প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদে মূল্য সংযোজন ঘটে না
Advertisement
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রকৃতি আমাদের উদার হস্তে নানা সম্পদ দান করেছে। পৃথিবীর সর্বত্রই প্রাকৃতিক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত সম্পদ প্রাথমিক কাঁচামাল হিসাবে বিবেচিত হয়। এ কাঁচামালকে প্রযুক্তিগতভাবে রূপান্তর ও পরিমার্জনের মাধ্যমে ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট বা চূড়ান্ত পণ্যে পরিণত করতে হয়। প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ প্রাথমিক কাঁচামাল হিসাবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে, যদি তাকে রূপান্তরের মাধ্যমে চূড়ান্ত পণ্যে রূপ দেওয়া যায়। প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ জাতীয় অর্থনীতিতে যতটা মূল্য সংযোজন করতে পারে, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারে, যদি প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে তাকে ফিনিশ্ড প্রোডাক্টে পরিণত করা যায়।
শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই একটি দেশ উন্নতির শিখরে উঠতে পারে না, যদি সেই সম্পদ রূপান্তর এবং পরিমার্জনের মাধ্যমে উপযোগিতা বাড়ানোর মতো সক্ষমতা না থাকে। রূপান্তরের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের উপযোগিতা বৃদ্ধির মতো দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকলে প্রাকৃতিক সম্পদ বরং বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ সামর্থ্যবান দেশগুলো তাদের অব্যবহৃত সেই সম্পদের প্রতি অতিমাত্রায় লোভের কারণে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করে। অনেক দেশ আছে, যাদের মাটির নিচে প্রচুর খনিজসম্পদ আছে, কিন্তু সেই সম্পদ উত্তোলনের মতো প্রযুক্তিগত সামর্থ্য নেই বা অর্থ সংকুলান নেই। তারা বিদেশি কোনো কোম্পানিকে খনিজসম্পদ উত্তোলনের দায়িত্ব প্রদান করে; ফলে লাভের বড় অংশই বিদেশি কোম্পানি নিয়ে যায়।
সম্পদের মান নির্ভর করে তার চূড়ান্ত রূপান্তর বা ব্যবহারের ওপর। বনের একটি গাছ হয়তো ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হতে পারে; কিন্তু সেই গাছটিকে যদি প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে মনোলোভা ফার্নিচার তৈরি করা হয়, তাহলে তার উপযোগিতা বহুগুণ বাড়বে। পাশাপাশি তার মূল্যও বেড়ে যাবে। হয়তো ১০ হাজার টাকার গাছটিকেই ফার্নিচারে রূপান্তর করে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হবে। খনিতে যে স্বর্ণ কাঁচা অবস্থায় থাকে, তার মূল্য অতি সামান্য। কিন্তু সেই স্বর্ণ খনি থেকে উত্তোলনের পর প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে গয়না তৈরি করা হলে তার মূল্য আর আগের মতো থাকে না। উৎপাদিত তুলা মাঠে থাকাবস্থায় অতি অল্পমূল্যে বিক্রি হয়। সেই তুলাই যখন প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সুতা তৈরি করা হয়, তখন তার মূল্যমান অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিটি সম্পদের প্রাথমিক মূল্যের চেয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট তৈরি করা হলে তার মূল্যমান নিশ্চিতভাবেই অনেক বেড়ে যায়।
তবে প্রাকৃতিক সম্পদ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট তৈরি করার সক্ষমতা সবার থাকে না। অনেক দেশ সম্পদহীনতার জন্য দরিদ্র, আবার কোনো কোনো দেশ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তার সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার না করতে পারার জন্য দরিদ্র। একটি দেশ দরিদ্র হওয়ার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদহীনতা যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী প্রাকৃতিক সম্পদকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তার উপযোগিতা বাড়ানোর দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাব। যেসব দেশ প্রাকৃতিক সম্পদ কাঁচামাল হিসাবে রপ্তানি বা বিক্রি করে, তারা দাম পায় তুলনামূলকভাবে কম। আর যারা সেই সম্পদ ক্রয় করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে বা রপ্তানি করে, তারা বহুগুণ বেশি মূল্য পায়। অনেক সময় এমনও ঘটে যে, একটি দেশ হয়তো কোনো সম্পদ কাঁচামাল হিসাবে অন্য দেশের কাছে বিক্রি করল, ক্রেতা দেশটি সেই কাঁচামাল দিয়ে উন্নতমানের বস্তু তৈরি করে সেই পণ্য কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশের কাছে বিক্রি করে। কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশটি যে পণ্য হয়তো ১ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে, সেই কাঁচামাল দিয়ে তৈরি ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট তাকে আবার ১০ হাজার টাকায় ক্রয় করতে হচ্ছে। অর্থনীতির পরিভাষায় একে কাঁচামালের অভিশাপ বা কম মূল্য সংযোজন নীতি বলা যেতে পারে।
একটি দেশ যদি তার প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে চায়, তাহলে তাকে কিছু বাস্তবসম্মত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। প্রথমেই তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর প্রতি জোর দিতে হবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে কাঁচামালের অপচয় কমানো সম্ভব। হস্তনির্মিত পণ্যের চেয়ে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তৈরি পণ্যের উৎকর্ষ বেশি থাকে। পণ্যের গুণগত মান রক্ষা করা সম্ভব হয়। উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হয়।
তাই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। একটি দেশের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে আধুনিক ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি। অনেক সময় প্রচলিত ধ্যান-ধারণায় অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু জনসংখ্যা, তা পরিকল্পিতই হোক, আর অপরিকল্পিত, কখনোই এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হতে পারে না। জনসংখ্যা একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যদি তাকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়। জনসংখ্যা এমনই এক উপকরণ, যা ছাড়া কোনো উৎপাদনকার্য সম্পাদিত হতে পারে না। যে মেশিনে উন্নতমানের ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট তৈরি হয়, তার পেছনেও একজন পরিশ্রমী দক্ষ মানুষের উপস্থিতি থাকে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কাজেই কোনো দেশের জনসংখ্যাকে যদি জনসম্পদে পরিণত করা না যায়, সে ব্যর্থতার দায় জনসংখ্যার নয়, রাষ্ট্রের।
বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নানা প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ। কিন্তু সেই সম্পদ আমরা কতটা সঠিকভাবে ব্যবহার ও রূপান্তর করতে পারছি, সেটাই প্রশ্ন। এক সময় বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সিংহভাগ জুড়ে ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। বাংলাদেশ মূলত কাঁচা পাটই বেশি রপ্তানি করত। আজ পাটের সেই সুদিন আর নেই। এর জন্য প্রধানত দায়ী পাটপণ্যের ভিন্নমুখিতা আনয়নে আমাদের ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক বাজারে এক সময় পাটের বিকল্প নানা সস্তা পণ্য চলে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাটপণ্য মার খায়। অথচ আমরা যদি পাটপণ্যে ভিন্নমুখিতা আনতে পারতাম, তাহলে এ অবস্থার সৃষ্টি হতো না। রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ইত্যাদি এলাকায় কোনো কোনো উদ্যোক্তা কলার পাতা, কলার বাকল, কচুরিপানা এবং শেওলা দিয়ে নানা ধরনের গৃহস্থালি সামগ্রী ও হস্তশিল্প তৈরি করে স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিশ্বের ২৬টি দেশে রপ্তানি করছে। কলার পাতা, কচুরিপানা ও শেওলা আমাদের দেশে পরিত্যক্ত বর্জ্য হিসাবে পরিগণিত হতো। এসব থেকে তৈরি তৈজসপত্র বিদেশে রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে। কোনো কোনো গবেষক পাট থেকে সুতা তৈরির প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন; কিন্তু এখনো সেই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু হয়নি। পাট দিয়ে সুতা তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের মূল্য সংযোজনের হার অনেক বৃদ্ধি পেত।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। জাতীয় অর্থনীতিতে এক সময় কৃষি খাতের অবদান ছিল ৮০ শতাংশের মতো। বর্তমানে কৃষি খাতের অবদান কমে গেছে; কিন্তু এজন্য মূলত দায়ী আমাদের উদ্যোগহীনতা। কৃষিজাতপণ্য প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ফিনিশ্ড গুড্স তৈরি করা গেলে এর উপযোগিতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। একইসঙ্গে কৃষি ও কৃষকের ভাগ্য পরিবর্তিত হবে। কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাবে। বাংলাদেশের শিল্পায়নের একটি বড় দুর্বলতা অধিকাংশ শিল্পই আমদানিকৃত কাঁচামালনির্ভর। ফলে এগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে তুলনামূলকভাবে কম মূল্য সংযোজন করে। স্থানীয় কাঁচামালনির্ভর পণ্য রপ্তানি করা গেলে এ খাতে অর্জিত অর্থের বেশির ভাগই জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করবে। আরও একটি দুর্বলতা হচ্ছে, আমরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্যকে বৃহৎ শিল্পের কাঁচামাল হিসাবে তুলে ধরতে পারিনি। উপজেলা পর্যায়ে কৃষিজ কাঁচামালনির্ভর বৃহৎ শিল্প স্থাপন করা গেলে কাঁচামাল আমদানির কোনো প্রয়োজন হবে না। কোনো কোনো দেশে বৃহৎ শিল্পগুলো কার্যত সংযোজন শিল্পের ভূমিকা পালন করে। তারা স্থানীয় ছোট ছোট প্রতিষ্ঠানকে উপকরণ সরবরাহের জন্য দায়িত্ব প্রদান করে। এতে তুলনামূলক স্বল্প সময়ে তারা শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামালের জোগান পেয়ে থাকে। বৃহৎ শিল্প ও ক্ষুদ্র শিল্প পরস্পর সহযোগী হিসাবে কাজ করে। কিন্তু আমাদের দেশে বৃহৎ শিল্প এবং ক্ষুদ্র শিল্পকে অধিকাংশ সময়ই প্রতিযোগী হিসাবে বিবেচনা করা হয়। অনেক সময় এমনও দেখা গেছে, কোনো ক্ষুদ্র শিল্পের একটি পণ্য হয়তো বাজারে বেশ ভালো অবস্থানে চলে এসেছে, তার সেই অবস্থানকে নষ্ট করার জন্য বৃহৎ শিল্প ঠিক একই ধরনের একটি পণ্য উৎপাদন করে তুলনামূলক কম মূল্যে বাজারজাত করেছে। ফলে ক্ষুদ্র শিল্পের পণ্যটি এক সময় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে।
প্রাকৃতিক সম্পদ রূপান্তরের মধ্যমে অধিক মূল্য সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা হচ্ছে কারিগরি জ্ঞান ও সক্ষমতার অভাব। যেহেতু স্বল্পোন্নত দেশগুলো ইচ্ছা করলেই কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ করতে পারে না, তাই তারা প্রাথমিক অবস্থাতেই এগুলো রপ্তানি করে। পরবর্তী সময়ে সেই কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণ করে উচ্চ মূল্য সংযোজন করে আবারও কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশেই পাঠানো হয়। অনেক দেশ খনিজ বা তেলসমৃদ্ধ হলেও তারা বিক্রির সহজ আয়ের ওপর নির্ভর করে কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাতকরণের ঝুঁকি গ্রহণ করে না। এতে তারা সাময়িকভাবে কিছু অর্থ পেলেও ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট রপ্তানি করে যে অর্থ আয় করা সম্ভব, তা থেকে বঞ্চিত হয়। উন্নত দেশগুলো তাদের উৎপাদিত ফিনিশ্ড প্রোডাক্টের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য একই ধরনের আমদানি পণ্যের ওপর উচ্চহারে শুল্কারোপ করে। এতে উন্নয়নশীল দেশের পণ্য উন্নত দেশের বাজারে প্রবেশ করতে পারে না।
গ্রামাঞ্চলে যেসব কৃষিপণ্য অবাঞ্ছিত বলে মনে করা হয়, সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা যেতে পারে। এগুলো স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। কৃষি এখন আর আগের মতো লাভজনক পেশা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে না; কিন্তু কৃষিজাতপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট তৈরি করা গেলে সেগুলো উচ্চমূল্যে বিক্রি হতে পারে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র শিল্পে জামানতবিহীন ঋণদান করলে গ্রামের সৃজনশীল নারীরা নানা ধরনের পণ্য তৈরি করে তা স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে পারেন। এতে ব্যাপকহারে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : অর্থনীতিবিদ; বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা
অনুলিখন : এমএ খালেক
