছে।’ 

আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে তিনি আরও লেখেন, ‘শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে পুলিশের চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার কৌশল শিখেছে। কিন্তু রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি সময় ধরে টিকে থাকতে হলে তাদের আরও অনেক কিছু করতে হবে।’

মার্কিন বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা হ্যারি হ্যালপিনও ইউরোপের এই পরিস্থিতিকে বিশ্বজুড়ে তরুণদের ক্ষোভের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, নেপাল থেকে ইউরোপ পর্যন্ত জেন-জির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেওয়া দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাতদের বিরুদ্ধে একের পর এক বিক্ষোভ অনিবার্য।


ব্রিটিশ পডকাস্টার পিটার ম্যাককরম্যাকও বলেছেন, ‘ইউরোপ নিজেদের আরব বসন্তের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।’ তার মতে, কয়েক দশকের মূল্যস্ফীতি, সম্পদ কুক্ষিগত করা এবং আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।

তবে এসব বক্তব্য মূলত পর্যবেক্ষক ও ভাষ্যকারদের মূল্যায়ন। এগুলো ইউরোপের সব দেশের আন্দোলন একই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, এমন প্রমাণ নয়।

ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ প্রজন্ম

বর্তমান আন্দোলনের গভীরে রয়েছে তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। শিক্ষা শেষ করে ভালো চাকরি পাওয়া, নিজের সামর্থ্যে বাসা ভাড়া করা কিংবা আগের প্রজন্মের তুলনায় উন্নত জীবন গড়া—এসব প্রত্যাশা পূরণ হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন অনেকে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক টিইউআই ফাউন্ডেশনের ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক গবেষণায় ইউরোপের সাতটি দেশের ৮ হাজার ২৪ জন তরুণের মতামত নেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীদের ৫২ শতাংশ আশঙ্কা করছেন, তাদের প্রজন্মের জীবনযাত্রার মান বাবা-মায়ের প্রজন্মের চেয়ে খারাপ হবে। বিপরীতে মাত্র ২৫ শতাংশ মনে করেন, তারা বাবা-মায়ের চেয়ে ভালো জীবন পাবেন।

এই পরিসংখ্যান তরুণদের মধ্যে জমে থাকা হতাশার একটি চিত্র তুলে ধরে। তাদের অনেকের চোখে ভবিষ্যৎ আর নিশ্চিত উন্নতির প্রতিশ্রুতি নয়; বরং ব্যয়বহুল জীবন, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান ও সীমিত সুযোগের এক কঠিন বাস্তবতা।

এই পরিস্থিতিতে শিক্ষা ও আবাসনের মতো মৌলিক বিষয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ দ্রুত রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে। তরুণদের একটি অংশ মনে করছেন, প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা তাদের সমস্যার সমাধান দিতে পারছে না।

আরব বসন্তের পুনরাবৃত্তি, নাকি গণতন্ত্রের ভেতরে পরিবর্তনের দাবি?

ইউরোপের বর্তমান পরিস্থিতিকে আরব বসন্তের সঙ্গে তুলনা করার যুক্তি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তরুণদের ক্ষোভ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা—এসব ক্ষেত্রে মিল রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে দ্রুত সংগঠিত হওয়া এবং এক দেশের আন্দোলন অন্য দেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও আছে।

২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় তিউনিসিয়া, মিসরসহ বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। কয়েকটি দেশে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকদের পতন ঘটে। ইউরোপের অধিকাংশ দেশে এখনো নির্বাচনী রাজনীতি, বিরোধী দল, আদালত ও অন্যান্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে।


এ কারণে ইউরোপের বিক্ষোভকারীদের বড় অংশের লক্ষ্য পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে ফেলা নয়; বরং সরকারের নীতির পরিবর্তন, দুর্নীতির জবাবদিহি, শিক্ষা ও আবাসনে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থাকলেই যে মানুষের অসন্তোষ দূর হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। যদি তরুণেরা বারবার দেখেন যে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে, কর্মসংস্থান অনিশ্চিত থাকছে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁদের উদ্বেগকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে না, তাহলে ক্ষোভ আরও তীব্র হতে পারে।

ইউরোপের সামনে এখন তাই দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে আন্দোলনের পেছনে থাকা বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান করা।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

এবার ‘জেন-জি’ বিক্ষোভে উত্তাল এশিয়ার আরেক দেশ

এবার ‘জেন-জি’ বিক্ষোভে উত্তাল এশিয়ার আরেক দেশ

দাঙ্গায় জ্বলছে ফ্রান্স, পাশেই মদপানে মত্ত দম্পতি

দাঙ্গায় জ্বলছে ফ্রান্স, পাশেই মদপানে মত্ত দম্পতি

ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা কি রাজনৈতিক সংকটের লক্ষণ?

সিএনএনের বিশ্লেষণ ফ্রান্সে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা কি রাজনৈতিক সংকটের লক্ষণ?

উত্তাল ফ্রান্স, বিভিন্ন শহরে ‘কারফিউ’ জারি

উত্তাল ফ্রান্স, বিভিন্ন শহরে ‘কারফিউ’ জারি

প্যারিস শিগগিরই একটি মুসলিম নগরীতে পরিণত হবে: ট্রাম্প

প্যারিস শিগগিরই একটি মুসলিম নগরীতে পরিণত হবে: ট্রাম্প

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

আরও পড়ুন

ইসরাইলের সর্বকালের সেরা বন্ধু ট্রাম্প: নেতানিয়াহু

ইসরাইলের সর্বকালের সেরা বন্ধু ট্রাম্প: নেতানিয়াহু

কানাডার সঙ্গেই থাকছে আলবার্টা, ধাক্কা খেলেন ট্রাম্পের মিত্ররা

কানাডার সঙ্গেই থাকছে আলবার্টা, ধাক্কা খেলেন ট্রাম্পের মিত্ররা

এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়ার ৪ মাস পরেই ইউসুফ পাঠানের পকেটে ২০ কোটির জমি

এনসিপিআই-তে যোগ দেওয়ার ৪ মাস পরেই ইউসুফ পাঠানের পকেটে ২০ কোটির জমি

‘ইসরাইল আমাদের বন্ধু নয়’, বক্তব্যে অনড় মার্কিন সিনেট প্রার্থী

‘ইসরাইল আমাদের বন্ধু নয়’, বক্তব্যে অনড় মার্কিন সিনেট প্রার্থী

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম