Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের গবেষণা

ব্রহ্মপুত্রে চীনের মেগা বাঁধ ঘিরে ভূমিকম্পের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ভারত-বাংলাদেশ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬, ০১:০২ পিএম

ব্রহ্মপুত্রে চীনের মেগা বাঁধ ঘিরে ভূমিকম্পের শঙ্কা, ঝুঁকিতে ভারত-বাংলাদেশ

ফল্টের অবস্থান বাঁধের জলাধার এলাকার খুব কাছাকাছি। ছবি: সংগৃহীত

তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের (ইয়ারলুং সাংপো) ওপর নির্মাণাধীন বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন চীনের একদল ভূতাত্ত্বিক।  তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে, এই মেগা বাঁধের ঠিক নিচেই রয়েছে একটি সক্রিয় ভূ-ফাটল (ফল্ট লাইন), যা ভবিষ্যতে বাঁধটির কাঠামোগত স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।  উজানে চীনের এই বিশাল বাঁধ নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও বাংলাদেশে উদ্বেগ রয়েছে।

গত মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত ‘চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভে’র তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত চীনা ভাষার সাময়িকী ‘সেডিমেন্টারি জিওলজি অ্যান্ড টেথিয়ান জিওলজি’তে এ গবেষণা প্রকাশিত হয়। 

এতে বলা হয়েছে, পূর্ব হিমালয় অঞ্চলের পাইজেন ফল্ট বরফ যুগের প্লাইস্টোসিন সময়কাল থেকেই অত্যন্ত সক্রিয়। এই ফল্টের অবস্থান বাঁধের জলাধার এলাকার খুব কাছাকাছি হওয়ায় এটি শুধু বাঁধই নয়, আশপাশের সড়ক, সেতু, সুড়ঙ্গ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হতে পারে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চেংদু ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, চায়না জিওলজিক্যাল সার্ভের সিভিল-মিলিটারি ইন্টিগ্রেশন সেন্টার এবং মিডল ইয়ারলুং সাংপো রিভার ন্যাচারাল রিসোর্সেস অবজারভেশন অ্যান্ড রিসার্চ স্টেশনের ভূতাত্ত্বিকরা।

গবেষকরা জানান, পাইজেন ফল্টের দীর্ঘমেয়াদি সক্রিয়তার কারণে আশপাশের শিলাস্তরে অসংখ্য ফাটল তৈরি হয়েছে এবং সেগুলোর যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যও পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে এসব এলাকার মাটি ও শিলার ধারণক্ষমতা এবং স্থিতিশীলতা আগের তুলনায় অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর প্রভাব বড় প্রকৌশল প্রকল্পগুলোর ভিত্তির ওপরও পড়তে পারে।


গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, পাইজেন এলাকা ইয়ারলুং সাংপো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জলাধার অঞ্চলের মধ্যেই অবস্থিত। এখানকার ভূমির গঠন আলগা এবং মাটির সংযোজন শক্তি তুলনামূলকভাবে কম। ফলে দীর্ঘ সময় জলাধারের পানির নিচে থাকার পাশাপাশি ফল্ট লাইনের নড়াচড়া কিংবা ভূমিকম্পের প্রভাবে দুই পাশের পাহাড়ি ঢাল সহজেই অস্থিতিশীল হয়ে ভূমিধস বা পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে।

এ কারণে গবেষকরা প্রকৌশলীদের ঢালের স্থিতিশীলতা বাড়াতে অতিরিক্ত শক্তিশালীকরণ, রিটেইনিং ওয়াল বা প্রতিরোধমূলক দেয়াল নির্মাণ এবং ভূমিধস প্রতিরোধে বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন। তাদের মতে, নির্মাণ ও পরিচালনার পুরো সময়জুড়েই এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

চীন গত বছর তিব্বত মালভূমিতে এই মেগা বাঁধের নির্মাণকাজ শুরু করে। প্রকল্পটি থেকে বছরে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থ্রি গর্জেস বাঁধের উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় তিন গুণ।


ইয়ারলুং সাংপো নদী তিব্বত ছেড়ে ভারতের অরুণাচল প্রদেশ ও আসামে প্রবেশের পর ব্রহ্মপুত্র নামে পরিচিত হয়। পরে এটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়। এ কারণে উজানে চীনের এই বিশাল বাঁধ নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারত ও বাংলাদেশে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে, পানির প্রবাহ, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ভাটির দেশগুলোর পানি নিরাপত্তার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, পাইজেন এলাকা হিমালয়ের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের কারণে এখানে নিয়মিত শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়। ফলে ইয়ারলুং সাংপো নদীর আশপাশে একটি অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকম্প অঞ্চল গড়ে উঠেছে।

ভূতাত্ত্বিকদের তথ্য অনুযায়ী, পাইজেন ফল্টটি প্লাইস্টোসিন যুগের শুরু থেকেই সক্রিয় এবং বর্তমান হলোসিন যুগেও এর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। প্রাচীন হ্রদের পলিমাটির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৯ হাজার ৫০০ বছর আগেও এই ফল্ট সক্রিয় ছিল।


গবেষকরা ২০১৭ সালে তিব্বতের মিলিন এলাকায় সংঘটিত ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পের কথাও উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, ওই ভূমিকম্প পাইজেন ফল্টের উত্তর প্রান্তে সংঘটিত হয়েছিল, যা এখনো এই ফল্টের শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টির সক্ষমতার প্রমাণ বহন করে।

গবেষণাপত্রে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ভূমিকম্পের প্রভাবে সহজেই ভূমিধস ও পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগ দেখা দিতে পারে। এতে বাঁধ, সড়ক, সেতু, সুড়ঙ্গসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো এবং সেখানে কর্মরত মানুষের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে। তাই নির্মাণ ও পরিচালনার প্রতিটি ধাপে কাঠামোগত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা এবং ভূমিধস প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন গবেষকরা।

তথ্যসূত্র: সাউথ মর্নিং চায়না পোস্ট 

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .