অর্থনীতির রক্তক্ষরণে ফুটো বন্ধ করবে কে?
Advertisement
অবিনাশ পাল
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় সংকট আয় বাড়ানোয় যতটা, তার চেয়ে বেশি আয় ধরে রাখায়। রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের ডলার দেশে আসছে, অথচ খেলাপি ঋণ, অর্থ পাচার এবং দুর্বল কর আদায়ের কারণে অর্থনীতির ভিত শক্ত হচ্ছে না। ফুটো বালতিতে পানি ঢালার মতোই অবস্থা। প্রবাহ বাড়লেও সঞ্চয় বাড়ছে না। এ পরিস্থিতি থেকে বেরোতে নতুন ঋণ নেওয়া কিংবা মুদ্রার জোগান বাড়ানোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আর্থিক ব্যবস্থার দুর্বলতাগুলো দূর করা জরুরি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা, স্বচ্ছ করব্যবস্থা, প্রভাবশালীদের ঋণসুবিধার অবসান এবং দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠনই হতে পারে সেই উদ্যোগের ভিত্তি।
২০২৬ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এ হার ছিল ২০.২ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের হার ছিল ৩২.৬ শতাংশ, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার গড় মাত্র ৭.৯ শতাংশ।
খেলাপি ঋণের এই উল্লম্ফনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অনিয়ম এবং হিসাবের স্বচ্ছতা বাড়ার প্রভাব। দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১০টিতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশের বেশি, যার পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকভেদে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। ইসলামী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ৫২ শতাংশ, জনতা ব্যাংকের ৭৫ শতাংশ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৯৭ শতাংশ। বড় খেলাপিদের ঋণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং জবাবদিহির অভাব কতটা ভূমিকা রেখেছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তে স্পষ্ট হওয়া দরকার।
পুনঃতফসিলের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর চেষ্টাও স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। ২০২৫ সালের শেষে পাঁচ শতাংশের কম ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ১৫ বছর পর্যন্ত মেয়াদে ঋণ নিয়মিত করার সুযোগ দেওয়ার পর খেলাপির হার কিছুটা কমেছিল। তিন মাসের মধ্যে তা আবার বেড়ে যায়। অর্থঋণ আদালতে প্রায় ৭৫ হাজার মামলায় আটকে আছে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা। নিষ্পত্তির হার ১০ শতাংশেরও কম।
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আইএমএফের বিপিএম৬ পদ্ধতিতে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩১.৩০ বিলিয়ন ডলার। গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩৬.১৫ বিলিয়ন ডলার। বছরে গড়ে যে পরিমাণ অর্থ পাচারের হিসাব পাওয়া যায়, তা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের প্রায় অর্ধেক। ২০২৫ সালের জুনে বিপিএম৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ২৬.৭৪ বিলিয়ন ডলার। প্রবাসী আয় ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক পথে রেমিট্যান্স আসায় হুন্ডির ব্যবহার কিছুটা কমেছে। এতে স্বস্তি ফিরলেও অর্থ পাচারের পথ বন্ধ না হলে এ অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হবে।
আমদানি-রপ্তানিতে মূল্য কারসাজি ঠেকাতে কাস্টমস, ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ফিনানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মধ্যে তাৎক্ষণিক তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত যাচাইব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর চেষ্টা চলুক, তবে নতুন করে পাচার ঠেকানোই হবে বেশি কার্যকর।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও ব্যাংক খাতের সংস্কার অপরিহার্য। ২০২৬ সালের আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশে নেমেছে, যা দশ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি অবশ্য ৯.৩২ শতাংশে রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ৯.৫ শতাংশে রেখে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নিয়েছে। দীর্ঘদিন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণের পরও মূল্যস্ফীতি উঁচু থাকার পেছনে ঋণ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল বা ভুয়া জামানতে ঋণ নেওয়া এবং সেই অর্থের একাংশ বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ব্যাংককে তারল্য সংকটে ফেলে। ঋণ ফেরত না এলে আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সহায়তা দিতে হয়। এতে বাজারে অর্থের জোগান বাড়ে, অথচ উৎপাদন বাড়ে না। একদিকে নীতি সুদহার বাড়িয়ে অর্থের প্রবাহ কমানোর চেষ্টা চলে, অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে নতুন অর্থ জোগাতে হয়। এ দ্বন্দ্ব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে।
এর ক্ষতি বহন করেন সৎ উদ্যোক্তারাও। খেলাপি ঋণের ক্ষতি সামলাতে ব্যাংকগুলো সুদের ব্যবধান বাড়িয়ে রাখে এবং নতুন ঋণ দিতে সতর্ক হয়ে পড়ে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি টানা ছয় মাস পাঁচ শতাংশের নিচে রয়েছে। ফলে পক্ষপাতমূলক ঋণ একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায়, অন্যদিকে বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দেয়। এ চক্র না ভাঙলে শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতাও একই সমস্যার অংশ। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত সাত শতাংশের নিচে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, মৌলিক উন্নয়ন চাহিদা মেটাতে এই অনুপাত অন্তত ১৫ শতাংশ হওয়া দরকার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যের বিপরীতে আদায় হয়েছে চার লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা। ঘাটতি ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য পূরণ করতে হলে রাজস্ব আদায়ে ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দরকার, যা প্রচলিত ব্যবস্থায় অত্যন্ত কঠিন।
রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুযোগ কমে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়ন বাড়লে মুদ্রার জোগানও বাড়তে পারে। করব্যবস্থার সংস্কার তাই আর্থিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। পরোক্ষ করের ওপর অতিনির্ভরতা, বিপুল করছাড় এবং করদাতা ও কর কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে হবে। ২০২৫ সালের মে মাসে এনবিআর ভেঙে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক বিভাগ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৬ সালের জুনে অর্থমন্ত্রীও এ বিভাজনের অঙ্গীকার করেন। কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের তথ্য একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এনে ব্যাংক লেনদেনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার।
বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার সংশোধন করে গভর্নর ও পরিচালকদের অপসারণ নির্দিষ্ট কারণ ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা যেতে পারে। সরকারের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থায়নের আইনি সীমাও নির্ধারণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণ নিশ্চিত করে বিশেষ সুবিধায় বারবার পুনঃতফসিলের প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নতুন ঋণ ও ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকা থেকে বিরত রাখতে হবে। পরিচালক ও তাদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণে কঠোর সীমা, প্রকৃত মালিকানার নিবন্ধন এবং পরিচালকদের যোগ্যতা যাচাইয়ের স্বচ্ছ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দুর্বল ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সময়সীমাবদ্ধ পুনর্গঠন, মালিকদের আগে ক্ষতির দায় বহন এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্য দুর্বল ব্যাংকগুলোর জন্যও বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে হবে। অর্থঋণ আদালতে বিশেষ বেঞ্চ এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গড়ে ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করা যেতে পারে। একইসঙ্গে ব্যাংকভিত্তিক সম্পদের মান যাচাইয়ের ফল প্রকাশ করা দরকার। এতে আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীরা ব্যাংকের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে পারবেন।
রিজার্ভের উন্নতি এবং মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খেলাপি, অর্থ পাচার এবং সাত শতাংশের নিচে কর-জিডিপি অনুপাত নিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদেরও আইনের মুখোমুখি হতে হবে, কর আদায়ে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। বাজারের আস্থা ফিরলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের পথও প্রশস্ত হবে।
অবিনাশ পাল : লেখক ও গবেষক
