Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

Advertisement

Icon

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে গণ-আন্দোলন গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হতে চলছে। মনে হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুঃসহ শাসনের অবসান হতে চলেছে। ইংরেজি ভাষায় বলতে হয়, Modi's days are numbered. বাংলাদেশের একটি দৈনিকে ভারতের আন্দোলনের ওপর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এটি লিখেছেন বিদ্যা কৃষ্ণণ। তিনি একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক, তিনি সামাজিক বিচার ও অধিকার বিষয়ে লেখালেখি করেন। এ লেখাটি আল জাজিরা থেকে নেওয়া হয়েছে এবং বাংলায় এর সংক্ষেপিত রূপ প্রকাশ করা হয়েছে।

বিদ্যা কৃষ্ণণ খুব চমৎকার একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে তার লেখা শুরু করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘প্রবাদ আছে যদি একটি মুরগির গায়ের পালক এক এক করে উপড়ে ফেলা হয়, তবে চট করে কেউ তা টের পায় না। অনেকেই এ বিভ্রান্তিতে ভোগেন যে, ছোট ছোট অন্যায় বা অনিয়ম হয়তো কখনোই তাদের পেছনে তাড়া করে ফিরবে না। কিন্তু, এই কৌশলের প্রধান সমস্যা হলো, এক সুন্দর সকালে সব সত্য কোনোরকম ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছাড়াই একদম উলঙ্গ রূপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়। এই অক্টোবরে ভারতের গণতন্ত্রকে সেই পালক ছেঁড়া মুরগির মতোই মনে হচ্ছে।’ আসলে কি তাই? নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে যা ঘটেছে তাকে মুরগির ছেঁড়া পালকের সঙ্গে তুলনা করা যায় না। মোদির শাসনামলে সংঘটিত ঘটনাগুলো আরও অনেক বেশি ভয়াবহ এবং মারাত্মক। মোদি ভারতে হিন্দুত্ববাদী শাসন কায়েম করতে চেয়েছেন। এ শাসনে মুসলমান, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও দলিত সম্প্রদায়ের কোনো অবস্থান নেই। মোদি সাভারকার-এর রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হয়েছিলেন। এ ধরনের রাজনৈতিক দর্শন সামাজিক সংখ্যালঘুদের কোনো ঠাঁই দেয় না। এদের সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়। আমরা জানি, আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম লক্ষ্য হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা। কিন্তু মোদির শাসনামলে বর্ণ হিন্দু ছাড়া অন্যসব ধর্মানুসারীদের বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। শুধু তাই নয়, তাদের প্রার্থনার অধিকার, প্রার্থনালয়ে যাওয়ার অধিকার, বিষয়-সম্পত্তি ভোগ করার অধিকারসহ একজন সভ্য মানুষ যেসব অধিকার ভোগ করতে পারে, তা থেকে বর্ণ হিন্দু ছাড়া অন্যদের বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের পতনের পর বিজেপি শুভেন্দু ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর অনেক মসজিদে আজান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক মসজিদ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানকার বাংলা ভাষাভাষী মুসলিমদের ধরে বেঁধে বাংলাদেশ সীমান্তের নো-ম্যান্স জোনে নিয়ে আসা হয়েছে এবং এদের জোর করে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করেছে বিএসএফ। বিজেপির লক্ষ্য আরও সুদূরপ্রসারী। তারা ভারতকে মুসলিম জনগোষ্ঠীমুক্ত দেশে পরিণত করতে চায়। তারা বিশ্বাস করে, মুসলমানরা বিদেশ থেকে আসা, সুতরাং তাদের ভারতের মাটিতে থাকার কোনো সুযোগ নেই। তারা আরও বলে, পৃথিবীতে ৫৮টি মুসলিম রাষ্ট্র রয়েছে। মুসলমানদের এ দুনিয়াতে থাকার জায়গার অভাব নেই। কিন্তু হিন্দুদের দেশ মাত্র একটি। তা হলো ভারত। বিজেপি আরও বিশ্বাস করে অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার নীতিতে। বিজেপির বুদ্ধিজীবী ও কৌশলবিদরা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করছেন, বাংলাদেশের রংপুর ও চট্টগ্রাম অঞ্চল তারা দখল করে নেবেন। বহু বছর ধরে স্বাধীন বঙ্গভূমির নামে বাংলাদেশকে টুকরো করে হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক রাজ্য সৃষ্টির আন্দোলন চালিয়ে গেছেন কালিদাস বৈদ্য এবং চিত্তরঞ্জন ছুতার। ১৯৭১-এ শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রলীগের নেতাদের পাক আর্মির ক্র্যাক ডাউন হলে কলকাতায় গিয়ে ১০ রাজেন্দ্র নারায়ণ রোডে চিত্তরঞ্জন ছুতারের বাড়িতে যোগাযোগ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ কথা পরলোকগত ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ একাধিকবার বলেছেন। এখন এসব টুকরো কাহিনি একসঙ্গে করলে একটি পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রেরই আভাস পাওয়া যায়। এ কথা তো ভারতের পার্লামেন্টে ইন্দিরা গান্ধীর নাতনি প্রিয়াংকা গান্ধী এক ভাষণে কবুল করে নিয়েছেন।

ভারত শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি আগ্রাসী মনোভাব পোষণ করে না। ভারতীয় শাসকগোষ্ঠীর আগ্রাসী মনোভাব ভারতের অভ্যন্তরে অনেক রাজ্যের ওপর জারি রয়েছে। আমরা দৃষ্টান্ত হিসাবে কাশ্মীর, খালিস্তান, সাত বোনের অঞ্চল উত্তর-পূর্ব ভারত ও মনিপুরের কথা বলতে পারি। যে ভারত প্রতিবেশী দেশগুলো ও নিজ দেশের বেশকিছু জাতিগোষ্ঠীর ওপর অন্যায়-অবিচার চাপিয়ে দিতে চায়, সেই ভারতের ঐক্য ও অস্তিত্ব আগামী দিনগুলোতে অনিশ্চিত না হয়ে আর কী হতে পারে? সম্ভবত বছরদুয়েক আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মন্তব্য করেছিলেন, যে ভারতে অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা সংকুচিত হয়ে পড়েছে, সে ভারত একদিন অনিবার্যভাবে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে পড়বে। ওবামার এ মন্তব্যে নরেন্দ্র মোদির সরকার ও ভারতীয় বুদ্ধিজীবীরা চরম উষ্মা প্রকাশ করেছেন।

বিদ্যা কৃষ্ণণের লেখা থেকে জানা যায়, ‘নরেন্দ্র মোদি নিজেকে আজ যেভাবে কোণঠাসা অবস্থায় আবিষ্কার করেছেন, সেনা-পুলিশের ব্যারিকেডের আড়ালে আত্মরক্ষা করছেন এবং যে তরুণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখোমুখি হচ্ছেন-যাদের কাছে গণতন্ত্রের এই তিলে তিলে ধ্বংসের পর হারানোর আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, ভয় পাওয়ারও কিছু নেই-তার পেছনে ১২ বছর ধরে লাগাতার পালক উপড়ানোর ইতিহাস রয়েছে।

ভোটার তালিকা থেকে নাম ছেঁটে ফেলার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ১০ অক্টোবর আয়োজিত বিশাল এক বিক্ষোভের মুখোমুখি হয়ে মোদি নিজের ভুলগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছেন। তার সরকার দেশজুড়ে যেসব কঠোর পদক্ষেপ জারি করেছে, তা যেন ৭০ দশকের সেই জরুরি অবস্থার দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দেয়।’

জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন মিসেস ইন্দিরা গান্ধী। সেসময় নির্মমভাবে নির্যাতিত হয়েছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকসহ স্বাধীন মত পোষণকারী বুদ্ধিজীবীরা। এখন বিদ্যা কৃষ্ণণের মতো কলাম লেখকরা ভারতের বর্তমান অবস্থাকে ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি শাসনামলের সঙ্গে তুলনা করেছেন। সেসময় কোনো রাজনৈতিক দলের নেতার পক্ষে মাথা তুলে দাঁড়ানো মোটেও সহজ ছিল না। বিরোধীরা সর্বজনশ্রদ্ধেয় জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে প্রতিবাদ-সংগ্রাম শুরু করেছিল। বলা হয়ে থাকে, ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। আসলে কি তাই? ভারতীয় শাসকদের স্বৈরাচারী রূপ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তেলেঙ্গনার কৃষক বিদ্রোহ দমনে, লক্ষ করেছি চরম নির্দয়ভাবে কাশ্মীরিদের আজাদি আন্দোলন দমনে, আমরা আরও লক্ষ করলাম জরুরি শাসনের ভয়াবহ দিনগুলো। এবার নরেন্দ্র মোদি নিজের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য চরমভাবে মারমুখী হয়ে উঠেছেন। সমাবেশ শুরু হওয়ার আগেই ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের শীর্ষ ও পরিচিত মুখ- রত্না সিং, অভিজিৎ দীপকে ও ধ্রুব রাঠিকে আটক করা হয়। আটক করা হয়েছে গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীসহ আরও বহু স্বনামধন্য অধিকার কর্মীকে। তা সত্ত্বেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারী দিল্লির রাজপথে নেমে আসেন এবং নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলগুলোয় পৌঁছানোর চেষ্টা চালান। ভারতজুড়ে একের পর এক শহরে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখা গেছে। বিক্ষোভকারীদের নির্ধারিত স্থান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলেও তারা কোনোভাবেই রাজপথ ছাড়তে রাজি ছিলেন না।

বিদ্যা কৃষ্ণণের মতে, সরকারের এসব বলপ্রয়োগ মোদির এমনিতেই নড়বড়ে হয়ে পড়া রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। তার সমালোচকরা এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলছেন-প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মোদি আদৌ আর যোগ্য কিনা।

ভারতকে পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্রের যে তকমা দেওয়া হয়েছিল, তা কতটুকু সঠিক? ব্যক্তির শাসন স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠে এমন দৃষ্টান্ত আমরা পৃথিবীর অনেক দেশেই দেখেছি। বাংলাদেশের শেখ হাসিনা ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে এমন একজন ফ্যাসিস্ট শাসকে পরিণত হয়েছিলেন। অনেকে ভেবেছিলেন, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের আর অবসান হবে না। কিন্তু এরও অবসান হয়েছে। হাসিনা তার প্রভুর দেশ ভারতে পালিয়ে গেছেন। ব্যক্তির অসহিষ্ণু আচরণের মধ্য দিয়ে যেমন স্বৈরশাসনের উৎপত্তি হতে পারে, ঠিক তেমনি সমাজের অন্তস্থিত চরিত্রের কারণে একটি দেশে বা সমাজে স্বৈরতন্ত্রের উদ্ভব ঘটতে পারে। এ ধরনের সমাজ স্বৈরতন্ত্রপ্রবণ। ভারতকে দেখে সেরকমই মনে হয়। প্রশ্ন হলো, নরেন্দ্র মোদিকে শেখ হাসিনার মতো ভাগ্যবরণ করতে হবে কিনা। তবে এ কথা নিশ্চিত যে, নরেন্দ্র মোদি ভারতে হিন্দু ফ্যাসিবাদের শাসন কায়েম করতে চেয়েছেন প্রথম দিন থেকেই।

ড. মাহবুব উল্লাহ : জাতীয় অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

শতফুল ফুটতে দাও মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

মোদির শাসন অবসান হচ্ছে!

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সীমা ও জাতীয় মর্যাদা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

ডেঙ্গু : অসংক্রমণের সঙ্গে সংক্রমণের ভয়াবহতা

অন্যমত স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

স্থবির শেয়ারবাজারকে টেনে তুলতে যা প্রয়োজন

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম