Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

চীনের সামুদ্রিক তৎপরতা ঠেকাতে ফিলিপাইনের নতুন পরিকল্পনা

Advertisement

Icon

যুগান্তর ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪২ পিএম

চীনের সামুদ্রিক তৎপরতা ঠেকাতে ফিলিপাইনের নতুন পরিকল্পনা

Advertisement

পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক তৎপরতা ও চাপ মোকাবিলায় শুধু ছবি, ভিডিও ও প্রতিবেদন প্রকাশ যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানো, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা জোরদার এবং ডিজিটাল মাধ্যমে অপতথ্য মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে ফিলিপাইনকে।

অস্ট্রেলিয়ার আন্তর্জাতিক নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণে এ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিতর্কিত সামুদ্রিক এলাকায় চীনের জাহাজ মোতায়েন, ফিলিপাইনের নৌযানের চলাচলে বাধা এবং বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রয়েছে। এসব তৎপরতার তথ্য আন্তর্জাতিক মহলের সামনে তুলে ধরতে ফিলিপাইন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও সক্রিয় হয়েছে। তবে শুধু এসব ঘটনা প্রকাশ করে চীনের আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এ জন্য বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি কূটনৈতিক ও তথ্যগত কৌশলও শক্তিশালী করতে হবে।

বিতর্কিত এলাকায় চীনের জাহাজ মোতায়েন

ফিলিপাইনের পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স জানিয়েছে, পালাওয়ান প্রদেশের ফিলিপাইন-নিয়ন্ত্রিত কোটা দ্বীপের কাছে চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার ২২টি জাহাজ মোতায়েন রয়েছে। চীনা সামুদ্রিক মিলিশিয়ার ৯৬২২ নম্বর জাহাজটি ২২টি ছোট নৌযান নিয়ে প্রায় দুই সপ্তাহ পর ওই এলাকায় ফিরে আসে।

টাস্কফোর্সের অভিযোগ, এসব নৌযান সেখানে অনুমতি ছাড়া মাছ ধরা এবং সমুদ্রে বর্জ্য ফেলার সঙ্গে জড়িত ছিল।

এর আগে ৮ অক্টোবর আয়ুঙ্গিন শোল এলাকায় ফিলিপাইনের একটি চিকিৎসা ও উদ্ধার মিশনে জলকামান ব্যবহার করে চীনা কোস্টগার্ড। মিশনটির উদ্দেশ্য ছিল ফিলিপাইনের সামরিক উপস্থিতির প্রতীক হয়ে থাকা বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজ থেকে একজন সেনাকে সরিয়ে নেওয়া।

স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের বিতর্কিত মিসচিফ রিফ এলাকায় চীনের সামরিকীকরণের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৯৯ সালে ফিলিপাইন ইচ্ছাকৃতভাবে বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজটি আয়ুঙ্গিন শোলে স্থাপন করে। এরপর থেকে জাহাজটি ওই এলাকায় ফিলিপাইনের উপস্থিতি বজায় রাখার গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সমঝোতার পরও কমেনি উত্তেজনা

দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানো এবং ভুল হিসাব-নিকাশ থেকে সংঘাতের ঝুঁকি হ্রাসের লক্ষ্যে ২০২৪ সালে একটি অস্থায়ী সমঝোতা হয়। তবে ফিলিপাইনের অভিযোগ, সমঝোতার পরও বিতর্কিত এলাকায় তাদের সেনা পরিবর্তন ও রসদ সরবরাহের অভিযানে বাধা দেওয়া হচ্ছে।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর বিআরপি সিয়েরা মাদ্রে জাহাজে সেনা পরিবর্তন ও রসদ সরবরাহের অভিযানে চীনের কোস্টগার্ড এবং পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি বাধা দেয় বলে জানিয়েছে ফিলিপাইন। এর কয়েক দিন আগে, ১৮ সেপ্টেম্বর ফিলিপিনো জেলেদের কাছে জ্বালানি পৌঁছে দেওয়ার সময় চীনা কোস্টগার্ডের একটি জাহাজের ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফিলিপাইনের মাছ ধরার সহায়ক নৌযান বিআরপি দাতু মাগাত সালামাত।

এদিকে পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের সামরিক ও কোস্টগার্ড জাহাজের উপস্থিতিও বেড়েছে। ফিলিপাইনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পাক-আসা দ্বীপ, আয়ুঙ্গিন শোল, এসকোদা শোল ও স্কারবরো শোলের আশপাশে চীনের নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের ১০১টি জাহাজ শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্টে এ সংখ্যা ছিল ৫৬।

চীনের তথ্যপ্রভাব মোকাবিলায় নতুন কৌশল

সামুদ্রিক তৎপরতার পাশাপাশি তথ্য প্রচারের মাধ্যমেও চীন ফিলিপাইনের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যা, ফিলিপাইনের স্বাধীনতার গুরুত্ব খাটো করে দেখানো এবং উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে চীনের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরার মতো বিষয় রয়েছে।

এ ধরনের প্রচার ফিলিপাইনের প্রভাবশালী মহলে চীনের অবস্থান শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শুধু সরকারি বিবৃতি বা সামুদ্রিক ঘটনার ছবি প্রকাশ নয়, বরং তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল মাধ্যমে অপতথ্য ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোও জরুরি।

সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ফোর্বস গ্লোবাল সিইও সম্মেলনে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র বলেন, চীনের সঙ্গে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানোর বাস্তবতা তার দেশ উপলব্ধি করে। তবে এটিকে চীনের কাছে নতি স্বীকার হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ফিলিপাইন এখন নীরব কূটনীতির পরিবর্তে সামুদ্রিক এলাকায় চীনের কর্মকাণ্ডের ছবি, ভিডিও ও প্রতিবেদন প্রকাশের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এর লক্ষ্য জনসচেতনতা বাড়ানো, অপতথ্য মোকাবিলা এবং ২০১৬ সালের সালিশি রায়ের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোরদার করা।

তবে এসব উদ্যোগ চীনের আচরণে কতটা পরিবর্তন আনতে পারছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। লোয়ি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তথ্য প্রকাশের কৌশলের পাশাপাশি চীনের আগ্রাসী তৎপরতার মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে—এমন কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা

ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট মার্কোস জুনিয়র সরকারের ‘কমপ্রিহেনসিভ আর্কিপেলাজিক ডিফেন্স কনসেপ্ট’ বা সমন্বিত দ্বীপপুঞ্জ প্রতিরক্ষা ধারণায় সামরিক ঘাঁটি বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া, দূরপাল্লার আঘাত হানার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চীনের প্রবেশ-প্রতিরোধ ও নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশল মোকাবিলায় এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এ লক্ষ্য অর্জনে বিদেশি সামরিক অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানো, সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ নির্ধারণ এবং অস্ত্র ও অন্যান্য সামরিক সম্পদ কোথায় ও কীভাবে মোতায়েন করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে চীনের তথ্যপ্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় স্বার্থ ও অভিন্ন মূল্যবোধের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য এবং বাস্তব কার্যক্রমের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে হবে। ফিলিপাইনের বিপুলসংখ্যক মানুষ সংবাদ ও তথ্যের জন্য ফেসবুকের ওপর নির্ভর করেন। তাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপতথ্য ছড়ানো ঠেকানো এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করাও নিরাপত্তা কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে মিত্র দেশ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রসমর্থিত বা রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমের ভূমিকা বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আসিয়ানের নেতৃত্ব কাজে লাগানোর সুযোগ

আঞ্চলিক কূটনীতিতেও ফিলিপাইনের সামনে সুযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্ব কাজে লাগিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে পারে দেশটি।

মিয়ানমার সংকট, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত বিরোধ এবং দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তেজনা মোকাবিলায় আসিয়ান কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারলে আঞ্চলিক নেতৃত্ব ও সংস্থাটির গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

১৯৬৭ সালে আসিয়ান প্রতিষ্ঠার সময় সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্য এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি আঞ্চলিক বাস্তবতার প্রতিফলন ছিল। তবে বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এসব নীতি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আঞ্চলিক নীতিমালা হালনাগাদ এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণেও নেতৃত্ব দিতে পারে ফিলিপাইন।

সব মিলিয়ে, পশ্চিম ফিলিপাইন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা মোকাবিলায় তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এককভাবে তা যথেষ্ট নয়। প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার, ডিজিটাল মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত এবং আসিয়ানভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ কার্যকর করার সমন্বিত পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদে ফিলিপাইনের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

লাদাখের ২৮ স্থানের নাম ভারতের মানচিত্রে, চীনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

লাদাখের ২৮ স্থানের নাম ভারতের মানচিত্রে, চীনের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া

তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক, দুই দেশের মন্ত্রীকে চীনের নিষেধাজ্ঞা

তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক, দুই দেশের মন্ত্রীকে চীনের নিষেধাজ্ঞা

চীনে ঘুস নেওয়ায় সাবেক মেয়রের ১৪ বছর কারাদণ্ড

চীনে ঘুস নেওয়ায় সাবেক মেয়রের ১৪ বছর কারাদণ্ড

কর্মীদের ৫৫ লাখ টাকার গাড়ি উপহার দিলেন রেস্তোরাঁ মালিক

কর্মীদের ৫৫ লাখ টাকার গাড়ি উপহার দিলেন রেস্তোরাঁ মালিক

চীনকে ঠেকাতে প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার ঘোষণা তাইওয়ানের

চীনকে ঠেকাতে প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার ঘোষণা তাইওয়ানের

ধারাবাহিক চীন সফর দুদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেবে

জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ধারাবাহিক চীন সফর দুদেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেবে

আরও পড়ুন

ইমরানের শক্ত ঘাঁটি অবরুদ্ধ, উল্টো বিপদে পড়তে পারে পাকিস্তান

ইমরানের শক্ত ঘাঁটি অবরুদ্ধ, উল্টো বিপদে পড়তে পারে পাকিস্তান

ইয়েমেনে ত্রাণ পাচ্ছে না ৮ লাখ মানুষ

ইয়েমেনে ত্রাণ পাচ্ছে না ৮ লাখ মানুষ

সৌদি আরামকোর সদরদপ্তরে হামলায় ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’

সৌদি আরামকোর সদরদপ্তরে হামলায় ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’

হরমুজে ২ হাজার ৫০০ কনটেইনারসহ জাহাজডুবি

হরমুজে ২ হাজার ৫০০ কনটেইনারসহ জাহাজডুবি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম