সুন্দরবনে হারানো নগরী : ইতিহাসের আরেক অধ্যায়
Advertisement
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সুন্দরবনকে আমরা সচরাচর কেবল বাঘ, গরান-গেওয়া, কেওড়া আর জোয়ার-ভাটার এক বিশাল সবুজ সাম্রাজ্য হিসাবেই জানি। কিন্তু এ বদ্বীপ ভূমির মাটির নিচে যে মানবসভ্যতার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস ঘুমিয়ে থাকতে পারে, সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলো সেই ইঙ্গিতই জোরালোভাবে দিচ্ছে।
ঐতিহ্যগতভাবে মনে করা হতো সুন্দরবনের এ গভীর জলাভূমি বা জঙ্গল অতীতে মানুষের বসবাসের উপযোগী ছিল না। তবে ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, কার্বন ডেটিং এবং প্রাচীন নিদর্শনের সন্ধান পাওয়ার ফলে আজ এ ধারণায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এ প্রতিবেদনে সুন্দরবনের ভূগর্ভে লুকিয়ে থাকা সম্ভাব্য প্রাচীন জনপদ, ২০২৪ সালের যুগান্তকারী ভূতাত্ত্বিক গবেষণা এবং উয়ারী-বটেশ্বর বা সিন্ধু সভ্যতার সঙ্গে এর সম্ভাব্য সম্পর্কের রূপরেখা তুলে ধরা হলো।
সুন্দরবনের প্রাচীন জনপদ ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন : গত দুই দশকে সুন্দরবনের ভারতীয় অংশ (দক্ষিণ ২৪ পরগনা) এবং বাংলাদেশ অংশের বিভিন্ন নদী তীরবর্তী অঞ্চলে প্রচুর প্রাচীন নিদর্শনের সন্ধান মিলেছে।
বসতি ও বাণিজ্যের প্রমাণ : সুন্দরবনের কেজুরদানা, আরপাঙ্গাশিয়া, শেখেরটেক, কাটকা এবং খোলপেটুয়া নদীর তীরবর্তী এলাকায় ইটের স্থাপনা, প্রাচীন জনপদের অবশেষ এবং এক হাজার থেকে দেড় হাজার বছরের পুরোনো বেশকিছু স্থাপনার চিহ্ন পাওয়া গেছে। একটি অনুসন্ধানে কয়েক বর্গকিলোমিটারজুড়ে ছড়িয়ে থাকা স্থাপনার কথাও উঠে এসেছে। গবেষকদের কেউ কেউ এগুলোকে প্রাচীন বন্দর বা বাণিজ্যকেন্দ্রের সম্ভাব্য অবশেষ হিসাবে দেখেছেন।
লবণ উৎপাদনকেন্দ্র : সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে শতাধিক প্রাচীন লবণ তৈরির চুল্লি শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর সময় অষ্টম থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যে। সাম্প্রতিক উপকূলীয় ক্ষয়ের কারণে এগুলোর অনেকই আবার মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে এসেছে।
মেগা ভূমিকম্প এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন : গল্পটির সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর এবং বৈজ্ঞানিকভাবে শক্তিশালী অংশটি এসেছে আধুনিক ভূতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে।
বালির স্তম্ভ ও ভূমিকম্প : আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল নেচার কমিউনিকেশন্স-এ প্রকাশিত ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের গঙ্গা-বদ্বীপে প্রায় ২ হাজার ৫০০ বছর আগের একটি বড় ভূমিকম্পের সুস্পষ্ট চিহ্ন শনাক্ত করেছেন। মাটির কয়েক মিটার গভীরে পাওয়া গেছে ৩০-৪০ সেন্টিমিটার চওড়া বালির স্তম্ভ-যা ভূমিকম্পের সময় পানিসিক্ত মাটি তরল হয়ে ওপরের দিকে উঠে আসার অন্যতম পরিচিত চিহ্ন।
নদীর গতিপথ আকস্মিক পরিবর্তন : গবেষকদের অনুমান, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল আনুমানিক ৭ থেকে ৮। গবেষণায় দেখা যায়, ভূমিকম্পের সঙ্গে একই সময়ে গঙ্গার মূল প্রবাহের একটি বিশাল অংশ হঠাৎ করে নতুন পথে সরে যায়-যাকে ভূতত্ত্বের ভাষায় ‘অ্যাভালশন’ বলা হয়। পরিত্যক্ত প্রাচীন নদীখাতটির প্রস্থ প্রায় ১.৫ কিলোমিটার পর্যন্ত ছিল এবং আরও প্রায় ৮৫ কিলোমিটার দূরের আরেকটি স্থানে একই সময়ের নদী পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলের গবেষণা : সুন্দরবনের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে ভারত তথা পশ্চিমবঙ্গের গবেষকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ :
কালিদাস দত্তের অবদান : পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস উদ্ধারের ক্ষেত্রে বিশ শতকের প্রথমার্ধে সংগ্রাহক ও গবেষক কালিদাস দত্ত অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে পুকুর, খাল ও ডোবা খননের সময় প্রাচীন শিল্পকর্ম ও স্থাপত্যের নিদর্শন উদ্ধার করেন। তার সেই গবেষণা ও প্রবন্ধগুলো পরবর্তী সময়ে দীনেশ চন্দ্র সেনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘বৃহৎ বঙ্গ’ এবং পরে সংকলিত গ্রন্থ ‘দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার অতীত’-এ স্থান পায়, যা সুন্দরবনের প্রাচীন ইতিহাসের অন্যতম প্রধান দলিল।
সাম্প্রতিক গ্রন্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের বিভিন্ন গবেষক সুন্দরবনের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তন নিয়ে কাজ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-উমেশঙ্কর মণ্ডল ও সনৎ কুমার পুরকায়স্থের যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘প্রসঙ্গ সুন্দরবন’ (একাধিক খণ্ড) নামক গবেষণা গ্রন্থমালা। এছাড়া পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষায় মৌর্য, কুষাণ ও গুপ্ত যুগের নানা প্রত্নসামগ্রী (যেমন-টেরাকোটা ও প্রাচীন মুদ্রা) সুন্দরবনের মাটিতে পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
উয়ারী-বটেশ্বর, সিন্ধু সভ্যতা এবং প্রাচীন জনপদের তুলনামূলক বিশ্লেষণ : সুন্দরবনের এ রহস্যময় প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রখ্যাত প্রাচীন সভ্যতাগুলোর সম্পর্ক কেমন, তা নিয়ে গবেষকদের মাঝে নানা মত রয়েছে :
তাহলে কি ২ হাজার ৫০০ বছর আগের কোনো নগরী সুন্দরবনে ছিল? সম্ভাবনাটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না, কিন্তু বর্তমানে এটিকে প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস হিসাবে বলা যাবে না। এর কারণ খুব সহজ। ২৫০০ বছর আগে বঙ্গ অঞ্চলে নগরসভ্যতা যে ছিল, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ আমাদের হাতে আছে। যেমন নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রায় চতুর্থ শতাব্দী খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে মানব বসতির প্রমাণ দেয় এবং এটি ভারত মহাসাগরীয় বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সংযোগের সীমাবদ্ধতা : কিন্তু উয়ারী-বটেশ্বর সুন্দরবনে নয়। তাই সেখান থেকে সরাসরি সুন্দরবনে একই সময়ের কোনো নগরী ছিল-এমন সিদ্ধান্তে যাওয়া যাবে না। বরং এখন পর্যন্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তব্য হলো : প্রায় ২৫০০ বছর আগে একটি বড় ভূমিকম্প বঙ্গ বদ্বীপের নদী-ভূপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছিল; এ ধরনের পরিবর্তন উপকূলীয় বসতি ও যোগাযোগব্যবস্থাকে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারত।
সুনামির প্রশ্ন ও বৈজ্ঞানিক সতর্কতা : সুনামির ভূতাত্ত্বিক প্রমাণ : এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্কতা দরকার। বঙ্গোপসাগরে বড় সুনামির আশঙ্কা যে বাস্তব, ভূতাত্ত্বিক গবেষণায় তার প্রমাণ রয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগর ও আন্দামান অঞ্চলে অতীতের একাধিক সুনামির ভূতাত্ত্বিক চিহ্ন শনাক্ত হয়েছে। এমনকি গবেষণায় অতীতের ২০০০ বছরের মধ্যে একাধিক বড় সুনামির প্রমাণও পাওয়া গেছে।
প্রত্যক্ষ প্রমাণের ঘাটতি : তবে ২৫০০ বছর আগের ওই নির্দিষ্ট ভূমিকম্পটি সুনামি সৃষ্টি করেছিল এবং সেই সুনামি সুন্দরবনের একটি নগরী ধ্বংস করেছিল-এমন সরাসরি প্রমাণ এখনো নেই। বঙ্গোপসাগরের প্রাচীন সুনামির ইতিহাসও অসম্পূর্ণ; গবেষকরা আরও বিস্তৃত প্যালিও-সুনামি অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
উপসংহার ও ভবিষ্যৎ গবেষণার দিকনির্দেশনা : সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিকভাবে নিরাপদ অনুমানটি হতে পারে এমন প্রায় ২৫০০ বছর আগে বঙ্গ বদ্বীপে একটি ৭-৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প ঘটেছিল। এর অভিঘাতে গঙ্গার বিশাল নদীপথ বদলে যায় এবং ভূপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।
একই বৃহত্তর বদ্বীপীয় অঞ্চলে প্রাচীন বসতি ও বাণিজ্যকেন্দ্র থাকার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও রয়েছে। সুন্দরবনের বর্তমান বনভূমির নিচে বা পলির গভীরে আরও প্রাচীন জনপদের অস্তিত্ব থাকার সম্ভাবনা তাই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু সেই জনপদ ভূমিকম্প বা সুনামিতে ধ্বংস হয়েছিল-এটি এখনো গবেষণাযোগ্য একটি সম্ভাবনা, প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়।
সবচেয়ে বড় রহস্য : প্রকৃতি নিজেই যেন ইতিহাসের প্রমাণগুলোকে ঢেকে রেখেছে। কয়েক হাজার বছর ধরে নদীর গতিপথ পরিবর্তন, পলি জমা, ভূমি বসে যাওয়া, জোয়ার-ভাটা, উপকূল ক্ষয় এবং ম্যানগ্রোভের বিস্তার বহু পুরোনো বসতিকে মাটির কয়েক মিটার নিচে চাপা দিতে পারে।
আধুনিক গবেষণায় এমনকি অষ্টম শতাব্দী থেকে সুন্দরবন অঞ্চলে ভূমিকম্প-সম্পর্কিত ধাপে ধাপে ভূমি বসে যাওয়ার প্রমাণও পাওয়া গেছে। তাই প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘সুন্দরবনে কি কোনো হারানো নগরী ছিল’ নয়। বরং আরও বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন হলো-‘২৫০০ বছর আগে যে ভূমিকম্প বঙ্গ বদ্বীপের নদীকে সরিয়ে দিয়েছিল, তার আগে ও পরে সুন্দরবন অঞ্চলে মানুষের কোন কোন বসতি ছিল, এবং তাদের কী হয়েছিল?’ এ প্রশ্নের উত্তর মিললে বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাসের একটি একেবারে নতুন অধ্যায় খুলে যেতে পারে।
শামসুল আলম : সাবেক সিনিয়র সচিব

