Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

রাজনীতির ভাষা

Advertisement

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

রাজনীতি হলো সমাজের আয়না। সেই আয়নায় যদি সৌজন্যের আলো নিভে যায়, তবে প্রতিফলিত হয় কেবল অন্ধকার। প্রতিপক্ষকে সম্মান না দিয়ে, গালি ও বিদ্রূপে রাজনীতির ভাষা যখন ভরে ওঠে, তখন সমাজে তার প্রতিক্রিয়া হয় নেতিবাচক।

প্রথমত, মানুষের মধ্যে বিভাজন বাড়ে। রাজনীতিবিদদের আক্রমণাত্মক ভাষা জনতার মনে প্রতিপক্ষকে শত্রুতে পরিণত করে। ফলে সমাজে সহমর্মিতা কমে যায়, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ছিঁড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, আলোচনার সংস্কৃতি ভেঙে পড়ে। যুক্তি ও প্রমাণের জায়গায় আসে গালি ও বিদ্রূপ। মানুষ আর সমাধান খোঁজে না, বরং প্রতিপক্ষকে হেয় করার আনন্দে মেতে ওঠে। এতে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, সহিংসতার বীজ বোনা হয়। আক্রমণাত্মক বক্তৃতা জনতাকে উত্তেজিত করে, যা প্রায়ই রাস্তায় সংঘর্ষে রূপ নেয়। শান্তি নির্বাসিত হয়। চতুর্থত, নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটে। রাজনীতির ভাষা যদি অশালীন হয়, তবে জনজীবনের ভাষাও ধীরে ধীরে অশালীন হয়ে ওঠে। শিশু থেকে তরুণ সবাই শিখে নেয়-গালি দিয়েই জয় পাওয়া যায়।

সৌজন্য হারানো রাজনীতি হলো এমন এক বন, যেখানে ফুল শুকিয়ে গেছে, শুধু কাঁটা বেড়ে উঠছে। সেই কাঁটা সমাজকে বিদ্ধ করে, রক্তাক্ত করে, আর মানুষ ভুলে যায়-রাজনীতি আসলে মানুষের কল্যাণের জন্য। তখন রাজনীতি আর নেতৃত্বের শিল্প থাকে না, বরং হয়ে ওঠে সংঘর্ষের নাটক।

বাংলাদেশের রাজনীতির মঞ্চে যখন কোনো নেতা মাইক্রোফোন হাতে দাঁড়ান, তখন তার কণ্ঠে শুধু যুক্তি নয়-ঝরে পড়ে আবেগ, ক্ষোভ, প্রতিপক্ষকে বিদ্ধ করার তীব্র তীর। বক্তৃতার ভাষা হয়ে ওঠে আক্রমণাত্মক, যেন রাজনীতির মাঠ আসলে যুদ্ধক্ষেত্র। কেন এমন হয়? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের যেতে হবে ইতিহাসের গভীরে, সংস্কৃতির ভেতরে এবং ক্ষমতার মনস্তত্ত্বে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি জন্ম নিয়েছে সংগ্রামের ভেতর দিয়ে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলন-প্রতিটি অধ্যায়ে রাজনীতি ছিল সংঘর্ষময়। এ সংঘর্ষের ভাষা ধীরে ধীরে বক্তৃতার ভাষায় রূপ নিয়েছে। তাদের রাজনৈতিক বক্তৃতায় কোমলতা নয়, বরং যুদ্ধের ঝড়ই বেশি প্রতিধ্বনিত হয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা যেন সেই যুদ্ধের ধারাবাহিকতা।

রাজনীতিতে ক্ষমতা মানে শুধু শাসন নয়, প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে রাখা। বক্তৃতা তাই হয়ে ওঠে অস্ত্র। আক্রমণাত্মক ভাষা দিয়ে নেতারা নিজেদের সমর্থকদের আবেগ উসকে দেন। প্রতিপক্ষকে হেয় করে তারা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেন। জনতার সামনে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা মানে জনমতকে নিজের দিকে টেনে আনা। এখানে বক্তৃতা আর যুক্তির লড়াই নয়, বরং চলে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।

বাংলাদেশি জনজীবনে আবেগের প্রকাশ সবসময়ই তীব্র। গ্রামীণ হাটে, শহুরে আড্ডায়, এমনকি পারিবারিক আলোচনায়ও মতবিরোধ হলে ভাষা হয়ে ওঠে তীক্ষ্ণ। রাজনীতিবিদরা সেই সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। তারা জানেন-আবেগী ভাষা জনতার হৃদয়ে দ্রুত পৌঁছে যায়। তাই বক্তৃতায় যুক্তির চেয়ে আবেগ, আক্রমণের চেয়ে কোমলতা কম জায়গা পায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বক্তৃতা মূলত জনসমাবেশকেন্দ্রিক। হাজারও মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতে হয়। সেখানে শান্ত যুক্তি অনেক সময় শ্রোতার মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। আক্রমণাত্মক ভাষা জনতাকে উল্লসিত করে, হাততালি তোলে, স্লোগান জাগায়। গণমাধ্যমও সেই উত্তেজনাকেই বেশি প্রচার করে। ফলে নেতারা বুঝে যান-আক্রমণাত্মক ভাষাই তাদের জনপ্রিয়তার জ্বালানি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং শত্রু হিসাবে দেখা হয়। শত্রুকে আক্রমণ করতে হয়, শত্রুকে দুর্বল করতে হয়, শত্রুকে জনতার সামনে হেয় করতে হয়। এ মানসিকতা বক্তৃতার ভাষাকে আরও তীব্র করে তোলে। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করা যেন রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার অপরিহার্য কৌশল। এ আক্রমণাত্মক ভাষা অনেক সময় গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হলেও এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বক্তৃতার ভাষা তাই শুধু শব্দ নয়-এটি ক্ষমতার প্রদর্শন, জনতার আবেগের উন্মোচন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।

রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ মানেই শত্রু। সুতরাং তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, তাকে পরাজিত করা নয়, তাকে নির্মূল করতে হবে-এ হচ্ছে রাজনীতির ভাষা। সহাবস্থান নয়, সংঘাতই এখানে কৌশল।

মুক্তিযুদ্ধের সময় আক্রমণাত্মক ছিল স্বাধীনতার ডাক। সেখানে লড়াই হয়েছে মরণপণ। পক্ষ ছিল দুটো-স্বাধীনতাকামী আর স্বাধীনতাবিরোধী। এ দুপক্ষের মধ্যে সহাবস্থা সম্ভব ছিল না; কিন্তু এ ধারা স্বাধীনতা-উত্তর যুগেও অব্যাহত আছে। শত্রু শত্রু খেলার ধরন পালটেছে। ভাষা আরও ব্যক্তিগত ও বিদ্রূপাত্মক হয়ে উঠেছে, যা সংসদ ও জনসভায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

রাজনীতির মঞ্চে যখন কোনো নেতা প্রতিপক্ষকে গালি দেন, তখন আসলে তিনি যুক্তির পথ ছেড়ে আবেগের নদীতে নিজেকে ভাসিয়ে দেন। গালি হলো এক ধরনের বজ্রপাত-যা মুহূর্তে জনতার মনোযোগ কেড়ে নেয়, আকাশে আলো ছড়ায়, কিন্তু মাটিতে ফসল ফলায় না। গালি দিয়ে রাজনীতিবিদরা অর্জন করেন তাৎক্ষণিক উল্লাস। জনতার ভিড়ে হাততালি ওঠে, স্লোগান গর্জে ওঠে, সমর্থকরা মনে করে তাদের নেতা সাহসী, নির্ভীক। প্রতিপক্ষকে হেয় করার আনন্দে জনতা উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। এ উল্লাসই নেতার কাছে এক ধরনের বিজয়-যেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি যুদ্ধ জয় করেছেন; কিন্তু এ অর্জন ক্ষণস্থায়ী। গালি দিয়ে তারা জনতার আবেগকে উসকে দেন, কিন্তু যুক্তিকে দুর্বল করেন। গালি দিয়ে তারা প্রতিপক্ষকে শত্রু বানান, কিন্তু সমাধানকে দূরে সরিয়ে দেন। গালি দিয়ে তারা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেন, কিন্তু রাষ্ট্রের মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত করেন।

গালি হলো ধোঁয়ার মতো-যা মুহূর্তে আকাশ ঢেকে দেয়, কিন্তু সূর্যের আলোকে চিরদিন আড়াল করতে পারে না। গালি দিয়ে রাজনীতিবিদরা অর্জন করেন শব্দের ঝড়, কিন্তু হারান নীতির স্থিরতা। তারা জনতার আবেগের ঢেউ পান, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় তাদের ভাষা থেকে যায় কেবল তিক্ততার উদাহরণ হিসাবে। প্রতিপক্ষকে গালি দিয়ে রাজনীতিবিদরা যা অর্জন করেন তা হলো-মুহূর্তের উল্লাস, ক্ষণস্থায়ী জনপ্রিয়তা এবং আবেগের আগুনে সমর্থকদের উজ্জীবন। কিন্তু হারান গভীর রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা, যুক্তির শক্তি এবং ভবিষ্যতের মর্যাদাপূর্ণ স্মৃতি।

রাজনীতির ভাষা যদি আক্রমণাত্মক না হয়ে ব্যঙ্গাত্মক হয়, তবে সেটি অনেকটা খোলা আকাশে বিদ্রূপের মেঘ ভেসে বেড়ানোর মতো। ব্যঙ্গ আঘাত করে, কিন্তু ছুরি নয়-তীক্ষ্ণ হাসির মতো। তবু এরও দোষ আছে, কারণ ব্যঙ্গের হাসি অনেক সময় সমাজকে বিভ্রান্ত করে, প্রতিপক্ষকে হেয় করে, আর যুক্তির আলোকে আড়াল করে।

ব্যঙ্গাত্মক ভাষার প্রথম দোষ হলো গভীর সমস্যাকে হালকা করে ফেলা। যখন গুরুতর রাজনৈতিক সংকটকে কৌতুক বা বিদ্রুপে রূপ দেওয়া হয়, তখন জনতা সমস্যার গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। হাসির আড়ালে সত্য চাপা পড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, ব্যঙ্গ প্রতিপক্ষকে মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে। আক্রমণাত্মক ভাষা শত্রু বানায়, আর ব্যঙ্গ প্রতিপক্ষকে হাসির পাত্রে পরিণত করে। এতে সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ক্ষয়ে যায়। তৃতীয়ত, ব্যঙ্গ আলোচনার গাম্ভীর্য নষ্ট করে। সংসদ বা জনসভা হয়ে ওঠে নাটকের মঞ্চ, যেখানে যুক্তি নয়, কৌতুকই প্রধান আকর্ষণ। এতে রাজনৈতিক আলোচনার মান কমে যায়। চতুর্থত, ব্যঙ্গ অশ্রদ্ধার সংস্কৃতি তৈরি করে। জনতা শিখে নেয়-প্রতিপক্ষকে যুক্তি দিয়ে নয়, বিদ্রুপ দিয়ে হারাতে হয়। ফলে সমাজে সহমর্মিতা কমে যায়, বিদ্বেষ বাড়ে।

ব্যঙ্গাত্মক রাজনীতি হলো এমন এক আয়না, যেখানে প্রতিপক্ষের মুখ বিকৃত হয়ে দেখা যায়। মানুষ হাসে, কিন্তু সেই হাসি আসলে ভাঙা কাচের মতো-যা আলো প্রতিফলিত করে না, বরং চোখে ব্যথা দেয়। ব্যঙ্গ আর নিছক কৌতুক্ত থাকে না। এটি হয়ে ওঠে অশোভন, অসৌজন্যমূলক, আগ্রাসী।

সৌজন্য ফিরিয়ে আনার প্রথম শর্ত হলো শ্রদ্ধার ভাষা। প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, বরং সহযাত্রী হিসাবে দেখা। যেমন নদীর দুই তীর-একটি ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ। রাজনীতির প্রতিপক্ষও তেমনি, একে অপর ছাড়া গণতন্ত্র পূর্ণ হয় না। দ্বিতীয়ত, আলোচনার সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার। গালি নয়, যুক্তি; বিদ্রূপ নয়, প্রমাণ; হেয় নয়, আলোচনার মাধ্যমে দ্বন্দ্বের নিরসন করতে হবে। শালীন ভাষা যদি মঞ্চে ফিরে আসে, তবে রাজনীতি আবার সভ্যতার প্রতীক হয়ে উঠবে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যম ও জনসমাবেশের ভূমিকা। তারা যদি আক্রমণাত্মক শব্দের বদলে সৌজন্যমূলক বিতর্ককে প্রচার করে, তবে নেতারা বুঝবেন-জনতার উল্লাস শুধু গালিতে নয়, ভদ্রতায়ও জন্ম নিতে পারে। সৌজন্য ফিরিয়ে আনা মানে ঝড়ের পর আকাশে রংধনু দেখা। আক্রমণাত্মক ভাষার বজ্রপাত শেষে যদি নেতারা কোমল শব্দের বৃষ্টি ছড়ান, তবে জনতার হৃদয়ে শান্তির ফুল ফুটবে।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

দিল্লিতে কী হচ্ছে

দিল্লিতে কী হচ্ছে

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম