প্লেগ রোগ কী, কেন নতুন করে এটি আলোচনায়
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
সাইবেরিয়ার একটি প্লেগ গবেষণা কেন্দ্রে সম্প্রতি একজন রুশ ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ানের মৃত্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। আর সেই সঙ্গে এই বিরল সংক্রামক রোগটি গবেষণাগার থেকে বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাব্য জল্পনা উসকে দিয়েছে।
রুশ কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে ল্যাবকর্মীর মৃত্যুকে প্লেগের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। কিন্তু স্বাধীন গণমাধ্যমগুলোতে স্থানীয়ভাবে কোয়ারেন্টাইনের খবর প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও তারা এখন এ সংযোগ অস্বীকার করছেন।
তাহলে ল্যাবকর্মী ওই নারীর সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল এবং তিনি ঠিক কীভাবে মারা গেলেন? আর প্লেগ নিয়ে মানুষের আসলে কতটা চিন্তিত হওয়া উচিত?
দারিয়া শিপিলোভার মৃত্যু নিয়ে যা জানা যাচ্ছে
সাইবেরিয়া ও দূর প্রাচ্যের প্লেগ-প্রতিরোধী ইনস্টিটিউটে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী দারিয়া শিপিলোভাকে সেপ্টেম্বরের শেষে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
তিন দিন পর আঞ্চলিক রাজধানী ইরকুটস্কের বাইরের শহর শেলেখভে তিনি মারা যান। বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে, ঘটনাটি ঘটেছিল দোসরা অক্টোবর। যদিও বিবিসি এ তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি।
এরপর ওই হাসপাতালকে কোয়ারেন্টাইন করা হয়, একটি স্থানীয় অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয় এবং ইরকুটস্কে একটি গণসমাবেশ বাতিল করা হয়েছিল।
শুক্রবার, ওই অঞ্চলের গভর্নর ইগর কোবজেভ বলেন, রাশিয়ার প্রধান স্যানিটারি ডাক্তার ‘এক বিশেষ বিপজ্জনক সংক্রমণের সন্দেহজনক ঘটনা’ তদন্তে ইরকুটস্কে পৌঁছেছেন এবং কর্তৃপক্ষ শিপিলোভার সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের পর্যবেক্ষণ করছে।
ইজভেস্তিয়া সংবাদপত্রের মতে, প্রায় ১৯৭ জন চিকিৎসাধীন পর্যবেক্ষণে ছিলেন।
সেদিনই প্রতিবেশী বুরিয়াতিয়া অঞ্চলের গভর্নর জানান যে পরীক্ষাগারের ওই কর্মী প্লেগে মারা গেছেন।
এর ফলে অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউটে পরীক্ষাগার থেকে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাব্য ঘটনা নিয়ে জল্পনা শুরু হয় এবং একজন স্থানীয় সাংবাদিকের একটি অপ্রমাণিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, মৃত গবেষক একটি টেস্ট টিউব ভেঙে ফেলার পরই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।
শিপিলোভার মৃত্যুর কারণ নিয়ে এখন যা বলা হচ্ছে
রাশিয়ার ভোক্তা সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা, রস্পোট্রেবনাদজর ওই ল্যাবকর্মী মৃত্যুর কারণ নিয়ে করা নানা দাবিগুলো থেকে সরে আসার চেষ্টা করেছিল।
চলতি সপ্তাহে সংস্থাটি জানায় যে, ওই ল্যাবের কর্মী অজ্ঞাত কারণের এক নতুন নিউমোনিয়ায় মারা গেছেন এবং পরীক্ষায় তার ‘পেশাগত কার্যকলাপের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অণুজীব’ পাওয়া যায়নি।
এ বিবৃতির পর, সরকারপন্থি একটি ফেডারেল সংবাদমাধ্যম প্লেগের সম্ভাব্য ঘটনা উল্লেখ করা পাঁচটি পোস্ট মুছে দিয়েছে।
এরপর বৈকালস্ক শহরের কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য প্লেগ সংক্রমণের কারণে শেলেখভে ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়ে পাঠানো একটি বার্তা মুছে দিয়েছে।
কিন্তু কর্তৃপক্ষ যখন পরিস্থিতিকে লঘু করে দেখানোর জন্য সমন্বিত বার্তা দিচ্ছিল বলে মনে করছিলেন অনেকে, তখন স্থানীয় স্বাধীন সংবাদ ওয়েবসাইট ‘পিপল অফ বাইকাল’ তাদের সূত্রের বরাতে জানায়, ইরকুটস্কের অন্তত চারটি হাসপাতাল তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইনের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তবে ওই খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এদিকে, বিবিসি নিউজ রাশিয়ান জানতে পেরেছে যে, ইরকুটস্ক অ্যান্টি-প্লেগ ইনস্টিটিউট অক্টোবরের শেষের দিকে চীন, মঙ্গোলিয়া এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ কয়েকটি দেশের বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক প্লেগ নিয়ন্ত্রণ সম্মেলনের আয়োজন করতে চলেছে।
অনুষ্ঠানটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কিনা, তা নিশ্চিত করতে বিবিসি ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
প্লেগ কী?
চতুর্দশ শতাব্দীতে প্লেগের জীবাণু (ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস) ইউরোপের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল, তখন এটি ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত ছিল।
এটি এমন এক রোগ যা ওশেনিয়া ছাড়া পৃথিবীর সব মহাদেশে পাওয়া যায়, এমনকি রাশিয়ার বুরিয়াতিয়া অঞ্চলের মারমটের মতো ইঁদুরজাতীয় প্রাণীদের মধ্যেও এটি দেখা যায়।
মাছির কামড়, শরীরে থাকা তরল বা দূষিত পদার্থের সংস্পর্শ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের কণা নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করার মাধ্যমে মানুষ এতে সংক্রমিত হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুসারে, প্লেগের নিউমোনিক রূপের সুপ্তিকাল খুবই সংক্ষিপ্ত - কখনো কখনো মাত্র ২৪ ঘণ্টা- এবং প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা না হলে এটি প্রাণঘাতী হতে পারে।
লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্বাসকষ্ট ও কাশি, এবং প্রায়শই এর সঙ্গে রক্তমিশ্রিত কফ থাকে।
কিন্তু পরীক্ষাগারের কর্মীর মৃত্যুর কারণ যাই হোক না কেন, প্লেগ মহামারীর ঝুঁকি খুবই কম বলে মনে করেন রুশ বিজ্ঞান প্রতিবেদক ইরিনা ইয়াকুতেঙ্কো।
কারণ উন্নত দেশগুলোতে এর প্রাদুর্ভাব টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান নেই।
‘প্লেগের বিরুদ্ধে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ভালোভাবে কাজ করে, কারণ রোগটি এখন অত্যন্ত বিরল এবং এর ব্যাপক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার সুযোগ পায়নি,’ বিবিসি রাশিয়ান পডকাস্টকে বলেন তিনি।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কী হয়েছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একজন মুখপাত্র সংবাদ সংস্থা পলিটিকোকে বলেছেন, পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্যের ওপর এ রোগের প্রভাব মূল্যায়ন করতে সংস্থাটি রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
ইউরোপীয় কমিশনের মুখপাত্রের মতে, ইউরোপীয় সংক্রামক রোগ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইসিডিসির বিশেষজ্ঞরাও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
রাশিয়ায় প্লেগের একটি সম্ভাব্য ঘটনার খবর যুক্তরাষ্ট্র ‘খুব গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে’ বলে সোমবার জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, এটি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত।
সাইবেরিয়ার প্লেগ গবেষণা কেন্দ্রে ল্যাবকর্মীর মৃত্যুর বিষয়ে তিনি ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলার জন্য একটি ফোনালাপ নির্ধারণ করেছেন বলেও জানিয়েছেন ট্রাম্প।
বুধবার সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন না যে এটি কোনো জৈব অস্ত্র (বায়োওয়েপন) সংক্রান্ত ঘটনা। তিনি আরও বলেন, আমরা খুব শিগগিরই বিষয়টি জানতে পারব, তবে আমরা তা মনে করি না।
রুশ কর্তৃপক্ষের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের কথা শুনলে মনে হয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা আশা করি সেটাই সত্য।
ট্রাম্প বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার সঙ্গে ‘গভীর আলোচনা’ চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, এ ধরনের কোনো ফোনালাপ নির্ধারিত ছিল না। তবে ট্রাম্পের সমর্থনের প্রস্তাবকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার পেসকভ বিবিসি রাশিয়া সম্পাদক স্টিভ রোজেনবার্গকে বলেন, ‘যখন সাহায্যের প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন তা সবসময়ই খুব ভালো লাগে।’
তিনি আরও বলেন যে, ইরকুটস্কের পরিস্থিতি সম্পর্কে কেবল সরকারি তথ্যই বিশ্বাসযোগ্য।
অনলাইনে কী কী দাবি করা হচ্ছে?
রাশিয়া ও আন্তর্জাতিকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ কিছু পরস্পরবিরোধী প্রতিবেদন প্রচারিত হচ্ছে।
বিবিসি অন্তত পাঁচটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে, যেগুলো কথিত দ্বিতীয় একজন ভুক্তভোগী সম্পর্কে অপ্রমাণিত দাবি শেয়ার করছে।
এই অ্যাকাউন্টগুলো—যেগুলোর সম্মিলিত অনুসারীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ ৬৯ হাজার রুশ ভাষায় প্রায় অভিন্ন বার্তা পোস্ট করেছে।
এতে দাবি করা হয়েছে যে, দারিয়া শিপিলোভার সহকর্মী হিসেবে পরিচিত ভিক্টর নাকলোনেনি নামের এক ব্যক্তিও মারা গেছেন।
রাশিয়ার রস্পোট্রেবনাদজরের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র এই প্রতিবেদনগুলো নিশ্চিত করেনি। বিবিসি মন্তব্যের জন্য সরাসরি সংস্থাটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
সাইবেরিয়া ও সুদূর প্রাচ্যের প্লেগ-প্রতিরোধী ইনস্টিটিউট মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
পরবর্তীতে যাচাইবিহীন এই দাবিগুলো যুক্তরাজ্যের ডেইলি মেইলসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রচার করে, যারা তথ্যটির উৎস হিসেবে রাশিয়ার ‘স্থানীয় গণমাধ্যম’-কে উল্লেখ করে।
পোস্টগুলো অনলাইনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে; কিছু ব্যবহারকারী জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, আবার অন্যরা অ্যাকাউন্টগুলোকে ভুল তথ্য ছড়ানোর জন্য অভিযুক্ত করেছেন।
বিবিসি এক্স-এ বেশ কিছু যাচাইবিহীন দাবিও শনাক্ত করেছে, যেগুলোর মধ্যে কয়েকটি লক্ষ লক্ষ ভিউ পেয়েছে।
একজন ব্লগার বলেছেন, তিনি তার এক বন্ধুর কাছ থেকে একটি বার্তা পেয়েছেন, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে যে রাশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ লকডাউনে যেতে চলেছে। পোস্টটি ৬০ লাখেরও বেশি বার দেখা হয়েছে।
তবে, সেন্ট পিটার্সবার্গের কর্তৃপক্ষ বা গণমাধ্যম কেউই শহরে প্লেগের কোনো ঘটনা কিংবা লকডাউনের আশঙ্কার কথা জানায়নি।
আলাদা একটি পোস্টে আরেকজন ব্যবহারকারী দাবি করেছেন যে, ‘রাশিয়ার একটি পরীক্ষাগার থেকে সদ্য ছড়িয়ে পড়া নিউমোনিক প্লেগ কোভিডের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি মারাত্মক’। সেই পোস্টটি এক কোটি ১৩ লাখ বার দেখা হয়েছে।
চিকিৎসা না করা হলে এটি আরও মারাত্মক হলেও, কোভিডের মতো করে এর দ্বারা মানুষের মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা কম, কারণ অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এটিকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
