পূর্ণ শক্তির সার্ক আগের চেয়েও জরুরি
Advertisement
ড. একেএম আহসান উল্লাহ
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল, সবচেয়ে তরুণ, সবচেয়ে সম্ভাবনাময়, অথচ সবচেয়ে কম সংযুক্ত অঞ্চলগুলোর একটি। এখানে ইতিহাস আছে, সভ্যতা আছে, নদী আছে, পাহাড় আছে, সমুদ্র আছে, শ্রম আছে, বাজার আছে, মেধা আছে; কিন্তু নেই পর্যাপ্ত আঞ্চলিক আস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ, নীতিগত সমন্বয় এবং সম্মিলিত কূটনৈতিক কণ্ঠ।
এ অভাবের নামই আজ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক দুর্বলতা। সার্ক এ দুর্বলতাকে শক্তিতে রূপান্তর করার সবচেয়ে স্বাভাবিক, সবচেয়ে ঐতিহাসিক এবং সবচেয়ে প্রয়োজনীয় মঞ্চ হতে পারত; কিন্তু দীর্ঘদিন সার্ক প্রায় নিস্তব্ধ, যেন একটি ঘর আছে, দরজা আছে, টেবিল আছে, পতাকা আছে, কিন্তু কথোপকথন নেই।
আজকের বাস্তবতায় সার্ককে পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয় করা কোনো কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, এটি একটি ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন, অর্থনৈতিক জরুরি কাজ এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার প্রশ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্র তার নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, নিজস্ব রাজনৈতিক চরিত্র, নিজস্ব কূটনৈতিক অগ্রাধিকার অক্ষুণ্ন রেখেই আঞ্চলিক সহযোগিতায় প্রবেশ করতে পারে।
সার্ক মানে জাতীয় পরিচয় বিলীন করা নয়; সার্ক মানে জাতীয় শক্তিগুলোকে আঞ্চলিক সক্ষমতায় রূপান্তর করা। এক বাজার মানে এক জাতি নয়, এক কণ্ঠ মানে এক মত নয়, এক অঞ্চল মানে, একরূপতা নয়। বরং একটি পরিণত আঞ্চলিকতা হলো-বৈচিত্র্যকে অস্বীকার না করে তাকে সমন্বয়ের শক্তিতে পরিণত করা।
আঞ্চলিকতা বনাম সার্বভৌমত্ব : ভুল দ্বন্দ্ব : সার্ক নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো-আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়লে নাকি জাতীয় সার্বভৌমত্ব কমে যায়। বাস্তবে তা নয়। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সার্বভৌমত্বের অর্থ আর শুধু সীমান্ত পাহারা দেওয়া নয়; সার্বভৌমত্বের অর্থ হলো, নিজের জনগণের জন্য খাদ্য, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, বাজার, নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার সক্ষমতা। কোনো রাষ্ট্র একা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে না। তাই সহযোগিতা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং কৌশলগত পরিপক্বতার পরিচয়।
এক বাজার : দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো-এখানে বিপুল জনসংখ্যা, বিশাল বাজার, দ্রুতবর্ধনশীল মধ্যবিত্ত, সস্তা শ্রম, কৃষি ও শিল্পের সম্ভাবনা আছে; কিন্তু দেশগুলো পরস্পরের সঙ্গে যথেষ্ট বাণিজ্য করে না। অনেক ক্ষেত্রে পাশের দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করার চেয়ে দূরের দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা সহজ।
পণ্য সীমান্তে আটকে থাকে, কাস্টমস জটিল, ভিসা কঠিন, রাজনৈতিক অবিশ্বাস বড়, আর পরিবহণ সংযোগ দুর্বল। ফলে অঞ্চলটি সম্ভাবনার চেয়ে অনেক কম উৎপাদন করে, কম রপ্তানি করে, কম বিনিয়োগ আকর্ষণ করে এবং কম কর্মসংস্থান তৈরি করে।
সার্ককে পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয় করার প্রথম ধাপ হওয়া উচিত একটি বাস্তববাদী আঞ্চলিক অর্থনৈতিক চুক্তি, যেখানে অগ্রাধিকার পাবে শুল্ক সহজীকরণ, সীমান্ত অবকাঠামো, ডিজিটাল কাস্টমস, আঞ্চলিক পেমেন্ট ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার বাজার প্রবেশ, নারী উদ্যোক্তাদের আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম, কৃষিপণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল, এবং ই-কমার্সের সীমান্ত পারাপার নিয়ম। এক বাজার মানে সবাই একই মুদ্রা ব্যবহার করবে বা একই অর্থনীতি হয়ে যাবে-তা নয়।
এর অর্থ হলো দক্ষিণ এশিয়ার উৎপাদক, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, ছাত্র, গবেষক, পর্যটক ও উদ্ভাবকের জন্য আঞ্চলিক দরজা খুলে দেওয়া। বাংলাদেশের পোশাক, ভারতের ওষুধ ও প্রযুক্তি, শ্রীলংকার সেবা অর্থনীতি, নেপালের জলবিদ্যুৎ, ভুটানের সবুজ শক্তি, মালদ্বীপের পর্যটন, পাকিস্তানের কৃষি ও টেক্সটাইল, আফগানিস্তানের ভৌগোলিক সংযোগ-সব মিলিয়ে একটি আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খল তৈরি হতে পারে। এতে কারও দেশ ছোট হয় না; বরং প্রত্যেকে নিজের শক্তিকে বড় বাজারে ব্যবহার করতে পারে।
নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত নয় : দক্ষিণ এশিয়ায় নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ছিল সীমান্ত, সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সন্ত্রাসবাদ, বিদ্রোহ, রাষ্ট্রীয় সন্দেহ এবং দ্বিপাক্ষিক বিরোধ। এগুলো বাস্তব সমস্যা, কিন্তু নিরাপত্তার পূর্ণ চিত্র নয়। আজ জলবায়ু পরিবর্তন নদী বদলাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড় মানুষকে স্থানচ্যুত করছে, পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস বাড়ছে, নগর অভিবাসন চাপ তৈরি করছে, খাদ্যদ্রব্যের দাম রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করছে, ডিজিটাল প্রতারণা সীমান্ত মানছে না, মহামারি দেখিয়েছে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এক দেশের ভেতর আটকে থাকে না।
এ বাস্তবতায় সার্কের অধীনে আঞ্চলিক দুর্যোগ তহবিল, খাদ্য মজুত ব্যবস্থা, জলবায়ু অভিযোজন গবেষণা নেটওয়ার্ক, স্বাস্থ্য জরুরি প্রতিক্রিয়া কেন্দ্র, শ্রম অভিবাসন তথ্যভান্ডার, সীমান্তাঞ্চল উন্নয়ন ফোরাম, নদী ও পরিবেশ সংলাপ-এসবকে রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে এনে কার্যকর করা দরকার। যেখানে বড় রাজনৈতিক বিরোধ অমীমাংসিত থাকলেও ছোট; কিন্তু জরুরি ক্ষেত্রে সহযোগিতা চালু থাকে।
সার্কের স্থবিরতার বড় কারণ ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব-এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই; কিন্তু সার্ককে শুধু এ দ্বন্দ্বের বন্দি করে রাখাও একটি কৌশলগত ভুল। দক্ষিণ এশিয়ার সব সম্পর্ক ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নয়। বাংলাদেশ-নেপাল-ভুটান-ভারত জ্বালানি সহযোগিতা, শ্রীলংকা-মালদ্বীপ সামুদ্রিক অর্থনীতি, বাংলাদেশ-শ্রীলংকা শ্রম ও শিক্ষা সংযোগ, নেপাল-ভুটান-ভারত-বাংলাদেশ পরিবহণ করিডর-এসব ক্ষেত্র এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
এখানে নমনীয় আঞ্চলিকতার মডেল গ্রহণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ, সব দেশ সব প্রকল্পে একসঙ্গে যুক্ত না হলেও যারা প্রস্তুত, তারা এগোবে; পরে অন্যরা যোগ দিতে পারবে। আসিয়ানের মধ্যেও সব ক্ষেত্রে একই গতিতে অগ্রগতি হয়নি। ইউরোপেও একক মুদ্রা, শেনজেন, নিরাপত্তা সহযোগিতা-সব সদস্যের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। দক্ষিণ এশিয়াতেও ধাপে ধাপে, বিষয়ভিত্তিক, বাস্তববাদী সহযোগিতা দরকার।
সার্কের কাঠামো থাকবে ছাতার মতো; তার নিচে উপ-আঞ্চলিক ও খাতভিত্তিক উদ্যোগ এগোবে। বাংলাদেশের জন্য সার্ক পুনরুজ্জীবন শুধু পররাষ্ট্রনীতির একটি রোমান্টিক অধ্যায় নয়; এটি অর্থনীতি, নিরাপত্তা, অভিবাসন, বাণিজ্য, জলবায়ু এবং আঞ্চলিক মর্যাদার প্রশ্ন। বাংলাদেশ একটি জনবহুল, দ্রুত নগরায়িত, রপ্তানিনির্ভর এবং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র। তার প্রয়োজন বড় বাজার, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, দক্ষ শ্রম চলাচল, আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল, নিরাপদ সীমান্ত এবং বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য।
বাংলাদেশ যদি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে, তাহলে প্রতিটি বিষয়ে আলাদা আলাদা দর-কষাকষি করতে হবে; কিন্তু সার্ক সক্রিয় হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদন, ট্রানজিট, বন্দর, নদীপথ, নীল অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং শ্রম অভিবাসন বিষয়ে বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হতে পারে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশকে সংযোগকারী রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে-দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মাঝামাঝি এক কৌশলগত অবস্থানে।
সার্ক পুনরুজ্জীবনের রূপরেখা : সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে শুধু শীর্ষ সম্মেলন করলেই হবে না। প্রয়োজন কার্যকর, পরিমাপযোগ্য এবং জনগণমুখী কর্মসূচি। প্রথমত, নিয়মিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক পুনরায় চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় বাদ দিয়ে শুরুতে স্বাস্থ্য, দুর্যোগ, শিক্ষা, কৃষি, জলবায়ু, পর্যটন ও ডিজিটাল সংযোগে দ্রুত অগ্রগতি আনতে হবে।
তৃতীয়ত, সার্ক সচিবালয়কে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান না রেখে নীতি-গবেষণা, ডাটা, পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়ন মূল্যায়নের ক্ষমতা দিতে হবে। চতুর্থত, ‘SAARC Business and Mobility Card’ চালু করা যেতে পারে, যা ব্যবসায়ী, গবেষক, শিক্ষক, চিকিৎসক, শিল্পী, শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীদের জন্য সহজ ভ্রমণ ব্যবস্থা দেবে। পঞ্চমত, সার্ক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দক্ষিণ এশিয়া সম্পর্কে জ্ঞান উৎপাদন দক্ষিণ এশিয়ার ভেতর থেকেই হয়। ষষ্ঠত, সার্কের অধীনে অভিবাসী শ্রমিক সুরক্ষা নিয়ে একটি আঞ্চলিক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন, কারণ দক্ষিণ এশিয়ার লাখ লাখ মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে শ্রম দেন, অথচ তাদের সুরক্ষার কূটনৈতিক ভাষা এখনো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।
দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ একসঙ্গে : সার্ককে পূর্ণ শক্তিতে সক্রিয় করা মানে অতীতের নস্টালজিয়া নয়; এটি ভবিষ্যতের বাস্তববাদ। আজকের বিশ্বে অঞ্চলগুলোই শক্তির নতুন একক হয়ে উঠছে। আসিয়ান নিজের কেন্দ্রীয়তা তৈরি করেছে, ইউরোপ একক বাজারের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রভাব গড়েছে, আফ্রিকাও মহাদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য এলাকার দিকে এগোচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়া যদি এখনো সন্দেহ, স্থবিরতা এবং দ্বিপাক্ষিক অচলাবস্থার বন্দি থাকে, তাহলে তার জনসংখ্যা শক্তি হবে না, বোঝা হবে; তার বাজার সম্ভাবনা হবে না, অপচয় হবে; তার ভূরাজনীতি সুযোগ হবে না, চাপ হবে।
সার্কের পুনর্জাগরণ মানে এক পতাকার নিচে সবাইকে দাঁড় করানো নয়; বরং বহু পতাকার মর্যাদা রেখে একটি আঞ্চলিক দিগন্ত তৈরি করা। প্রত্যেক দেশ তার নিজস্ব ইতিহাস, জাতীয় স্বার্থ, রাজনৈতিক স্বাধীনতা এবং কূটনৈতিক পরিচয় বজায় রাখবে। কিন্তু যখন জলবায়ু দরজায় কড়া নাড়ে, বাজার ভেঙে যায়, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে, শ্রমিক বিদেশে অনিরাপদ থাকে, মহাশক্তির প্রতিযোগিতা অঞ্চলকে টেনে নেয়, তখন একা থাকার অহংকার রাষ্ট্রনীতির পরিপক্বতা নয়।
দক্ষিণ এশিয়ার সামনে এখন দুটি পথ : বিচ্ছিন্ন দুর্বলতা, অথবা সংযুক্ত শক্তি। সার্ক সেই দ্বিতীয় পথের দরজা। দরজাটি বহুদিন ধরে বন্ধ। এখন সময় হয়েছে সেটি খুলে দেওয়ার-সতর্কভাবে, বাস্তববাদীভাবে, মর্যাদার সঙ্গে, কিন্তু পূর্ণ শক্তিতে। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ শুধু সীমান্তে লেখা হবে না; তা লেখা হবে সংযোগে, সহযোগিতায় এবং এক বাজার, বহু পরিচয়, এক কূটনৈতিক কণ্ঠের সাহসী কল্পনায়।
ড. একেএম আহসান উল্লাহ : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক, নিরাপত্তা ও অভিবাসন, ইউনিভার্সিটি অব ব্রুনেই দারুসসালাম, ব্রুনেই
