আলজাজিরার বিশ্লেষণ
ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে বেসরকারি খাতকে কেন টানছে ভারত
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৮ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রতিরক্ষা শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে হাঁটছে ভারত। দেশটির সরকারি গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ডিআরডিও) এতদিন যেসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরি করেছে, সেগুলোর উৎপাদনে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাই ছিল প্রধান।
এবার নির্দিষ্ট শর্তে এসব প্রযুক্তি বেসরকারি খাতেও দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নয়াদিল্লি।
গত ২৫ আগস্ট ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের অনুমোদনের পর ডিআরডিওর তৈরি কয়েকটি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি দেশীয় বেসরকারি শিল্পের কাছে হস্তান্তরের পথ খুলে দেওয়া হয়েছে।
সরকারের অনুমোদন, প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও নির্ধারিত নিরাপত্তা শর্ত পূরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সুযোগ পাবে।
উৎপাদন বাড়ানোই প্রধান লক্ষ্য
ভারতের এই সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো। এতদিন গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের পাশাপাশি উৎপাদনের বড় অংশ সরকারি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে চাহিদা বাড়লে দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সবসময় সহজ ছিল না।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা হলে একাধিক কোম্পানি একই সঙ্গে উৎপাদনে অংশ নিতে পারবে। এতে প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদনের গতি ও পরিমাণ বাড়বে বলে আশা করছে ভারত সরকার।
এর সঙ্গে রয়েছে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য—প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে আমদানিনির্ভরতা কমানো। ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচির আওতায় নিজেদের সামরিক প্রয়োজনের বড় অংশ দেশেই উৎপাদন করতে চাইছে নয়াদিল্লি।
কোন কোন ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি দেওয়া হবে?
ভারতের সিদ্ধান্তটি সব ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ডিআরডিওর তৈরি কয়েকটি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রযুক্তি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র, অ্যান্টি-রেডিয়েশন মিসাইল, অ্যান্টি-ট্যাংক গাইডেড মিসাইল সিস্টেম এবং ল্যান্ড-অ্যাটাক ক্রুজ মিসাইল।
অর্থাৎ, বেসরকারি খাত শুধু যন্ত্রাংশ তৈরি করবে না; নির্দিষ্ট অনুমোদনের আওতায় সম্পূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা উৎপাদন ও সংযোজনের সুযোগও পেতে পারে।
প্রতিরক্ষা খাতে আগে থেকেই বেসরকারি খাত
ভারতের বেসরকারি কোম্পানিগুলো প্রতিরক্ষা উৎপাদনে নতুন নয়। দেশটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ড্রোন, গোলাবারুদ, সামরিক ইলেকট্রনিকস, ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং মহাকাশ প্রযুক্তি তৈরিতে যুক্ত।
তবে নতুন সিদ্ধান্তে তাদের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হচ্ছে। আগে যেখানে অনেক প্রতিষ্ঠান মূলত সরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থার সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করত, এখন তারা তুলনামূলকভাবে বড় ও পূর্ণাঙ্গ অস্ত্রব্যবস্থা তৈরির সুযোগ পাবে।
এতে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি কোম্পানির সক্ষমতাও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।
চীন-পাকিস্তানকে ঘিরে কেন তৎপরতা?
ভারতের সামরিক পরিকল্পনায় চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা উত্তেজনা গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত পরিস্থিতি ও আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে ভারত সামরিক সরঞ্জামের মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে শুধু অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকলেই হয় না; প্রয়োজন হলে দ্রুত সেই অস্ত্রের মজুত পূরণ করার সক্ষমতাও থাকতে হয়। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উচ্চমূল্যের ও কৌশলগত অস্ত্রের ক্ষেত্রে সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বেসরকারি খাতকে উৎপাদনে যুক্ত করার ফলে যুদ্ধ বা জরুরি পরিস্থিতিতে ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন ব্যবস্থায় অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
দ্রুত বাড়ছে ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্প
ভারত গত এক দশকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে। এর ফলে দেশটির বেসরকারি খাতে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, গোলাবারুদ, সামরিক যান ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনে বিনিয়োগ বেড়েছে।
বড় দেশীয় শিল্পগোষ্ঠীগুলোও প্রতিরক্ষা খাতে কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। আদানি ডিফেন্স অ্যান্ড অ্যারোস্পেসসহ বিভিন্ন কোম্পানি গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে বিনিয়োগ করছে।
তবে এই শিল্পকে আরও বড় করতে শুধু কারখানা স্থাপন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, গবেষণা সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ক্রয়াদেশ।
ভারতের হাতে রয়েছে বড় ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডার
ভারত ইতোমধ্যে বিভিন্ন পাল্লা ও সক্ষমতার ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। এর মধ্যে অগ্নি সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র দেশটির কৌশলগত অস্ত্রভাণ্ডারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অগ্নি-৪-এর পাল্লা প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার এবং অগ্নি-৫-এর পাল্লা ৫ হাজার কিলোমিটারের বেশি। এ ছাড়া ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইলও ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রব্যবস্থা।
এসব সক্ষমতা ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পকে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করেছে।
অস্ত্র রপ্তানিতেও ভারতের নজর
ভারত এখন শুধু আমদানি কমাতে নয়, অস্ত্র রপ্তানিও বাড়াতে চাইছে। দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর একটি বড় উদাহরণ ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র। ফিলিপাইনের কাছে এই ক্ষেপণাস্ত্র রপ্তানি করেছে ভারত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গেও এ অস্ত্র নিয়ে আলোচনা ও সহযোগিতা চলছে।
দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও বেশি উৎপাদনে যুক্ত করতে পারলে ভবিষ্যতে রপ্তানির পরিমাণও বাড়বে বলে আশা করছে নয়াদিল্লি।
তবু আমদানিনির্ভরতা পুরোপুরি কাটেনি
নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প দ্রুত বাড়লেও ভারত এখনো বিদেশি অস্ত্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র আমদানিকারক ছিল।
এই সময়ে ভারতের বড় অস্ত্র আমদানির উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে রাশিয়া, ফ্রান্স ও ইসরায়েল থেকে।
ফলে বেসরকারি খাতকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে যুক্ত করার সিদ্ধান্তকে আমদানিনির্ভরতা কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
গোপন প্রযুক্তি বেসরকারি হাতে, ঝুঁকি কতটা?
ক্ষুদ্র কোনো সামরিক সরঞ্জামের তুলনায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি অনেক বেশি সংবেদনশীল। তাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তথ্যের নিরাপত্তা, সাইবার সুরক্ষা এবং প্রযুক্তি পাচার ঠেকানো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এ কারণে ভারতের নতুন ব্যবস্থায় প্রযুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, অনুমোদন ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্ত পূরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের বড় প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো অবশ্য ইতোমধ্যে সামরিক উৎপাদন ও সংবেদনশীল প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। ফলে সরকারের দৃষ্টিতে বেসরকারি খাতকে আরও বড় দায়িত্ব দেওয়ার জন্য একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
আসলে কী চাইছে ভারত?
সব মিলিয়ে, বেসরকারি কোম্পানির হাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নয়। এর মাধ্যমে ভারত একই সঙ্গে কয়েকটি লক্ষ্য পূরণ করতে চাইছে—দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানো, আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, যুদ্ধকালীন দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতা তৈরি এবং আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করা।
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি তৈরি করবে আর সরকারি-বেসরকারি উভয় খাত সেই প্রযুক্তির ভিত্তিতে বড় পরিসরে উৎপাদন করবে—ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পকে এই মডেলের দিকে নিয়ে যাওয়াই নতুন নীতির মূল লক্ষ্য।
তবে এই পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তি হস্তান্তরের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, বেসরকারি বিনিয়োগ, উৎপাদনের মান, সরকারি ক্রয়াদেশ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর।
