‘আমি সব সময় অন্যদের সাহস জুগিয়েছি, আজ নিজের জন্যই কোনো শক্তি খুঁজে পেলাম না’
Advertisement
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:২৫ এএম
সমীর হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আগামী বুধবার ২৪ বছরে পা দেওয়ার কথা ছিল সমীর হোসেনের। কিন্তু জন্মদিনের আনন্দ উদযাপনের আগেই বিষপান করে নিজের জীবন শেষ করলেন তিনি। ভারতের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ফ্লিপকার্ট মিনিটস-এর এই ডেলিভারি কর্মী এক গ্রাহকের কাছ থেকে ছেঁড়া ১০ রুপির নোট নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় চরম নির্যাতনের শিকার হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত ৪ অক্টোবর রাত সাড়ে ১০টার দিকে পূর্ব দিল্লির বিনোদ নগরে রামপাল সিং নামের এক গ্রাহকের কাছে অর্ডার পৌঁছে দিতে যান সমীর। বিষপানের আগে ধারণ করা একটি ভিডিওতে তিনি পুরো ঘটনার বিবরণ দেন। সমীর জানান, প্রায় ১৫০ টাকার একটি কফি অর্ডারের ক্যাশ টাকা জোগাড় করতে ওই গ্রাহক প্রায় ১৫ মিনিট সময় নেন।
দেরি হওয়ায় কোনো আপত্তি জানাননি সমীর, কেবল ওই গ্রাহককে একটি ছেঁড়া ১০ রুপির নোট বদলে অন্য নোট দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন।
ভিডিওতে সমীর বলেন, ‘আমি তাকে খুব বিনয়ের সঙ্গে বলেছিলাম, আঙ্কেল দয়া করে এটি পরিবর্তন করে দিন। কিন্তু তিনি উলটো দুর্ব্যবহার শুরু করেন। তিনি বলেন, আমার কাছে এটাই আছে, ইচ্ছা হলে নাও, না হলে এখান থেকে চলে যাও।’
ভিডিওতে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘গরিব হওয়া কি কোনো অপরাধ?’ তিনি আরও জানান, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদে তিনি কখনোই তার বাবার কাছে টাকা চাননি।
টাকা-পয়সা না থাকায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে ডেলিভারি কর্মীদের সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সমীর।
তিনি বলেন, ‘আমি আত্মহত্যা করব, কারণ এমনিতেই রাজপথের মাঝখানে আমার আত্মসম্মান ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে।’
নিজেকে একজন পরিশ্রমী কর্মী হিসেবে বর্ণনা করে সমীর জানান, তিনি সাইকেলে চড়ে মানুষের দোরগোড়ায় অর্ডার পৌঁছে দিতেন।
তিনি বলেন, ‘আমি কঠোর পরিশ্রমে বিশ্বাসী। আমার কোনো গাড়ি নেই, তাই সাইকেলেই ডেলিভারি করি। আমি মনে করি, কম খাব তবুও নিজের হালাল কামাই খাব।’
মায়ের উদ্দেশে তিনি বলেন, তিনি নিজেকে মানসিকভাবে খুব শক্ত মনে করতেন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি তাকে শান্তিতে বাঁচতে দেবে না বলে তার ভয় হচ্ছিল।
আরেকটি ভিডিওতে—যেটিকে তিনি নিজের সুইসাইড নোট বলে উল্লেখ করেছেন—সমীর ওই গ্রাহক ও তার নাতি রাকেশকে এই লাঞ্ছনার জন্য দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘আমি জানি তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নথিভুক্ত হবে না। গত রাতেই আমি তা দেখেছি। তার স্ত্রী তাকে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন, কিন্তু তাতে লাভ কী? আগে কাউকে মারধর করবেন আর তারপর ক্ষমা চাইবেন! হয়তো আমার মৃত্যুর পর কেউ কথা শুনবে... আমার কিছু হলে এই দুজনই দায়ী থাকবে।’
সমীর নিজেকে ‘মানসিকভাবে ভীষণ শক্ত’ দাবি করলেও এই লাঞ্ছনার পর তিনি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলেন। পরিবারকে তিনি তখন কিছুই জানাননি।
তিনি আরও বলেন, ‘গরিব হওয়াই যেন সারা জীবন লাঞ্ছিত হওয়ার মূল কারণ। যে কেউ আমাদের যা খুশি তাই বলতে পারে... আমি যে মানুষটি সবসময় অন্যদের সাহস জুগিয়েছি, আজ নিজের জন্যই কোনো শক্তি খুঁজে পেলাম না।’
ডার্ক স্টোরের কেউ তার কথা শোনেনি বলে অভিযোগ করলেও সহকর্মী গিগ শ্রমিকরা তাকে সমর্থন দেওয়ায় তাদের ধন্যবাদ জানান সমীর।
আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, সমীর একটি তরল পদার্থভরা বোতল খুলছেন। সেটি পান করে তিনি বলছেন, ‘আমি মরে যাব।’
সমীরের মা কালিমা অভিযোগ করেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এবং তিনি হুমকি দিয়ে বলেছেন যে তিনি যেকোনো অপরাধ করে সহজেই পার পেয়ে যাবেন।
কালিমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘তারা আমার ছেলের দারিদ্র্য নিয়ে উপহাস করেছে।’
পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) আত্মহত্যায় প্ররোচনা সংক্রান্ত ১০৮ ধারা যুক্ত করা হয়েছে এবং সমীরের মৃত্যুর পেছনের পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।



