নেতানিয়াহুর লক্ষ্য বিরোধীদের পথ রুদ্ধ করাও
Advertisement
তামের আজরামি
প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসরাইলের জনমত জরিপগুলো আমাদের অনেক কথাই বলে, কিন্তু তা কখনোই পুরো চিত্রটি তুলে ধরে না। কখনো মনে হয়, নেতানিয়াহুর জোট আবারও ক্ষমতায় ফেরার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, আবার কখনো গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন ‘পরিবর্তন’ জোটটিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। তবে জরিপের এ ক্রমাগত ওঠা-নামার আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও বড় বাস্তবতা : নেতানিয়াহু বা তার বিরোধী পক্ষ-কারোর জন্যই সরকার গঠনের পথ মসৃণ নয়। আর ঠিক এখান থেকেই সংকটের সূচনা।
সমস্যাটা শুধু আসনের সংখ্যায় নয়; আসল বিষয় হলো, কে এ আসনগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারে রূপান্তর করতে পারবে। নেতানিয়াহু জানেন, তার জোট হয়তো ৬১টি আসনের কোটায় পৌঁছাতে পারবে না। তাই তার লক্ষ্য এখন শুধু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা নয়, বরং বিরোধীরা যাতে সরকার গড়ার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়ে তুলতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। অন্য কথায়-তিনি যদি নিজে সরকার গঠন করতে না পারেন, তবে অন্য কেউ যেন তা না করতে পারে, সেটাই তিনি সুনিশ্চিত করতে চান।
রাজনীতির খেলাটা ঠিক এখানেই।
জনমত জরিপগুলো শুধু একটি সাময়িক চিত্র তুলে ধরে, তবে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণের ক্ষমতা এর নেই। কয়েকটি ছোট রাজনৈতিক দল পার্লামেন্টে প্রবেশের ন্যূনতম প্রয়োজনীয় ভোটের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা যদি সেই বাধার সীমা অতিক্রম করতে পারে, তবে নেতানিয়াহুর জোটে আরও কয়েকটি আসন যোগ হতে পারে। আর যদি তারা ব্যর্থ হয়, তবে তাদের সংগৃহীত ভোটগুলো কোনো আসনেই রূপান্তরিত হবে না; যা পুরো সমীকরণকেই বদলে দেবে। এ বাস্তবতা ওফার উইন্টারের মতো পরিচিত মুখ এবং ছোট ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোকে এক বড় লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে : তারা কি শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টে পৌঁছাতে পারবে, নাকি মাঝপথেই ঝরে পড়বে? আর তাদের এ অবস্থান নেতানিয়াহুর জন্য আশীর্বাদ হবে, নাকি অভিশাপ?
নেতানিয়াহু এই সূক্ষ্ম খুঁটিনাটিগুলো বেশ ভালো করেই বোঝেন। পুরো ডানপন্থি রাজনৈতিক অঙ্গনকে তিনি যেন দাবার বোর্ডের মতো চাল চালেন। তিনি নিজের বলয়ের ভেতরে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বল করে ফেলতে চান, কিন্তু তাদের সংগৃহীত ভোটগুলো যেন কোনোভাবেই অপচয় না হয়, সেদিকেও তার তীক্ষè নজর। বেন-গ্যভিরের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে তিনি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান ঠিকই, কিন্তু এর ফলে ডানপন্থিরা যেন কোনো মূল্যবান আসন না হারায়, তা-ও তিনি নিশ্চিত করতে চান। আজ হয়তো তিনি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আক্রমণ করছেন, আবার আগামীকাল ‘পরিবর্তন’ জোটের সরকার গঠন ঠেকানোর প্রয়োজনে এ ব্যক্তিদেরই তার আবার দরকার পড়বে। এটি কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়; এটি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই।
তবে সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় কিন্তু শুধু এ ডানপন্থি গোষ্ঠী নয়; আসল অনুঘটক হলো আরব ভোটাররা। ইসরাইলের আরব নাগরিকদের ভোটের হার যদি ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশে গিয়ে পৌঁছে, তবে পুরো রাজনৈতিক সমীকরণই বদলে যেতে পারে। আরব দলগুলো হয়তো নিজেরা এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না; কিন্তু তারা নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় ফেরা আটকে দিতে পারে, কিংবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনের মাধ্যমে ‘পরিবর্তন’ জোটকে সরকার গড়ার সুযোগ করে দিতে পারে। আর ঠিক এ কারণেই দুটি সংখ্যা নেতানিয়াহুকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে : এক, তার ইহুদি জায়োনিস্ট প্রতিপক্ষের জেতা আসনের সংখ্যা; এবং দুই, আরব ভোটারদের উপস্থিতির হার।
এখন ‘পরিবর্তন’ জোট যদি আরব দলগুলোর সাহায্য ছাড়া ৬০ বা ৬১টি আসনে পৌঁছাতে না পারে, তবে তারা এক চরম রাজনৈতিক দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হবে : তারা কি আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গড়ার মতো সাহস দেখাবে? নাকি রাজনৈতিক বৈরিতা এবং দেশদ্রোহিতার মতো কঠোর অভিযোগের মুখে পড়ার ভয়ে শেষ পর্যন্ত এক পা পিছিয়ে যাবে?
আরব দল-সম্পর্কিত এ দুর্বল জায়গাটি নেতানিয়াহু খুব ভালো করেই জানেন। ইসরাইলের ডানপন্থি রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরেই আরবদের বিরুদ্ধে চরম বৈরী প্রচারণাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে আসছে। তাই যে কোনো সরকার যদি কোনো আরব দলকে জোটে অন্তর্ভুক্ত করে, কিংবা জোটের বাইরে রেখেও তাদের সমর্থনের ওপর নির্ভর করে-তবে প্রথম দিন থেকেই তাকে তীব্র ও প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে পড়তে হবে : ‘একটি অবৈধ সরকার’, ‘ইসরাইলের শত্রুদের সমর্থনে চলা সরকার’, অথবা ‘এমন এক সরকার যা দেশের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে’। এ রাজনৈতিক ভাষা নতুন কিছু নয়; তবে এরকম একটি উত্তপ্ত রাজনৈতিক মুহূর্তে তা আরও অনেক বেশি তীব্র ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করতে পারে।
সুতরাং, নেতানিয়াহুর মূল লক্ষ্যটা কিন্তু পরিষ্কার : একটি রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করা। তিনি যদি নিজে সরকার গঠন করতে না পারেন, আর অন্যদিকে আইজেনকোট বা তার ‘পরিবর্তন’ জোট যদি কোনো আরব দলের সমর্থন নিতে দ্বিধাবোধ করে, তবে ইসরাইলকে আবারও আরেকটি নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। আর সে ক্ষেত্রে নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই থেকে যাবেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে। তার রাজনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে এটিই একটি বড় অর্জন।
তবে এই বিপদ শুধু পার্লামেন্টের ভেতরের হিসাব-নিকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় এক সংশয় : এ নির্বাচন কি আদৌ স্বাভাবিক ও নিরপেক্ষ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতে পারবে? আর নেতানিয়াহু যদি শেষ পর্যন্ত হেরেও যান, তবে কি তিনি সেই পরাজয় মেনে নেবেন?
নির্বাচন ব্যাহত করার চক্রান্ত নিয়েও নানা শঙ্কা দেখা দিয়েছে, বিশেষ করে আরব-অধ্যুষিত শহরগুলোতে। ভুয়া তথ্য প্রচার, এআই-নির্মিত বিভ্রান্তিকর ভিডিও ছড়ানো কিংবা ভোটকেন্দ্রে চরমপন্থি ডানপন্থি পর্যবেক্ষকদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে উত্তেজনা ছড়ানোর পাঁয়তারা হতে পারে।
কাজেই নেতানিয়াহুর লড়াইটা মূলত দুটি ফ্রন্টে : নির্বাচনে আসন জেতা এবং কার সরকার গঠনের রাজনৈতিক বৈধতা রয়েছে তা ঠিক করা। তিনি নিজের জয়কে সবসময় বৈধ হিসাবে তুলে ধরতে চান; অন্যদিকে আরব দলগুলোর সমর্থনে কিংবা তার বলয়কে বাদ দিয়ে অন্য যে কোনো সরকার গঠিত হলে, সেটিকে অবৈধ, ক্ষতিকর ও দেশের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসাবে চিহ্নিত করাই তার মূল কৌশল। আর এখানেই আসল বিপদ।
গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন বন্ধ হয়ে গেলেই ধ্বংস হয় না; গণতন্ত্র ধ্বংস হয় তখন, যখন ভোট প্রক্রিয়ার কোনো অর্থ অবশিষ্ট থাকে না। ডানপন্থিদের সুবিধা না হলে আরবদের ভোটকে যখন অবৈধ মনে করা হয়, তখন গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে। এক পক্ষ যদি শুধু নিজেদের বিজয়ের শর্তেই নির্বাচন মেনে নেয়, তবে গণতন্ত্র ধসে পড়ে। আর নিরাপত্তাকে অজুহাত বানিয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে প্রতিনিয়ত সংকুচিত করা হলে গণতন্ত্র মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।
তাই আসল প্রশ্নটি স্রেফ এটা নয় যে নির্বাচনে কে জিতবে; বরং আরও গভীর প্রশ্ন হলো : নেতানিয়াহুর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনো নির্বাচনের ফলাফল কি শেষ পর্যন্ত মেনে নেবে ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা?
মিডল ইস্ট মনিটর অবলম্বনে অনুবাদ করেছেন : পরম ওয়াজেদ শিকদার
তামের আজরামি : রাজনীতি বিজ্ঞান বিশ্লেষক, বেলজিয়াম
