Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নিউইয়র্কের চিঠি

ড. ইউনূসকে ঘিরে আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রচর্চা

Advertisement

Icon

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

গত সেপ্টেম্বরের শেষার্ধজুড়ে নিউইয়র্ক মহানগরী বাংলাদেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং দুই বছরের বেশি সময় আগে ন্যক্কারজনকভাবে ক্ষমতাচ্যুত দল আওয়ামী লীগের স্থানীয় অনুসারীরা চরম উত্তেজনার মধ্যে কাটিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিতে আগত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হোটেলের সামনে প্রায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অশ্রাব্য ভাষায় চিৎকার করেছে, দৃষ্টিকটু অঙ্গভঙ্গি করেছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির উত্তেজিত সমর্থকরা হাতাহাতিতে লিপ্ত হওয়ার পর্যায়ে এলে তাদের দূরে ঠেলে রাখতে নিউইয়র্ক পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়েছে। তারেক রহমান নিউইয়র্ক ছেড়ে যাওয়ার পর দুই দলের প্রবাসী সমর্থকদের উত্তেজনাও স্তিমিত হয়ে গেছে।

চলতি অক্টোবরে প্রথম সপ্তাহ ভালোভাবেই কেটেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রায় সাড়ে ৩৫ হাজার সদস্যের সংগঠন ‘বাংলাদেশ সোসাইটি’র নির্বাচন নিয়ে মেতে আছে সবাই। আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় সোসাইটির নির্বাচন ঘিরে মহানগরীর বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে উৎসবের আমেজ। এরই মধ্যে নির্বাচনি আমেজ ছাপিয়ে প্রবাসীদের আলোচনা ও বিতর্কের মোড় ঘুরে গেছে নির্বাচনবহির্ভূত একটি ঘটনার দিকে। বাংলাদেশেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে ঘটনাটি। গত ১২ অক্টোবর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী (আগস্ট ৮, ২০২৪-ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬) সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা, নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নিউইয়র্কের জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের খবর যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাকর্মী কোনোভাবে পান। তারা তাকে অপদস্থ করার প্রস্তুতি নিয়ে বিমানবন্দরের লবিতে অপেক্ষা করেন এবং হুইলচেয়ারে তাকে ঠেলে নেওয়ার সময় তারা নানা অশোভন আচরণ ও কটূক্তি করে তাকে হেনস্তা করেন।

দেশে হোক, বিদেশে হোক, আওয়ামী লীগের অপছন্দনীয় যে কোনো ব্যক্তি, তারা যত খ্যাতির অধিকারী, সর্বজনশ্রদ্ধেয় ও বিশ্ববরেণ্য হোন না কেন, তাদের অপমান ও হেনস্তা করাকে আওয়ামী লীগের অনুসারীরা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার বলে বিবেচনা করেন। ড. ইউনূসকে নাগালের মধ্যে পেয়ে তাকে অপমান, অপদস্থ করাও ছিল তাদের ওপর সেই অধিকার প্রয়োগের কিঞ্চিৎ নমুনা। তারা তাকে অপমান করবে না তো, কে করবে! কারণ তারা নিজেদের ছাড়া আর কোনো ব্যক্তিকে এবং আওয়ামী লীগ ছাড়া আর কোনো দলকে বাংলাদেশ নামের ভূখণ্ডটির ক্ষমতার আসনে দেখতে চায় না এবং কাউকে সহ্য করতে পারে না। তারা নিজেদের ছাড়া আর কাউকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের রক্ষক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহক ভাবতে অভ্যস্ত নয়। তারা ভাবে, স্বাধীনতার যা কিছু ফসল ও ফলমূল, তারা একাই তা খাওয়ার একমাত্র ও একচ্ছত্র অধিকারী। দেশের ‘চব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়’ যা কিছু আছে, সব তারাই খাবে, ভোগ করবে। সবকিছুরই হকদার তারা। কারণ এ দেশ তাদের পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের ও তার কন্যা শেখ হাসিনার!

আওয়ামী লীগের নবীন-প্রবীণ সবার ঔদ্ধত্যপূর্ণ কথাবার্তার ধারায় অনেক সময় মনে হয়, মহান সৃষ্টিকর্তা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে বঙ্গোপসাগরের বদ্বীপে দেশটি সৃষ্টি করেছিলেন। তাকে ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা নাকি কল্পনাই করা যেত না। যদিও বিশ্ব ইতিহাস বলে, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এযাবৎ এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার ১০৫টি দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে, কিন্তু বাঙালির আওয়ামী অংশ অন্য জাতির শৌর্যের কাহিনি মেনে নিতে অনভ্যস্ত। তারা শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনার অসার দম্ভপূর্ণ বক্তৃতাকেই ইতিহাস বিবেচনা করে। শেখ হাসিনা স্যাটেলাইট টিভি না দিলে বাঙালি জানতই না স্যাটেলাইট টিভি কী বস্তু! তিনি ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন না দিলে বাংলাদেশে এসব চিজের কেউ দেখা পেত না বলে তার দাবিকেও তাদের অনুসারীরা যথার্থ বলে শুধু যে বিশ্বাস করে, তাই নয়-জোর গলায় এসব কথা প্রচারও করে। সভ্যতার বিকাশ, বিজ্ঞানের উদ্ভাবন যে কোনো না কোনোভাবে বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বেই, যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী না হলেও বাংলাদেশে চালু হতো, তা আওয়ামী রাজনীতিতে অন্ধ কারও বোঝার সাধ্য নেই। একটি গোষ্ঠীকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী দলান্ধে পরিণত করতে পারাই আওয়ামী লীগের সাফল্য। কিন্তু উন্নত বিশ্বে বসবাস করার পরও যে আওয়ামী অনুসারীদের অন্ধত্ব ঘোচেনি, এটাই বিস্ময়ের ব্যাপার। যতদিন তাদের এ অবস্থা দূর হয়ে মস্তিষ্কে বুদ্ধির আলো প্রবেশ না করবে, ততদিন ড. ইউনূস হোন অথবা তাদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ খ্যাতিমান যে কেউ হোন, তারা তাদের হেনস্তা করে পরমানন্দ লাভ করতেই থাকবেন।

এটা সত্য, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গৃহীত কিছু সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ শেখ হাসিনা ও তার পরিবার এবং আওয়ামী নেতা ও তাদের দোসরদের ‘বাড়া ভাতে ছাই দেওয়া’র মতো ছিল। আওয়ামী লীগ যদি জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে, দেড় বছরের একটি সাময়িক সরকারের পক্ষে যদি দেশের সবকিছু বরবাদ করে ফেলা সম্ভব হয়, তাহলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি ফ্যাসিস্ট সরকার টানা চার মেয়াদ ক্ষমতায় থাকাকালে দেশ ও জনগণের কতটা সর্বনাশ করেছে। অন্যের ললাটে কলংকতিলক টেনে দেওয়ার আগে আওয়ামী অনুসারীরা যদি স্বচ্ছ অন্তকরণে একবার আত্মসমালোচনা করতেন, আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখতেন, তাহলে দেখতে পেতেন তারা কী কী অপকর্ম করার কারণে আজ নিন্দিত, ধিকৃত। এতে তাদের হৃদয়ে কিছুটা পরিবর্তন ঘটতেও পারত।

ড. ইউনূস ও অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপে আওয়ামী লীগের স্বার্থে আঘাত লাগতেই পারে। তাদের বহু নেতাকর্মী ও আওয়ামীপন্থি বুদ্ধিজীবী গ্রেফতার হয়েছেন বা আত্মগোপনে আছেন। অনেকের ব্যবসা লাটে উঠেছে বা দখল হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কবে কোন উদার সরকারের আবির্ভাব ঘটেছিল, যারা তাদের পূর্ববর্তী সরকার, যারা সদ্য ক্ষমতার মসনদ থেকে ছিটকে পড়েছে, তাদের বিরুদ্ধে গাদা-গাদা অভিযোগ এনে মামলা করেনি? আওয়ামী লীগ সরকার ড. ইউনূসকে চোর, গরিবের রক্তচোষা দানব অভিযুক্ত করে তাকে সিঁড়ি ডিঙিয়ে আটতলায় আদালতে উঠিয়েছে! যেখানে-সেখানে তাকে অপদস্থ করার জন্য ফাঁদ পেতে রেখেছে। কিন্তু ইতিহাসের নানা পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেট অর্জন কী? ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট! ২০২৪-এর ৫ আগস্ট! দেশান্তরী হওয়া! হত্যা, গুম, অর্থ পাচার, জবরদখলের হাজারটা মামলায় অভিযুক্ত! মৃত্যুদণ্ডের রায়! যদিও তারা ‘ফাঁসির মঞ্চে জীবনের জয়গান’ গাওয়ার অথবা ‘রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেওয়ার’ জন্য সদা প্রস্তুত, কিন্তু হিজরত করে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দিতেই দুই বছর কাটিয়ে দেওয়ার মধ্যে জীবন দেওয়ার প্রতিশ্রুতির প্রতি তাদের সততার প্রমাণ মেলে না।

কৃষকের গরু হারালে সে তালজ্ঞান হারিয়ে নিজের স্ত্রীকে ‘মা’, আর বাপকেও ‘ভাই’ ডাকে। আওয়ামী লীগের বিপরীত অবস্থা। নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে একা সঙ্গীহীন অবস্থায় পেয়ে তাদের মনে উল্লাস জেগেছে যে, তারা তাদের হারানো বা গোয়াল থেকে পালানো গরু ফিরে পেয়েছে। তাকে আচ্ছামতো হেনস্তা করতে পেরে তারা মহাখুশি। যেন একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের আনন্দ-উল্লাসের ৫৫ বছর পর তাদের ভাগ্যে আবার সেই উল্লাসে উচ্ছ্বসিত হওয়ার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু তারা তাদের আচরণের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেছেন, প্রকৃত অর্থেই তারা শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা বন্দনায় নিজেদের বিলীন করা তালজ্ঞানহীন ‘ফানা ফিল্লাহ’ টাইপের মুরিদ। ইতিহাস অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাগদাদ নগরী থেকে আগত সুফি শেখ আউয়ালের অষ্টম বংশধর। সুফি মানেই আশেকান-মুরিদান পরিবৃত থাকা। অন্ধ মুরিদরা যা করেন, আওয়ামী লীগের অনুসারীরা তা-ই করেন ও করেছেন। বিদেশের মাটিতে বরেণ্য একজন মানুষের প্রতি তাদের অশোভন আচরণে দেশের ভাবমূর্তি কোথায় যায়, তা তাদের বিবেচনায় থাকে না। আওয়ামী লীগ যদি সত্যিই মানুষের জন্য রাজনীতি করত, তাহলে উপলব্ধি করতে সক্ষম হতো যে, ড. ইউনূসকে হেনস্তা করে তারা যে মাত্রায় সন্তুষ্ট, ২০২৪ সালের আগস্টে জনগণ তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি সন্তুষ্ট হয়েছিল তাদের ক্ষমতাচ্যুত হতে দেখে। যে কথাগুলো ইউনূসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে তারা বিশ্বাস করে, সেগুলো কি আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে অধিক প্রযোজ্য নয়?

আওয়ামী মনস্তত্ত্বে যা খুশি তা করার অধিকার চর্চা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পেতে দলটির জন্মকাল থেকে তাদের আচরণ সম্পর্কে জানা আবশ্যক। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা পালনকারীদের অন্যতম হলেও তিনি দলের কোনো পদাধিকারী ছিলেন না। তবে দলের একটি অংশের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার ভূমিকায় আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানীসহ একাংশের মনে হয় সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে অনুদার এবং পশ্চাৎমুখী হয়ে পড়েছেন। ভাসানী আওয়ামী লীগ ছেড়ে ‘ন্যাপ’ গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৫৭ সালের ২৫ জুলাই ঢাকার ‘রূপমহল’ সিনেমা হলে ন্যাপের কনভেনশন আয়োজন করা হলে সোহরাওয়ার্দীপন্থিরা হামলা চালিয়ে কনভেনশন পণ্ড করে এবং পল্টন ময়দানে ন্যাপের জনসভায় হামলা চালিয়ে সভাও পণ্ড করে দেয়। যে ভাসানী ক’দিন আগেও দলের সভাপতি ছিলেন, তাকে হেনস্তা করতে আওয়ামী লীগ দ্বিধা করেনি।

১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়ী হয়। যুক্তফ্রন্টে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল ছিল কেএসপি এবং আওয়ামী লীগ। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি গভর্নর সুলতানউদ্দিন আহমেদ উভয় দলের নেতাদের কাছে তাদের দলভুক্ত প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের নামের তালিকা চাইলে তাকে যে তালিকা সরবরাহ করা হয়, তাতে কিছু সদস্যের নাম উভয় দলের তালিকায় দেখে তিনি বিস্মিত হন। তিনি নেতাদের ডেকে তাদের দাবির যথার্থতা প্রমাণ করতে বলেন। উভয় দল দোদুল্যমান সদস্যদের গভর্নরের সামনে নিয়ে তাদের স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা চালাতে শুরু করে। এ সম্পর্কে গভর্নরের এডিসি মেজর এসজি জিলানি তার ‘ফিফটিন গভর্নরস আই সার্ভড উইথ : আনটোল্ড স্টোরি অফ ইস্ট পাকিস্তান’ গ্রন্থে লিখেছেন : ‘একদিন সকালে কেএসপি নেতা ও কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য মি. আলীকে গভর্নরের সামনে হাজির করে বলেন, মি. আলী কেএসপির সদস্য এবং আওয়ামী লীগ তাকে তাদের সদস্য বলে যে দাবি করছে, তা সত্য নয়। রাত সাড়ে ১১টার দিকে আমি দ্রুতবেগে দুটি গাড়ি আসতে দেখি।’

মেজর জিলানি আরও লিখেছেন : ‘গাড়ি থেকে প্রথম নামেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। তার পেছনে অন্যদের মধ্যে আমি কেবল মি. আলীকে চিনতে পারি, যিনি সকালে গভর্নমেন্ট হাউজে এসেছিলেন। মাথার এলোমেলো চুলে ও লুঙ্গি পরা অবস্থায় তাকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরও দুই ব্যক্তি তাকে সঙ্গে নিয়ে গভর্নরের পাঠকক্ষে যান, অন্যরা বাইরে অপেক্ষা করেন। আমার এক সহকর্মী ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে দর্শনার্থীদের মধ্যে কিবরিয়া নামে একজন তাকে বলেন, মি. আলী সকালে গভর্নমেন্ট হাউজে এসে কেএসপির পক্ষে তার সমর্থনসূচক স্বাক্ষর দিয়েছেন বলে জানার পর আওয়ামী লীগ নেতারা ঘণ্টাখানেক আগে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে পিটিয়েছে, হুমকি দিয়েছে এবং এখন সঙ্গে এনেছে কেএসপির প্রতি তার সমর্থন প্রত্যাহার করানোর জন্য। আমি গভর্নরের পাঠকক্ষে প্রবেশ করে মি. আলীকে গভর্নরের কাছে বলতে শুনি যে, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী আবদুল লতিফ বিশ্বাস সকালে তাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জবরদস্তি করে নিয়ে এসেছিলেন, আসলে তিনি আওয়ামী লীগের লোক এবং এখন তিনি তার ভুল সংশোধন করতে এসেছেন।’

আওয়ামী লীগের সূচনাকালের মারপিট ও জবরদস্তির যে চিত্র ছিল, তা কখনো বদলায়নি, বরং সময়ের ব্যবধানে যে আরও বিকশিত হয়েছে, সেসব দৃষ্টান্তে কোনো ঘাটতি নেই। তারা অন্যদের তো ছাড়েই না, পেটানোর ও খুন-জখমের জন্য কাউকে না পেলে নিজেরাই নিজেদের ওপর চড়াও হয়, যার একটি দৃষ্টান্ত ছিল ১৯৭৪ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মহসীন হলের সামনে ছাত্রলীগের কিছু নেতার দ্বারা তাদেরই ৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা। আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী ছিলেন মিজানুর রহমান চৌধুরী, এরশাদের জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে তার সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এরশাদের পতনের পর এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ১৯৯১ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক দিতে গেলে ছাত্রলীগের সুসন্তানরা তাকে টেনেহিঁচড়ে কিল-ঘুসি মারে, তার পাঞ্জাবি ছিন্নভিন্ন করে ফেলে। কোনোমতে তিনি রক্ষা পান। এটাই আওয়ামী লীগের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য।

দেশবাসী তাদের চোখের সামনে আওয়ামী লীগকে বারবার চূড়ান্ত পর্যায়ের অন্যায়-অপরাধ করে দেশকে উজাড় করার মতো অবস্থায় ফেলতে দেখেছে। তারা নিজেরাই নিজেদের অপকর্মের শিকারে পরিণত হয়েছে। নিজেদের সৃষ্ট ইতিহাস থেকে তারা কখনো কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। না, পঁচাত্তরে, না চব্বিশের শিক্ষা। যখন আওয়ামী লীগের উচিত তাদের অপরাধের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ভবিষ্যতে অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করার মুচলেকা দেওয়া, তখন দেশে-বিদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড দলটিকে কি খাদের আরও গভীরে ঠেলে দেবে?

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : সিনিয়র সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদে মূল্য সংযোজন ঘটে না

প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদে মূল্য সংযোজন ঘটে না

নিউইয়র্কের চিঠি ড. ইউনূসকে ঘিরে আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রচর্চা

ড. ইউনূসকে ঘিরে আওয়ামী লীগের গণতন্ত্রচর্চা

পূর্ণ শক্তির সার্ক আগের চেয়েও জরুরি

পূর্ণ শক্তির সার্ক আগের চেয়েও জরুরি

সুন্দরবনে হারানো নগরী : ইতিহাসের আরেক অধ্যায়

সুন্দরবনে হারানো নগরী : ইতিহাসের আরেক অধ্যায়

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম