Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

দিল্লিতে কী হচ্ছে

Advertisement

Icon

ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

একটি মাত্র মন্তব্য। তাতেই শুরু। গত ১৫ মে নয়াদিল্লিতে সুপ্রিমকোর্টের এক শুনানিতে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বেকার তরুণদের তুলনা করেছিলেন তেলাপোকার সঙ্গে। পরে তিনি বলেছেন, কথাটা ছিল ভুয়া ডিগ্রিধারীদের নিয়ে, সব বেকারদের নিয়ে নয়। কিন্তু ততক্ষণে তীর বেরিয়ে গেছে।

পরদিনই অভিজিৎ দীপকে নামের এক তরুণ ডিজিটাল কৌশলবিদ খুলে বসলেন এক ব্যঙ্গাত্মক দল : ‘ককরোচ জনতা পার্টি’, বা তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি)। নামটাই ক্ষমতাসীন বিজেপির সঙ্গে এক অক্ষরের খোঁচা। দীপকে বললেন, এটি দেশের ‘সব তেলাপোকার’ দল।

পাঁচ মাস পর সেই ঠাট্টাই এখন নরেন্দ্র মোদি সরকারের সামনে তরুণদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ আন্দোলন একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে সরিয়েছে। এখন দাবি তুলেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের। আর সরকার জবাব দিচ্ছে গণগ্রেফতার, ইন্টারনেট বন্ধ আর রাজধানীকে দুর্গ বানিয়ে। দিল্লির রাজপথের এ ছবি বাংলাদেশের পাঠকের কাছে অচেনা নয়। ঠিক সে কারণেই বিষয়টি তাড়াহুড়া নয়, বুঝেশুঝে দেখা দরকার।

প্রশ্নপত্র ফাঁস, স্বপ্ন ফাঁস : অপমানটা এসেছিল একেবারে ভুল সময়ে। মাত্র ১২ দিন আগে, ৩ মে, ভারতের জাতীয় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট’-এ বসেছিল ২২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। প্রশ্ন ফাঁস হলো, পুরো পরীক্ষাই বাতিল। এটা প্রথমবারও নয়। ২০২৪ সালেও নিটের প্রশ্ন ফাঁস হয়েছিল। তখনো কাউকে সত্যিকার অর্থে জবাবদিহি করতে হয়নি। আন্দোলনকারীদের হিসাবে, এবারের ফাঁসের পর এক ডজনেরও বেশি পরীক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। আসল ক্ষোভটা অবশ্য আরও গভীরে। এশিয়ায় শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি যেসব দেশে, ভারত তার একটি। দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষই তরুণ। লাখ লাখ পরিবারের কাছে ভর্তি পরীক্ষাই উপরে ওঠার একমাত্র সৎ ও সহজ সিঁড়ি। সেই সিঁড়িতেই যখন কারচুপি, আর দেশের শীর্ষ বিচারক সিঁড়ি বাওয়া মানুষদের কীট বলেন, তখন ব্যঙ্গই হয়ে ওঠে রাজনীতি। তেলাপোকা জনতা পার্টি এ মেজাজটা ঠিকই ধরেছিল। মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় তাদের দলীয় গান, ওয়েবসাইট আর লাখো অনুসারী হয়ে গেল। এখন সেই সংখ্যা ২ কোটি ছাড়িয়েছে বলে জানা যায়। জুলাইয়ে, টানা কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনের পর পদত্যাগ করলেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

এবার প্রশ্ন ভোটের : গল্প এখানে শেষ হলে এটি হতো তরুণদের সফল আন্দোলনের একটি উদাহরণ মাত্র। কিন্তু সেপ্টেম্বরে মোড় ঘুরল অন্যদিকে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা জানাল, ভোটার তালিকা সংশোধনের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছিলেন তিন সদস্যের কমিশনের বাকি দুই কমিশনারই। এই প্রক্রিয়ায় তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ১৩ কোটি নাম।

বিজেপি বলছে, এটা নিছক ঘর গোছানোর কাজ; ২ কোটি ৮০ লাখ মৃত ভোটার, ৬ কোটি ৩০ লাখ ঠিকানা বদলেছেন, ১ কোটি নাম দুবার উঠেছিল, আর ৩ কোটি মানুষকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটসহ সমালোচকদের অভিযোগ, প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বচ্ছ, আর তার বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়েছে মুসলিমসহ সংখ্যালঘুদের ওপর। কোন পক্ষ ঠিক, তা বলবে নিরীক্ষা আর আদালত। কিন্তু রাজনৈতিক বার্তাটা এর মধ্যেই পৌঁছে গেছে।

বিজেপির জনপ্রিয়তায় ভাটা কেন : ভোটার তালিকার বিতর্ক আসলে সর্বশেষ সংযোজন। তরুণদের কাছে বিজেপির আকর্ষণ কমার পেছনে অন্তত চারটি কারণ আছে।

১. নির্বাচনের ওপর আস্থা নেই। ২০২৩ সালের এক আইনে নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে সেখানে সরকারই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। ২০২৪ সালে সুপ্রিমকোর্ট ‘ইলেকটোরাল বন্ড’ প্রকল্প বাতিল করে, আর সেই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল বিজেপি।

২. মুসলিমরা ক্ষমতার বাইরে। ভারতে মুসলিম প্রায় ২০ কোটি, জনসংখ্যার ১৪ শতাংশ। অথচ লোকসভায় বিজেপির একজনও মুসলিম সংসদ-সদস্য নেই, মোদির তৃতীয় মেয়াদের মন্ত্রিসভাতেও কোনো মুসলিম মন্ত্রী নেই। গরু নিয়ে গণপিটুনি, মুসলিমদের বাড়িঘরে ‘বুলডোজার ন্যায়বিচার’ আর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের মতো পদক্ষেপ এ বিশাল জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতার কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।

৩. গুটিকয়েক বড়লোকের অর্থনীতি। সমালোচকরা একে বলছেন ‘স্বজনতোষী পুঁজিবাদ’, এমনকি অলিগার্কি। হাতেগোনা কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী, বিশেষ করে আদানি গ্রুপ, সরকারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ফুলেফেঁপে উঠেছে। অথচ গৌতম আদানি নিজেই যুক্তরাষ্ট্রে ঘুসের অভিযোগে অভিযুক্ত। অন্যদিকে তরুণ স্নাতকদের জন্য যথেষ্ট চাকরি তৈরি হয়নি।

৪. গণমাধ্যম সরকারের মুঠোয়। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৬ সালের গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে ভারত ১৫৭তম। বেশির ভাগ টেলিভিশন চ্যানেলকে মানুষ এখন ব্যঙ্গ করে ডাকে ‘গোদি মিডিয়া’, অর্থাৎ সরকারের কোলে বসা গণমাধ্যম।

এই চার ক্ষোভ একসঙ্গে মিলেই বোঝা যায়, কেন তেলাপোকা নিয়ে একটি ঠাট্টা এত দ্রুত এত মানুষের মন ছুঁয়েছে।

লাঠির জবাবে তেরঙ্গা : সরকারের উত্তর একটাই : ‘শক্তি তথা বলপ্রয়োগ’। ১০ অক্টোবরের বিক্ষোভের আগে দিল্লিতে নামানো হয় ৩০ হাজারেরও বেশি পুলিশ ও আধাসামরিক সদস্য। মেট্রো বন্ধ, শহরের নানা জায়গায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, আর নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তর সিলগালা। আন্দোলনের নেতাদের মুম্বাই থেকে আসা বিমানের ভেতর থেকেই তুলে নেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, সারা দেশে অন্তত ১০ হাজার মানুষ আটক হয়েছেন।

যে বিচার বিভাগের প্রধানের এক মন্তব্যে আগুন লেগেছিল, সেই বিচার বিভাগই এখন দমনপীড়নের লাগাম খানিকটা টেনে ধরছে। দ্বিতীয়টি পতাকা। বিক্ষোভকারীরা জাতীয় পতাকা হাতে নিয়েছে। ১৬ অক্টোবরের কর্মসূচির নাম ছিল ‘লহরা দো তিরঙ্গা’, অর্থাৎ ‘তেরঙ্গা উড়িয়ে দাও’। স্লোগান ছিল ‘জয় হিন্দ’।

এটা ‘ঢাকা ২০২৪’ নয়, অন্তত এখনো নয় : ঢাকায় বসে মনে হতেই পারে, এ বুঝি দক্ষিণ এশিয়ার পরের ‘জেন-জি অভ্যুত্থান’। আগে হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশে, তারপর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে। ভারতীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, মোদি সরকার নিজেও এ আন্দোলনকে ‘কালার রিভলিউশন’ আর প্রতিবেশী দেশগুলোর উথাল-পাথালের চোখেই দেখছে। মিল আছে, সেটা মানতেই হবে। তিন দেশেই শুরুটা চাকরি বা পরীক্ষায় ন্যায্যতার প্রশ্ন দিয়ে। কিন্তু ফলাফল আন্দাজ করতে চাইলে ভারতের অমিলগুলোই অনুধাবন করা বেশি জরুরি।

বাংলাদেশের জন্য তিন শিক্ষা : এক. প্রতিবেশীর অস্থিরতা আমাদের জন্য সুখবর নয়। দিল্লির বিরুদ্ধে আমাদের অভিযোগ যতই থাকুক, বাণিজ্য, ট্রানজিট, তিস্তাসহ পানির আলোচনা আর সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সবই নির্ভর করে একজন স্থিতিশীল প্রতিবেশীর ওপর। তাই ঢাকার উচিত নজর রাখা, মুখ সামলে কথা বলা, আর এমন কিছু না বলা যা হস্তক্ষেপ মনে হতে পারে। ভারতের কাছে আমরাও ঠিক এটাই চাই।

দুই. অসুখটা আমাদেরও। আমাদের স্নাতক ডিগ্রিধারীরা সার্টিফিকেট হাতে চাকরির জন্য ঘুরছেন। আমাদের পাবলিক পরীক্ষা আর নিয়োগ পরীক্ষাও প্রশ্নপত্র ফাঁস আর সন্দেহের বাইরে নয়। এইতো সপ্তাহ দুয়েক আগে প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল হয়। নীতিনির্ধারকরা যেন ধরে না নেন, জুলাইয়ের সেই শক্তি ফুরিয়ে গেছে। যে তরুণ বিশ্বাস করে সিঁড়িটা সৎ, সে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর যে বিশ্বাস করে সিঁড়িটা কারচুপির, সে-ই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বিরোধী শক্তি।

তিন. নির্বাচন কমিশনই আসল পরীক্ষা। দিল্লি হোক বা ঢাকা, যে নির্বাচন কমিশনে মানুষের আস্থা নেই, সেখানে ব্যালটের কাজ করতে রাস্তায় নামে মানুষ। কমিশনারদের স্বাধীন নিয়োগ, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা আর উন্মুক্ত নিরীক্ষা পশ্চিমাদের ফরমায়েশ নয়। এগুলো কোনো সরকারের বৈধতার ন্যূনতম শর্ত। তাই আসছে উপনির্বাচন ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা।

ভারতের তরুণরা শুরু করেছিল একটি সৎ পরীক্ষার দাবিতে। ছয় মাস পর তারা চাইছে একটি সৎ নির্বাচন। যে রাষ্ট্রের কোনোটারই নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সেখানে সমস্যা আর ছাত্রদের নয়, সমস্যা রাষ্ট্রের। দক্ষিণ এশিয়ার সব সরকার, আমাদেরসহ, এখনই তরুণদের কথা শুনুক। নইলে একদিন তেলাপোকারা তাদের দরজাতেও কড়া নাড়বে।

ড. মোহাম্মদ ইমরান হোসাইন আনসারী : নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ (বিআইআইডিএস); এবং সহকারী অধ্যাপক, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক-ডাচেস।

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

দিল্লিতে কী হচ্ছে

দিল্লিতে কী হচ্ছে

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?

হালফিল বয়ান ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম