যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে কানাডা
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৫৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি গত সপ্তাহে বলেছেন, তিনি এমন এক পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন, যা এক সময় অকল্পনীয় ছিল—আর তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন।
যদিও এমনটা হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করেন কার্নি। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্ক নতুন মোড় নেওয়ায় সব ধরনের সম্ভাবনার কথা বিবেচনা করা তার দায়িত্ব।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটি শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ।’
ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের নীতি এবং বারবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণের বিষয়টি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় পর্যালোচনা করছে কানাডা।
২০২৫ সালে ট্রাম্প বলেছিলেন, কানাডার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা ‘অত্যন্ত ক্ষীণ’। এর পরিবর্তে তিনি বলেছিলেন, রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তিনি অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখবেন।
হোয়াইট হাউস সম্প্রতি এক বিবৃতিতে বলেছে, কানাডার জনগণকে রক্ষার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অন্য যে কারও চেয়ে বেশি কাজ করেছেন।’
সামরিক বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করেন, এমন আগ্রাসনের সম্ভাবনা খুবই কম। বরং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বহুমুখী সহযোগিতার বিষয়টি উল্লেখ করেন তারা।
তবে বিষয়টি যে কানাডীয়দের মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, তা স্পষ্ট।
গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করার পর লেজারের এক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ৩০ শতাংশেরও বেশি কানাডীয় মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের আশঙ্কা রয়েছে।
মার্কিন আগ্রাসনের সম্ভাবনা কেন ক্ষীণ
রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বলেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ হওয়াটা হবে অত্যন্ত জটিল এবং তা কল্পনা করাও কঠিন।
তিনি বলেন, ‘আমার পুরো কর্মজীবনই সামরিক অভিযানে যুক্ত ছিল, কিন্তু আমরা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কোনো সামরিক আক্রমণের আশঙ্কার কথা বিবেচনা করিনি।’
উত্তর আটলান্টিক প্রতিরক্ষা জোট ন্যাটোর মিশনে দায়িত্ব পালন করা কোটস বলেন, সামরিক প্রতিরক্ষার অনেক ক্ষেত্রেই কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরকে সহযোগিতা করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা উভয়ই ন্যাটোর সদস্য। এই জোটের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যের তার সুরক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।
এ ছাড়া দেশ দুটি ‘নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ডের’ অধীনে আর্কটিক অঞ্চলে যৌথ প্রতিরক্ষা অভিযান পরিচালনা করে এবং নিয়মিতভাবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে থাকে। এ কারণেই কোটস মনে করেন, কানাডার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আক্রমণ সরাসরি সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে শুরু হবে না; বরং সাইবার যুদ্ধের মতো অপেক্ষাকৃত গোপনীয় উপায়ে এর সূচনা হতে পারে।
সম্পর্ক সব সময় বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র স্বাভাবিকভাবে মিত্র হয়ে ওঠে এবং অর্থনৈতিক, সামরিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে পরস্পরের সহযোগী হয়ে ওঠে।
কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক টিম ফোরান বলেন, তবে পরিস্থিতি সব সময় এমন ছিল না। প্রকৃতপক্ষে কানাডার নিজস্ব পরিচয়ের একটি মূল ভিত্তিই হলো অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত উপনিবেশগুলো যখন বিদ্রোহ করেছিল, তখন ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার যেসব উপনিবেশ ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রতি অনুগত ছিল; তাদের সমন্বয়েই কানাডা গঠিত হয়েছিল।
কানাডা রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের আগেই যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে আগ্রাসনের চেষ্টা চালিয়েছিল; ১৭৭৫ সালে তারা মন্ট্রিল দখল করে নেয় এবং কুইবেক শহরটিও প্রায় দখল করে ফেলেছিল।
১৮১২ সালের যুদ্ধে আমেরিকানরা বারবার তৎকালীন ‘আপার কানাডা’, ‘লোয়ার কানাডা’ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে আক্রমণ চালায়, যার ফলাফল ছিল অমীমাংসিত। সেই যুদ্ধের সময় প্রতিশোধ হিসেবে ব্রিটিশ সেনারা হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দিয়েছিল, যা ইতিহাসের পাতায় একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।
ফোরান জানান, সে সময় যেসব উপনিবেশ নিয়ে পরে কানাডা গঠিত হয়, সেগুলো নিজেদের সুরক্ষার জন্য গ্রেট ব্রিটেন ও তাদের রয়্যাল নেভি এবং গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধগুলোতে সেনাপতির ভূমিকা পালন করা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করত।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শক্তি ও প্রভাবের পরিপ্রেক্ষিতে কানাডা আবারও দেশটির সঙ্গে যুদ্ধের কথা বিবেচনা করেছিল।
এ লক্ষ্যে একটি পরিকল্পনাও তৈরি করা হয়েছিল, যার ভিত্তি ছিল কানাডীয় সেনাবাহিনীর জেনারেলদের সীমান্ত শহরগুলোতে চালানো গোপন সফর। পর্যটক সেজে তারা সেখানে যেতেন এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন সেতু ও মহাসড়কের ছবি তুলতেন।
শত্রুপক্ষ সম্পর্কে আরও ভালো ধারণা পেতে তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলতেন।
কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক এবং বিংশ শতাব্দীর কানাডা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু বার্চ বলেন, সে সময় যুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা কম থাকলেও কানাডীয়রা সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে চেয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর কাজের ধরনই এমন। তারা নানাবিধ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে।‘
যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসন কেমন হতে পারে
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসনের আশঙ্কা অত্যন্ত কম, তবুও কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিডট বলেছেন, কানাডিয়ানদের এ ধরনের প্রস্তুতির বিষয়টিই প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যবস্থা কতটা আমূল পরিবর্তিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কানাডীয় নেতাদের এখন কঠিন কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে—যেমন, তারা মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ চালিয়ে যেতে চান। কারণ, এই অংশীদারত্বের সুবাদেই যুক্তরাষ্ট্র এমন সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়ে থাকে, যা কানাডার ক্ষতি করার ক্ষেত্রে দেশটি কাজে লাগতে পারে।
তিনি বলেন, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং এ নিয়ে এক ধরনের যৌক্তিক ভীতিও কাজ করছে।’
তিনি আরও বলেন, কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানানোর বিষয়ে ট্রাম্পের মন্তব্যকে হয়তো আমেরিকানরা খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু কানাডীয়রা তা গুরুত্বের সঙ্গেই নিয়েছে এবং প্রয়োজনে নিজেদের রক্ষায় তারা প্রস্তুতও রয়েছে।
তাহলে এমন ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি কেমন হতে পারে? যুদ্ধের প্রথম পর্যায়টি বেশ সংক্ষিপ্ত হতে পারে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ‘গ্লোব অ্যান্ড মেইল’ পত্রিকার প্রতিবেদনে কানাডার সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত একটি মডেলের উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের মুখে এক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডার কৌশলগত অবস্থানগুলো পরাস্ত হয়ে পড়তে পারে।
তখন কানাডার সামরিক বাহিনী সংখ্যায় অনেক পিছিয়ে পড়বে এবং শত্রুকে প্রতিহত করতে কানাডীয় বাহিনীকে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
জানুয়ারি মাসে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, কানাডাকে সহায়তা ও সুরক্ষার জন্য ফ্রান্স ও ব্রিটেনের মতো মিত্র দেশগুলোর দ্বারস্থ হতে হবে।
ধারণা করা হয়, গত এক শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে কোনো পরিকল্পনার ছক কষল।
কোটস জানান, সামরিক যুদ্ধের পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এই মডেলটি তুলনামূলকভাবে কম তীব্র বা প্রাথমিক পর্যায়ের একটি পরিকল্পনা।
তিনি বলেন, ন্যাটো জোটের অন্যান্য মিত্র দেশের তুলনায় স্থলপথে আগ্রাসনের মোকাবিলায় কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে কানাডা পিছিয়ে ছিল; তবে ভূ-রাজনীতির এই অনিশ্চিত সময়ে তারা এখন সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে।
এরই একটি প্রমাণ পাওয়া যায় কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধানের সাম্প্রতিক এক আহ্বানে, যেখানে সামরিক বাহিনীর আকার ব্যাপকভাবে বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে—যার মধ্যে ৩ লাখ পর্যন্ত স্বল্প-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাগরিক-সৈনিক অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও কানাডায় আগ্রাসন চালানো হয়তো খুব একটা সহজসাধ্য বিষয় হবে না। শ্মিডট বলেন, বিশাল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও কানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামার জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন বা সম্মতি আদায় করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কঠিন হবে।
তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা, কানাডায় আগ্রাসন চালানোর নির্দেশ দেওয়া হলে বিপুল সংখ্যক মার্কিন কর্মকর্তা পদত্যাগ করবেন। তারা এটিকে একটি বেআইনি ও অনৈতিক আদেশ হিসেবেই গণ্য করবেন।’
তিনি আরও বলেন, কানাডীয় ও মার্কিন সেনারা নিয়মিত যৌথ প্রশিক্ষণ নেয় এবং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
তবে সম্পর্কের অবনতি হয়ে যদি সরাসরি সংঘাত বা যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়—যা ঘটার সম্ভাবনা খুবই কম—সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত কানাডার মূল্যবান সম্পদ যেমন তেল ও খনিজ দখলের পাশাপাশি দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্বকে উৎখাত বা নিষ্ক্রিয় করার ওপরই মনোযোগ দেবে।
তিনি বলেন, ‘তখন হয়তো এমন এক ধরনের অভিযানের দৃশ্য দেখা যাবে, যা ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছিল।’
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা যে অনেক বেশি, তা স্বীকার করে তিনি বলেন, শক্তির তুলনামূলক বিচারে কানাডীয় সেনারাও বেশ ভালোভাবেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে। সূত্র: বিবিসি



