ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে
Advertisement
হাসান ইলিয়াস তানিম
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ফ্রান্সে বিক্ষোভের আগুন নতুন নয়; কিন্তু এবারের পরিস্থিতি দেশটির সরকার ও সাধারণ মানুষের জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, সরকারি সেবার মান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার সঙ্গে মিশে গেছে। গত ১৭ অক্টোবর লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নামেন। বেশির ভাগ মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করলেও কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও দোকানপাটে লুটপাট পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তোলে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও, যাদের অনেকের কাছে একটি দোকানই ছিল পরিবারের আয়ের প্রধান ভরসা।
আন্দোলনের শুরু সেপ্টেম্বরের শেষদিকে, প্যারিসের উপকণ্ঠের কয়েকটি স্কুলে। শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ ভবন এবং পড়াশোনার অনুপযুক্ত পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ছিল আগে থেকেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনিশ্চয়তা ও বাড়ি ভাড়ার চাপও তরুণদের হতাশা বাড়িয়েছে। পরে সেই প্রতিবাদে যোগ দেন শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়নের কর্মী, বামপন্থি রাজনৈতিক কর্মী এবং আগে বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষ। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম ও সরকারি সেবায় কাটছাঁটের আশঙ্কা আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে তোলে।
১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষ ও আয়োজকদের হিসাব আলাদা। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশজুড়ে প্রায় পাঁচ লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। আয়োজকদের দাবি, সংখ্যাটি প্রায় আট লাখ। সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনায় পরদিন পর্যন্ত দুই হাজার চারশ’র বেশি মানুষকে গ্রেফতারের কথা জানায় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। প্যারিস ছাড়াও মার্সেই, লিওঁ ও অন্যান্য শহরে সহিংসতা ঘটে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক সিটি হল আগুনে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দোকানপাটে হামলা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু এলাকার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, লুটপাট ও সরকারি স্থাপনায় হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। তার বক্তব্য, সহিংসতার মাধ্যমে সরকারকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করা যাবে না। ফরাসি সরকার নৈরাজ্যের জন্য উগ্র বামপন্থি গোষ্ঠী ও অপরাধীদের দায়ী করছে। তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব মানুষকে সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করা যায় না। শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো নাগরিকদের অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি লুটপাট ও ভাঙচুরের দায়ও অপরাধীদেরই নিতে হবে।
সরকারের সামনে এখন দুটি কাজ। প্রথমত, মানুষের জানমাল রক্ষা করা এবং অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের পেছনে থাকা সমস্যাগুলোর সমাধানে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া। শুধু গ্রেফতার বাড়িয়ে বা বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করে মানুষের অসন্তোষ দূর করা সম্ভব নয়। স্কুলে শিক্ষকসংকট, আবাসনের ব্যয়, জ্বালানির দাম এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ না এলে প্রতিবাদ আবারও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে সহিংসতা দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসা, পর্যটন ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোও এ পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে।
ফ্রান্সের বাইরে বেলজিয়াম, ইতালি, পর্তুগাল ও স্পেনেও সামাজিক অসন্তোষের নানা প্রকাশ দেখা যাচ্ছে। বেলজিয়ামে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যয় ও সংস্কার নিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ রয়েছে। ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদ সংঘর্ষে গড়িয়েছে। পর্তুগালের লিসবনে বাড়িভাড়া, আবাসনের সংকট ও দৈনন্দিন খরচের চাপ মানুষকে রাজপথে এনেছে। স্পেনেও বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি, আবাসনের অভাব এবং উচ্ছেদের আশঙ্কা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবাদ চলছে। দেশগুলোর পরিস্থিতি এক নয়, তবে সাধারণ মানুষের আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ব্যবধান বাড়তে থাকলে অসন্তোষ যে রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে, তা এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট। ফ্রান্সের এ অস্থিরতার বড় ধাক্কা এসে পড়েছে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ওপর। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্যারিসে বাংলাদেশি মালিকানাধীন অন্তত আটটি মোবাইলফোন, ইলেকট্রনিকস ও মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে জিএসআর ইনফরমেটিক, থ্রি জি ইনফরমেটিক, থ্রি ডি ইনফরমেটিক, প্যারিস টেলিকম, আয়মান সার্ভিস, ফোন স্টোর, বদি টেলিকম ও রাফিদ ইলেকট্রনিকস। ব্যবসায়ীদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সম্মিলিত ক্ষতির পরিমাণ সাত লাখ ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে।
রাফিদ ইলেকট্রনিকসের মালিক রবিউল হাসান জানিয়েছেন, তার দোকানে প্রায় এক লাখ বিশ হাজার ইউরো মূল্যের পণ্য ছিল। ফোন স্টোর ও বদি টেলিকমের মালিক আজিম উদ্দিনের হিসাবে, দুই প্রতিষ্ঠানে নগদ অর্থসহ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক লাখ আশি হাজার ইউরো। এসব ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে ক্ষতির অঙ্ক যা-ই হোক, এর পেছনে রয়েছে বহু বছরের পরিশ্রম, ঋণ, সঞ্চয় এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার চেষ্টা। দোকান বন্ধ রেখেও যারা নিজেদের ব্যবসা রক্ষা করতে পারেননি, তাদের অনিশ্চয়তা আরও গভীর।
ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের এখন পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের, লুট হওয়া পণ্যের তালিকা তৈরি এবং ক্রয় রসিদ, ছবি ও সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ করা জরুরি। বিমা থাকলে দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। যাদের বিমা নেই, তাদের জন্য আইনি সহায়তা ও জরুরি আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে স্থানীয় বাংলাদেশি সংগঠনগুলো উদ্যোগ নিতে পারে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, জরুরি সময়ে পুলিশি সহায়তা পেতে কেউ কেউ সমস্যায় পড়েছেন। এসব অভিযোগ যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় প্রতিকার চাওয়া দরকার।
বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ফরাসি প্রশাসনের কাছে তাদের উদ্বেগ তুলে ধরা এবং অভিযোগ, বিমা ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া দরকার। দূতাবাসের পক্ষে ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা সম্ভব না হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করা সম্ভব। বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠনগুলোর উচিত ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য একত্র করা, আইনজীবীদের সহায়তা নেওয়া এবং প্রকৃত প্রয়োজনের ভিত্তিতে স্বচ্ছ তহবিল গঠন করা। সহায়তার নামে অর্থ সংগ্রহ করলে তার হিসাবও সবার সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। উত্তেজনাপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলা, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলা এবং যাচাই না করা খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা জরুরি। কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো অন্যায়। আবার অপরাধের ঘটনাকে আড়াল করার চেষ্টাও কমিউনিটির স্বার্থরক্ষা করে না। আইন মেনে চলা, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং সংকটে পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোই এখন সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নজরে রাখা দরকার। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে অভিবাসন, নিরাপত্তা ও অর্থনীতি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে। মারিন ল্য পেনের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল র্যালি দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসননীতি কঠোর করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সহিংসতার পর অভিবাসন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা নতুন মাত্রা পেতে পারে। তবে বর্তমান বিক্ষোভের কারণে ভবিষ্যতে কোনো দল ক্ষমতায় আসবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। বাংলাদেশ সরকারের উচিত ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা এবং যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, তার সঙ্গে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখা।
ফ্রান্সে বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশ শুধু প্রবাসীদের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। তাদের কাজ, বিনিয়োগ ও অর্থ পাঠানোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং দুই দেশের সম্পর্কও জড়িত। তাই দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ, কার্যকর কনস্যুলার সেবা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করা দরকার। একইসঙ্গে প্রবাসী সংগঠনগুলোর উচিত দলীয় বিভাজনের বাইরে থেকে মানুষের বাস্তব সমস্যা নিয়ে কাজ করা।
ফ্রান্সের রাজপথে এখন যে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তার সমাধান শুধু কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থায় হবে না। সরকারের দায়িত্ব সহিংসতা ঠেকানো, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগের জবাব দেওয়া। আর বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য এ মুহূর্তের অগ্রাধিকার নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য প্রতিকার চাওয়া এবং সংগঠিতভাবে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানো। সংকটের সময়ে তাদের পাশে কার্যকরভাবে দাঁড়াতে পারলে দূতাবাস ও কমিউনিটি সংগঠন দুটিই প্রবাসীদের আস্থার জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
হাসান ইলিয়াস তানিম : সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী; গ্লোবাল কমিউনিটির সদস্য, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
