ক্ষমা চাওয়ার আগে পুনর্মিলন হতেই পারে না
Advertisement
ড. মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজনীতি, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতি একটি দেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ গঠনে ও শিক্ষিত জাতি বিনির্মাণে এর বিকল্প নেই। আমাদের দেশে রাজনীতি গণতন্ত্রের প্রাথমিক স্তরে আছে। এখনো আমরা রাজনীতিকে পারস্পরিক সৌহার্দ সৃষ্টির মাধ্যম করতে পারিনি। উলটো রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরকে দোষারোপের রাজনীতি চর্চা করে চলছে। ফলে পরস্পরকে শত্রু হিসাবে চিনছে।
রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন যা হতে পারে নিষিদ্ধ ঘোষিত দল আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন প্রকল্প, তা ‘একটি বায়বীয়’ আলোচনা বলে মনে করা যেতে পারে।
২.
কিন্তু রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলনের প্রথম শর্ত হলো অপরাধীর দোষ স্বীকার। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ আজও স্বীকার করেনি, তারা অপরাধ করেছে; ক্ষমতায় থেকে ১৪০০ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা, ২৪ হাজার মানুষকে পঙ্গু করার পরও সেই দায় কাঁধে নেয়নি। ওই হত্যাযজ্ঞ ২০২৪-এর ১৬ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট সময়ের মধ্যে ঘটেছে। তারপর পালিয়ে গেছে সরকারপ্রধানসহ তার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা লোকরা। এছাড়াও ১৬-১৭ বছরে অনেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হত্যা করেছে, গুম করেছে। দমন আর নির্যাতনের স্বৈরাচারী ইতিহাস সৃষ্টি করেছে; কিন্তু তারা এ হত্যার দায় স্বীকার করেনি, অনুতপ্ত ও অনুশোচনাও করেনি জনসম্মুখে। বরং রাজনৈতিক হুমকি দিয়ে চলেছে ভারতে বসে। আগামী ডিসেম্বরে সশরীরে দলবল নিয়ে ফিরবেন বলে রাজনৈতিক হুমকি দিয়ে চলেছেন। দেশের ভেতরে থাকা কর্মী-সন্ত্রাসীরা নানা অপকর্ম করে পরিস্থিতি ঘোলা করার চেষ্টা করছে। বাসে আগুন দিয়ে, ককটেল-বোমা ফাটিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় তারা নিয়োজিত। তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ, তারপরও যখন এ রকম সন্ত্রাসী কাজ করে, তাহলে বোঝা যায়, তারা অনুতপ্ত নয়, তারা অপরাধ স্বীকার করে না। বরং তাদের লেজুড়রা বলে, হাসিনা কোনো ভুল করেনি, অপরাধ করেনি। এ রকম মনোভঙ্গির পরও কি সরকারের তরফে তাদের প্রতি দরদ দেখাতে চাইবেন? তাদের পুনর্বাসন করতে স্পেস দেবেন?
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত রিকনসিলিয়েশনের কোনো বাস্তবতা তৈরি হয়নি। এখানে তাদেরই দায়িত্ব বেশি, যারা দেশে গণহত্যা চালিয়েছে। আওয়ামী লীগ যদি নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত না হয়, আইনের কাছে আত্মসমর্পণ না করে এবং দেশের বাইরে বসে ষড়যন্ত্র তৎপরতা চালায়; তাহলে এ দেশের জনগণ তা মেনে নেবে না। আর জনগণ না মানলে বিএনপিও তা মেনে নেবে না। তিনি বলেন, ‘রিকনসিলিয়েশন গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ। এর জন্য অনুতপ্ত হতে হয়, ক্ষমা চাইতে হয় এবং আইনের মুখোমুখি হতে হয়। তারা আগে এসব প্রক্রিয়া শুরু করুক। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেদিকে যাচ্ছে না।’
বাংলাদেশে রিকনসিলিয়েশন পরিভাষাটি আলোচনায় আসার পর বিশ্লেষকদের কেউ কেউ দক্ষিণ আফ্রিকা ও রুয়ান্ডার অভিজ্ঞতা সামনে আনছেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মাধ্যমে নাৎসি নেতৃত্বের বিচারের উদাহরণও আলোচনায় আসছে। সমকালীন বিশ্বে রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণগুলোর একটি দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন। বর্ণবাদী শাসনামলে সংঘটিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের কথা তুলে ধরা এবং নির্দিষ্ট শর্তে ক্ষমার সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে দেশটি অতীতের সংঘাত মোকাবিলার চেষ্টা করেছে।
নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এ প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক রূপ দেন। ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘প্রতিশোধ নিলে আমরা কীভাবে ওদের চেয়ে ভালো হলাম।’ তবে দক্ষিণ আফ্রিকার মডেলকে কেবল ‘ক্ষমা করে দেওয়া’ হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। সত্য প্রকাশ, দায় স্বীকার, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং জবাবদিহি-সবই ছিল এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে রুয়ান্ডায় ১৯৯৪ সালের গণহত্যার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং দেশীয় পর্যায়ে গাকাকা আদালতসহ বিভিন্ন বিচারিক প্রক্রিয়া চালু হয়। অর্থাৎ পুনর্মিলনের পাশাপাশি অপরাধের বিচার ও দায় নির্ধারণও চলেছে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নাৎসি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা ও রুয়ান্ডা ছাড়াও সিয়েরা লিওন, ঘানা, কেনিয়া, পেরু, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, নেপাল, শ্রীলংকা, ব্রাজিল, তিউনিসিয়াসহ প্রায় ৪০টি দেশে এ ধরনের কমিশন গঠিত হয়েছে। তবে এসব দেশের অভিজ্ঞতা এক নয়; কোথাও ক্ষমা ও পুনর্মিলনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, কোথাও বিচার ও জবাবদিহি ছিল প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশেও এ ক্ষেত্রে অপরাধ স্বীকার, বিচার, ক্ষতিপূরণ, ক্ষমা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রতিশ্রুতি থাকতে হবে। এগুলো না হলে তা ভবিষ্যতে কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।’
এখন আওয়ামী রাজনৈতিক চেতনার রূপান্তর প্রয়োজন। কারণ তারা গণতন্ত্রের নামে স্বেচ্ছাচারিতা চালিয়েছে। রিকনসিলিয়েশন করতে হলে সবার আগে আত্মোপলব্ধির উদ্বোধন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, রাজনীতিতে ভুল থাকতেই পারে। তারা ভুলকে সংশোধনের পাটাতনে আনলে, সেটা হবে ভালো উদ্যোগ।
জাতির রাজনৈতিক স্টেকহোল্ডার হচ্ছে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো। তারা যদি মনে করে, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরানো যেতে পারে, তাহলে তারাই সিদ্ধান্ত দেবে। বিএনপি ক্ষমতায় বসেছে, সে একা এ কাজ করতে পারে না, পারবে না।
মনে রাখতে হবে, রাজনীতি, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে শত্রুতা চক্রান্তকারীদের সাম্রাজ্য। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ক্রমাগত হুমকির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে সরকারের দিক থেকে ‘রিকনসিলিয়েশন’-এর আলাপ করা কঠিন। তাছাড়া আওয়ামী লীগই তা চাচ্ছে না, রিকনসিলিয়েশন তাদের চাইতে হবে।
রিকনসিলিয়েশনে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকেই সবচেয়ে বড় স্টেকহোল্ডার বলে মনে করা হয়। বিএনপির ৩১ দফা রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবে ‘ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচনের ইশতেহারেও ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি ছিল। বিএনপির বড় একটি অংশ রিকনসিলিয়েশনের পক্ষে বলেও জানা যায়; কিন্তু পালিয়ে যাওয়া মন্ত্রী, এমপি ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সরকারের বিরুদ্ধে নানা মিথ্যা ‘বয়ান’ তৈরি এবং শেখ হাসিনার ক্রমাগত হুমকির কারণে ওই অংশটি এখন আর কথা বলছে না। তাছাড়া সরকার চাইলেও বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি রিকনসিলিয়েশনের ঘোরতর বিরোধী।
৩.
তাহলে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিচ্ছে? পুনর্মিলনের দিকে, নাকি রাজনৈতিক সংঘাতের দিকে। হাসিনার কথিত আগমনের তথ্য জেনে সরকার লুকিয়ে থাকা নেতাকর্মীদের আটক করে চলেছে। যারা ভেবেছিলেন তারেক রহমান সরকার নরম নরম কথা বলে, শক্তিশালী ভূমিকা নিতে পারবে না। তারা এখন কী বলবেন। বলবেন সরকার মানবাধিকার হরণ করতে যাচ্ছে। তাদের কথা বলতে দিচ্ছে না।
অতীতে মানবাধিকারের নামে বহু অপরাধকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করেছে; কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারের কাজে গোলা বাধালে যে আইনের হাত লম্বা হয়ে যাবে, সেটা তারা ভেবে দেখেননি। আইন ব্যক্তিগত নয়, তা রাষ্ট্রের শিরদাঁড়াকে শক্ত ও পোক্ত করে। আইনের আওতায় এলেই আওয়ামী লীগ টের পাবে, তারা কী করেছেন। অপরাধী কখনোই অপরাধ কী এবং কেমন তা বোঝে না, না বোঝার কারণ ক্ষমতার দোর্দণ্ডপ্রতাপ।
ইতিহাস বলে না, যে কোনো পলাতক আবারও ফিরতে পারে ক্ষমা না চেয়ে। আওয়ামী রাজনীতিকে ফিনিক্স পাখির মতো আত্মঅহংকার পুড়িয়ে মেরে নতুন আওয়ামী লীগ সৃষ্টি করতে হবে। এ পথ ছাড়া, মানে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া তারা পুনর্বাসিত হতে পারবে না।
ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক
