হালফিল বয়ান
ধর্ষণ বৃদ্ধি কীসের আলামত
Advertisement
ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দেশের অপরাধচিত্র এখন এক ধরনের বিভ্রান্তিকর বৈপরীত্যের সম্মুখীন। গেল বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উঠে আসা পরিসংখ্যান বলছে, খুন, দস্যুতা ও দাঙ্গার মতো ভয়াবহ অপরাধ কমলেও ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, চুরি এবং মাদকসেবন ও কারবারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা রয়েছে। বিশেষত ধর্ষণের মতো অপরাধ বৃদ্ধি শুধু একটি পরিসংখ্যানগত ঘটনা নয়-সমাজের নৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও লিঙ্গভিত্তিক কাঠামো অবক্ষয়ের একটি গুরুতর আলামত।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে নথিভুক্ত হওয়া মামলার সংখ্যা ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৯৬, যা গত বছর একই সময়ে ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৬টি। এক বছরের ব্যবধানে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ১৩ হাজার ৭৯০টি। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ২ হাজার ৬৫৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যা গত বছর ছিল ২ হাজার ৯১৩টি। গত বছরের তুলনায় খুন কমেছে ২৫৪টি। এ সময় তুলনামূলক কমেছে ডাকাতি, দাঙ্গা ও অপহরণের ঘটনাও। চলতি বছর ৩৮৭টি ডাকাতি হয়েছে, গত বছর যা ছিল ৫৩৮টি। গত বছরের তুলনায় এ বছর দস্যুতা কমেছে ১০৯টি।
বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, অপরাধের কিছু খাতে অপেক্ষাকৃত স্বস্তিদায়ক চিত্র থাকলেও নারী ও শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি খুব একটা স্বস্তির ছিল না। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৫ হাজার ৩৮১টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা গত বছরের ৪ হাজার ১১০টি থেকে ১ হাজার ২৭১টি বেশি। তবে নারী নির্যাতন মামলা ৯ হাজার ২৬২টি থেকে কমে ৮ হাজার ১৭৮টিতে দাঁড়িয়েছে। উল্লিখিত সময়ে শিশু নির্যাতনের ঘটনা কমেছে ৪৪০টি। গত বছর ৩ হাজার ৫৯১টি শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও চলতি বছর তা কমে ৩ হাজার ১৫১টিতে এসেছে। তবে এসিড নিক্ষেপের ঘটনা গত বছরের চারটি থেকে বেড়ে পাঁচটিতে এসেছে। তবে, খুন কমলেও ধর্ষণের সঙ্গে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেশ বেড়েছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো বেড়েছে ধর্ষণ। গত বছর ১ হাজার ৩৭০টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটলেও তা বেড়ে চলতি বছর একই সময়ে ২ হাজার ১২৯টিতে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে নারী নির্যাতনও। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ৩ হাজার ২৩৬টি নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৩ হাজার ১২৫টিতে। এ সময় চুরির ঘটনা খানিকটা কমলেও সিঁধেল চুরি বেড়েছে। এছাড়া মাদক মামলা ১৪ হাজার ১০৩টি থেকে বেড়ে ২০ হাজার ৬৫১টিতে দাঁড়িয়েছে। গত বছর এ সময় ১৩৩ জন পুলিশ আক্রান্ত হলেও এ বছর তা কমে ১২৩টিতে এসেছে।
প্রশ্ন হলো-খুন কমেছে, কিন্তু ধর্ষণ বেড়েছে; এটি কীসের আলামত? এটি কি আইনশৃঙ্খলা উন্নত হওয়ার লক্ষণ, নাকি অপরাধের ধরন পরিবর্তনের লক্ষণ? এটি কি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার প্রমাণ, নাকি অপরাধ রিপোর্টিং ও সচেতনতা বৃদ্ধির ফল? এ প্রশ্নের উত্তর একটি একক কারণে নয়; এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার, আইন ও সংস্কৃতির জটিল পারস্পরিক সম্পর্ক। এজন্য প্রথমে স্পষ্ট করা দরকার, অপরাধের পরিসংখ্যান সবসময় সরাসরি বাস্তবতার প্রতিফলন নয়। খুনের মতো সহিংস ও প্রাণঘাতী অপরাধ সাধারণত সহজে গোপন করা কঠিন; তাই এর হার তুলনামূলকভাবে নির্ভরযোগ্য হয়; কিন্তু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে অনেক ঘটনা রিপোর্টই হয় না। সমাজের কলঙ্ক, পরিবারের চাপ, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তার আশঙ্কা, পুলিশি জবাবদিহির অভাব এবং বিচার না পাওয়ার ভয়-এসব কারণে অনেক ধর্ষণ অদৃশ্য থেকে যায়।
তাই ধর্ষণের সংখ্যা বৃদ্ধির অর্থ সবসময় এই নয় যে, অপরাধ আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে। এটি হতে পারে অপরাধ বৃদ্ধির লক্ষণ, আবার হতে পারে আরও বেশি ভুক্তভোগী এখন মামলা করছেন বা পুলিশ আরও বেশি মামলা নিচ্ছে। কিন্তু দুটি ব্যাখ্যাই উদ্বেগজনক। কারণ, হয় অপরাধ বাড়ছে, নয়তো সমাজে এত বেশি ধর্ষণ ঘটছে যে, এর কিছু অংশ এখন পরিসংখ্যানে ধরা পড়ছে। তাছাড়া, খুন, দস্যুতা ও দাঙ্গার মতো অপরাধ কিছুটা হ্রাসকে সরাসরি আইনশৃঙ্খলা উন্নতির প্রমাণ বলা যায় না। তবে এটি অন্তত ইঙ্গিত দেয় যে, সহিংস অপরাধের কিছু ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষীয় নিয়ন্ত্রণ বা সতর্কতা বেড়েছে। সশস্ত্র অপরাধ, গোষ্ঠীগত সহিংসতা ও জনসম্মুখের হিংসাত্মক ঘটনা সাধারণত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয়তা, টহল, নজরদারি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
খুন কমার আরেকটি ব্যাখ্যা হতে পারে অপরাধের ধরন পরিবর্তন। সহিংস অপরাধ কমলেও তা অপরাধের সামগ্রিক হ্রাস নয়। অপরাধ এখন হয়তো আরও লুকানো, ব্যক্তিগত ও ক্ষমতাভিত্তিক রূপ নিচ্ছে। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, ডিজিটাল নির্যাতন ও ঘরোয়া সহিংসতা-এসব অপরাধ প্রায়ই বন্ধ ঘরে, পরিচিত সম্পর্কে বা ক্ষমতার অসমতার মধ্যে ঘটে। তাই এগুলো সহজে ধরা পড়ে না এবং প্রতিরোধ করাও কঠিন বা স্পর্শকাতর হয়।
প্রসঙ্গত, ধর্ষণ বৃদ্ধিকে কেবল ‘নৈতিক অবক্ষয়’ বলে ব্যাখ্যা করা অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর। ধর্ষণ মূলত যৌন আকাঙ্ক্ষার অপরাধ নয়; এটি ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ, অপমান ও সহিংসতার অপরাধ। এজন্য সমাজবিজ্ঞান, ক্রিমিনোলজি ও নারীবাদী তত্ত্ব ধর্ষণকে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা হিসাবে বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্ষমতার অসমতাকে চিহ্নিত করে। ফলে ধর্ষণের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো ক্ষমতার অসমতা। যেখানে পুরুষ ও নারীর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার পার্থক্য বেশি, সেখানে নারীর ওপর সহিংসতার ঝুঁকিও বেশি। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা জনপরিসরে নারী যখন দুর্বল অবস্থানে থাকেন, তখন অপরাধীরা দম্ভ ও নিয়ন্ত্রণের মনোভাব নিয়ে কাজ করে।
এ অর্থে ধর্ষণ বৃদ্ধি এমন এক সমাজের আলামত, যেখানে নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসন এখনো পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ, বিচারের গতি এবং ভুক্তভোগীর সুরক্ষা দুর্বল থাকলে অপরাধীরা নিরাপদ বোধ করে। ধর্ষণ বৃদ্ধির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জবাবদিহির অভাব। যখন অভিযোগ গ্রহণে দেরি হয়, তদন্ত দুর্বল হয়, সাক্ষীর সুরক্ষা নিশ্চিত হয় না এবং বিচার বিলম্বিত হয়, তখন অপরাধীরা শাস্তির ভয় পায় না। এ অবস্থায় আইন থাকা সত্ত্বেও প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইমের তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজে যখন মূল্যবোধ, নিয়ম ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, তখন ‘অ্যানোমি’ বা মূল্যহীনতার অবস্থা তৈরি হয়। এ অবস্থায় ব্যক্তি নিজের ইচ্ছা, ক্ষমতা ও আবেগকে সামাজিক দায়ের ঊর্ধ্বে দেখতে শুরু করে। ধর্ষণের বৃদ্ধিকে এ তত্ত্বের আলোকে দেখা যায়-যেখানে পরিবার, শিক্ষা, ধর্ম, পাড়া ও রাষ্ট্র-এসব প্রতিষ্ঠান ধর্ষণ করতে নৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ক্রিমিনোলজিতে রুটিন অ্যাক্টিভিটি তত্ত্ব বলে, অপরাধ ঘটে যখন তিনটি উপাদান একসঙ্গে থাকে-অপরাধপ্রবণ ব্যক্তি, উপযুক্ত লক্ষ্য এবং প্রতিরক্ষাহীন পরিবেশ। ধর্ষণের ক্ষেত্রে এ তত্ত্ব বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। নারী বা শিশু যখন একা, দুর্বল বা প্রতিরক্ষাহীন অবস্থায় থাকেন এবং প্রতিরোধ বা সাহায্যের ব্যবস্থা না থাকে, তখন অপরাধীরা সুযোগ নেয়। নারীবাদী ক্রিমিনোলজি বলে, ধর্ষণ ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা। যে সমাজে নারীকে বস্তু হিসাবে দেখা হয়, যেখানে পুরুষের ক্ষমতা স্বাভাবিক ধরা হয় এবং ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করা হয়, সেখানে ধর্ষণ প্রতিরোধ কঠিন। এ তত্ত্বের আলোকে ধর্ষণ বৃদ্ধি বোঝায়, সমাজের লিঙ্গভিত্তিক কাঠামো এখনো অসমতাপূর্ণ। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট মার্টনের স্ট্রেইন থিওরি অনুযায়ী, সমাজে সফলতার যে মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হয়, তা অর্জনের বৈধ পথ সবার জন্য সমান না হলে ব্যক্তি অপরাধমূলক পথ বেছে নিতে পারে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় খুন কমার জন্য স্বস্তির কারণ নেই। বরং ধর্ষণ বৃদ্ধির জন্য সংশ্লিষ্টদের আরও দায়বদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ ধর্ষণ প্রতিরোধে শুধু পুলিশি ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত কৌশল। যেমন-দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তদন্ত ব্যবস্থা, ভুক্তভোগী বান্ধব থানা ও মেডিকেল সহায়তা, বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল বা দ্রুত বিচারব্যবস্থা, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, স্কুল ও কলেজে সম্মতি, লিঙ্গসমতা ও সহিংসতা প্রতিরোধ শিক্ষা, মাদক প্রতিরোধে কেবল দমন নয়, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও নারী সংগঠনের সমন্বিত নজরদারি।
মোদ্দা কথায়, খুন কমা এবং ধর্ষণ বাড়া-এ দুটি সূচক একসঙ্গে বলছে, অপরাধ কমছে না; বরং অপরাধের রূপ বদলাচ্ছে। খুন কমা হয়তো প্রকাশ্য সহিংসতার নিয়ন্ত্রণ কিছুটা ভালো হওয়ার ইঙ্গিত; কিন্তু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বৃদ্ধি বলছে, সমাজের গভীরে ক্ষমতার অসমতা, জবাবদিহির অভাব এবং নৈতিক সংযমের দুর্বলতা বাড়ছে। এটি কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ব্যর্থতার প্রশ্ন নয়। সমগ্র সমাজের নৈতিক মানদণ্ডের প্রশ্ন। তাই, রাষ্ট্রকে শুধু অপরাধ দমন করে চুপ থাকলে চলবে না। রাষ্ট্রকে সুপরিকল্পিত পন্থায় এমন এক সমাজ গড়তে হবে, যেখানে নারী ও শিশুর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত থাকবে এবং সমাজের নৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও লিঙ্গভিত্তিক কাঠামো অবক্ষয়ের মুখোমুখি হবে না। তা না হলে, খুন কমলেও সমাজের নিরাপত্তার ঝুঁকি কমবে না। বরং ভয়, অবিশ্বাস ও অন্যায়ের সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়ে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজের নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সুশাসনকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
