Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

Advertisement

Icon

মজিবুল হক মনির

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

ইলিশ ধরার ওপর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা এ মুহূর্তে চলছে। ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ, অর্থনীতি ও উপকূলীয় মানুষের জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইলিশের প্রজনন ও জীবনচক্র রক্ষা করার নানা বৈজ্ঞানিক ও কার্যকর উদ্যোগ অবশ্যই প্রয়োজনীয় ও প্রশংসনীয়। নির্দিষ্ট সময়ে ইলিশ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া তাই বাস্তবসম্মত একটি উদ্যোগ হিসাবেই বিবেচিত। কিন্তু সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যাচ্ছে যে, ইলিশের উৎপাদন কমছে, এমনকি কমে যাচ্ছে ইলিশের গড় আকারও। তাই যদি হয়, তবে তো বেশ কয়েকটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে-নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পরও ইলিশের উৎপাদন ও গড় আকার যদি কমেই যায়, তাহলে এ নিষেধাজ্ঞা আসলেই কার্যকর হচ্ছে? ইলিশ কি আসলেই বাঁচানো যাচ্ছে? আমরা আসলে কতটা কার্যকরভাবে ইলিশের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে পারছি? আর এই নিষেধাজ্ঞার ফলে জেলেদের, জেলে পরিবারগুলোর যে কষ্ট, সেটারই বা সমাধান কী?

চলতি বছর ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের জন্য সারা দেশে ইলিশ ধরা, পরিবহণ, সংরক্ষণ, কেনাবেচা ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য-প্রজননক্ষম মা-ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া। নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। বরং সমস্যা হলো, নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি ইলিশের আবাসস্থল, নদীর প্রবাহ, দূষণ, অবৈধ জাল এবং অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ কতটা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশ উৎপাদন ছিল প্রায় ৫.৭১ লাখ টন। ২০২৩-২৪-এ তা কমে প্রায় ৫.২৯ লাখ টনে এবং ২০২৪-২৫-এ প্রায় ৫.০০ লাখ টনে নেমেছে। অর্থাৎ দুবছরে উৎপাদন কমেছে প্রায় ৭১ হাজার টন বা ১২.৪ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হলো, সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের উৎপাদনও ৫ লাখ টনের নিচে থাকার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক উৎপাদনের প্রবণতা এখন ঊর্ধ্বমুখী নয়।

ইলিশের আকারও ছোট হচ্ছে, পরিমাণের পাশাপাশি গুণগত এ পরিবর্তনটাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশের গড় দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩৭.২ সেন্টিমিটার বা ১৪.৬৫ ইঞ্চি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে প্রায় ৩৪.০ সেন্টিমিটার বা ১৩.৩৯ ইঞ্চি। অর্থাৎ গড় দৈর্ঘ্য প্রায় ৮.৬ শতাংশ কমেছে। একজন ইলিশ গবেষকের মতে, একসময় যেখানে গড় ওজন ৪০০-৪৫০ গ্রাম ছিল, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে ৩০০-৩৫০ গ্রামের মধ্যে নেমে এসেছে।

এটি শুধু বাজারে ছোট মাছ বেশি আসার বিষয় নয়। বড় ও পরিণত ইলিশের সংখ্যা কমে গেলে প্রজননক্ষম মাছের মজুতও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। গবেষকদের মতে, অতিরিক্ত মাছ ধরা, অবৈধ ও সূক্ষ্ম জাল, জাটকা ধরা, নদীর দূষণ, নাব্য ও পানির প্রবাহের পরিবর্তন এবং জলবায়ুগত পরিবর্তন-সব কারণ মিলেই এই পরিস্থিতি তৈরি করছে। মেঘনা নদীতে ইলিশের খাদ্যের পরিমাণ কমে যাওয়ার কথাও সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। সুতরাং প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যাচ্ছে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা আরোপের পুরো প্রক্রিয়াটি। কারণ এর প্রধান উদ্দেশ্যই কার্যত বাস্তবায়িত হচ্ছে না। কারণ শুধু নিষেধাজ্ঞাটাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আরও কিছু উদ্যোগ।

এবার আসা যাক জেলেদের জন্য সরকারের সহায়তা প্রসঙ্গে। নিষেধাজ্ঞার পুরো সময়টা আইনত জেলেদের আয়ের প্রধান অবলম্বনটাই বন্ধ থাকে। জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য সরকার থেকে কিছু সহযোগিতা করা হচ্ছে। কিন্তু এ সহায়তা কতটা যথেষ্ট? এটা সবসময়ই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। চলতি ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় ৩৮ জেলার ৬,৪৬,২৯০টি জেলে পরিবারকে পরিবারপ্রতি ২৫ কেজি চাল দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একটি পরিবারের জন্য প্রায় পুরো মাসের জন্য মাত্র ২৫ কেজি চাল কি আসলেই যথেষ্ট হতে পারে? একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইলিশনির্ভর জেলেদের মধ্যে ২৩.৪ শতাংশের মাসিক আয় ১০ হাজার টাকার নিচে, আর ২৯.৪ শতাংশের আয় ২০-৩০ হাজার টাকার মধ্যে। একই গবেষণায় পাঁচ সদস্যের একটি পরিবারের মাসিক খরচ প্রায় ১৫-১৮ হাজার টাকা বলে জেলেরা জানিয়েছেন; ঋণ ও ‘দাদন’-নির্ভরতার কথাও উঠে এসেছে। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ ধরতে না পারায় জেলেদের নগদ আয় কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। একটি মাঠভিত্তিক গবেষণায় নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের দৈনিক আয় মাত্র প্রায় ১৮২ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। অর্থাৎ ২৫ কেজি চাল খাদ্যসংকট কিছুটা কমাতে পারে, কিন্তু এটি জেলের আয়ক্ষতি, নৌকার খরচ, ঋণ, জ্বালানি, চিকিৎসা, শিক্ষা ও অন্যান্য পারিবারিক ব্যয় পূরণ করার ক্ষেত্রে খুবই অপ্রতুল। জেলেদের সংগঠনগুলো পরিবারপ্রতি তাই ১০০ কেজি চাল এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছে।

তাহলে সমাধান কী? এখন প্রয়োজন শুধু ‘আরও নিষেধাজ্ঞা’ নয়; প্রয়োজন আরও কার্যকর ব্যবস্থাপনা। কয়েকটি উদ্যোগ এজন্য বিবেচনা করা যেতে পারে : প্রথমত, প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পাশাপাশি জাটকা ধরা এবং অবৈধ জালের বিরুদ্ধে সারা বছর কার্যকর নজরদারি দরকার। দ্বিতীয়ত, জেলে পরিবারকে শুধু চাল দিলেই হবে না। নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প কর্মসংস্থান, নগদ সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং দাদনমুক্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। কারণ জেলে যদি নিষেধাজ্ঞার সময় পরিবারের খাবারের জন্য ঋণ নেয়, তাহলে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর তাকে আরও বেশি মাছ ধরতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তৃতীয়ত, ইলিশের আবাসস্থল রক্ষা করতে হবে। নদীর নাব্য, পানির প্রবাহ, দূষণ ও শিল্পবর্জনের বিষয়গুলোকে ইলিশ ব্যবস্থাপনার অংশ করতে হবে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ মতামতে দূষণ, নদীর নাব্য হ্রাস এবং অতিরিক্ত মাছ ধরাকে ইলিশ কমার গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চতুর্থত, সাফল্য মাপতে শুধু ‘কত টন ইলিশ ধরা হলো’-এই একটি সূচক যথেষ্ট নয়। প্রতিবছর অন্তত মোট উৎপাদন, বড়/পরিণত মাছের অনুপাত, গড় দৈর্ঘ্য-ওজন, মা-ইলিশের প্রজনন সাফল্য এবং জেলেদের প্রকৃত আয়-এসব সূচক একসঙ্গে প্রকাশ করা দরকার।

ইলিশ রক্ষায় যে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োজন, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু যদি কয়েক বছর পর দেখা যায় উৎপাদন কমছে, মাছ ছোট হচ্ছে এবং জেলেরা আরও ঋণগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে তখন এ নিষেধাজ্ঞাকে সফল বলার কোনো সুযোগ থাকবে না। ইলিশকে বাঁচাতে হলে মা-ইলিশকে যেমন সুরক্ষা দিতে হবে, তেমনি ইলিশের আবাসস্থল, নদী ও খাদ্যশৃঙ্খলকে রক্ষা করতে হবে। আর জেলেকে বাঁচাতে হলে ২৫ কেজি চালের সহায়তার বাইরে গিয়ে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে নিষেধাজ্ঞা মানার কারণে তার পরিবার আরও গভীর দারিদ্র্য ও ঋণের ফাঁদে না পড়ে। কারণ শেষ পর্যন্ত টেকসই ইলিশ ব্যবস্থাপনার সাফল্য তখনই আসবে, যখন ইলিশের সংখ্যা বাড়বে এবং ইলিশের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনও নিরাপদ হবে।

মজিবুল হক মনির : গবেষক ও উন্নয়নকর্মী

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হোক

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

ফ্রান্সের উত্তাল বিক্ষোভের আঁচ প্রবাসীদেরও লাগছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

নিষেধাজ্ঞা কি ইলিশ বাঁচাতে পারছে

রাজনীতির ভাষা

রাজনীতির ভাষা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম