Logo
Logo
×
   

আন্তর্জাতিক

বিবিসির প্রতিবেদন

সোশ্যাল মিডিয়া যেভাবে স্পেনে অভিবাসী সংকট তৈরি করল

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

সোশ্যাল মিডিয়া যেভাবে স্পেনে অভিবাসী সংকট তৈরি করল

সেউটা উপকূলে অভিবাসী ঢল। ছবি: সংগৃহীত

স্পেনের উত্তর আফ্রিকার ছিটমহল সেউটা উপকূলে হাজার হাজার অভিবাসীর আকস্মিক ঢল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় রাজনীতিতে তীব্র সংকট ও রাজনৈতিক ঝড় তৈরি হয়েছে। 

সম্প্রতি মরক্কো থেকে সাঁতরে স্পেনের সেউটা সীমান্তে পৌঁছানো কয়েক হাজার অভিবাসীর বেশিরভাগই এখন স্প্যানিশ সেনা ও পুলিশের পাহারায় মরক্কোয় ফিরে গেছেন। তবে এই আকস্মিক পদক্ষেপে সমুদ্রে ভেসে যাওয়া পরিত্যক্ত রাবার রিং এবং ফ্লিপারের পাশ থেকে অন্তত ৭২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। 

অভিবাসনের মতো সংবেদনশীল ও জটিল ইস্যুতে এই ঘটনা ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক বিভাজন আরও প্রকট করে তুলেছে। মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সহজে ইউরোপে প্রবেশের ভুয়া প্রতিশ্রুতি এবং ভাইরাল ভিডিওর জেরে এই হুট করে অভিবাসী স্রোত তৈরি হয়েছিল, নাকি এর পেছনে কোনো সুপরিকল্পিত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল, তা নিয়ে বর্তমানে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

এই ঘটনার জেরে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু নেতার আচরণের তীব্র সমালোচনা করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির অতি-ডানপন্থী দল ‘ফ্রেতেলি ডি'ইতালিয়া’ সিউটার রাজপথে অভিবাসীদের দৌড়ানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে স্পেনের অভিবাসন নীতির সমালোচনা করে। এরপরই নিরাপত্তা হুমকির কারণ দেখিয়ে ইতালির প্রধানমন্ত্রী মেলোনি স্পেনের সঙ্গে শেনজেন চুক্তি স্থগিত করার ঘোষণা দেন, যা মাদ্রিদকে ক্ষুব্ধ করেছে। 

স্পেনের যুক্তি হলো, সিউটা শেনজেন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং মরক্কোর অভিবাসীরা মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে আগামী বছর নির্বাচন থাকায় এবং অভিবাসনবিরোধী দলের চাপে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে মেলোনি এই সুযোগটি নিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

শুধু ইতালিই নয়, ইউরোপের প্রায় দুই ডজন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান স্পেনের অভিবাসন নীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে শত শত হাজার অনিবন্ধিত অভিবাসীদের কাজের অনুমতি দেওয়ার স্পেনের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে তারা ইউরোপে অভিবাসীদের আকর্ষণের কারণ হিসেবে দেখছেন। 

তবে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলছেন, সমুদ্রে প্রবেশকারীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না মর্মে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় পাচারকারীরা ভুলভাবে উপস্থাপন করে সহজ পথে ইউরোপে প্রবেশের মিথ্যা আশা তৈরি করেছিল। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে ‘স্পেন উন্মুক্ত’ বলে ভুয়া প্রলোভন ও উসকানিমূলক ভিডিও প্রচার করা হয়েছিল, যা দেখে তরুণরা ওয়েটসুট ও ফ্লিপার পরে সাঁতার কাটা শুরু করে। কিন্তু সিউটার তীরে পৌঁছানোর পর তারা খাবার, আশ্রয় বা মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার কোনো উপায় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত নিরাশ হয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।

এই আকস্মিক অভিবাসী সংকটের সুযোগ নিয়ে বৈশ্বিক রাজনীতির বিভিন্ন পক্ষ ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ‘বিপর্যয়’ ও ‘আক্রমণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, অন্যদিকে রাশিয়া ইউরোপে বিশৃঙ্খলা দেখে উল্লাস প্রকাশ করেছে। মরক্কো এই ঘটনার জন্য অপরাধী চক্রকে দায়ী করলেও স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী সানচেজ রাবাতকে ‘ভালো মিত্র’ হিসেবেই অভিহিত করেছেন। তবে সমালোচকরা তাকে নমনীয় নীতি পরিহার করার আহ্বান জানিয়েছেন। 

বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্পেন সিউটা সীমান্তে সমুদ্রের ভেতর দীর্ঘ কমলা রঙের বয়াযুক্ত বেড়া বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আগামী সপ্তাহে ইইউ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীরা বাইরের সীমান্ত আরও শক্তিশালী করা নিয়ে আলোচনা করবেন। সব মিলিয়ে এই মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত ৭২ জন তরুণ সমুদ্রে প্রাণ হারিয়ে মরক্কোয় কফিনে ফিরে গেলেও, এর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক রেশ ইউরোপজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলছে।


Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .