‘টাকা নেই, ভবিষ্যৎ নেই, আশাও নেই’, যুদ্ধের চাপে বিপর্যস্ত ইরানিরা
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২০ এএম
সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আট মাস ধরে চলা যুদ্ধের ধাক্কায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে ইরান। লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সংকটে খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছে দেশটির সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক পরিবারকে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে সঞ্চয় ভাঙতে হচ্ছে, ঋণ করতে হচ্ছে কিংবা জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে হচ্ছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সেপ্টেম্বরে ইরানে ভোক্তাপণ্যের দাম প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। বার্ষিক মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশে। খাদ্য ও পানীয়ের দাম বেড়েছে ১২১ দশমিক ৮ শতাংশ। ফলে পরিবারগুলো খাবার কেনার ব্যয় সামলাতে গিয়ে অন্যান্য খাতে খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ৪৭ বছর বয়সী দোকানি মোহাম্মদ আলি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমাদের টাকা নেই, ভবিষ্যৎ নেই, আশাও নেই। আমরা ভয়ে বেঁচে থাকতে থাকতে ক্লান্ত—আবার যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাবে, সেই ভয়; আবার মাস শেষে সংসারের খরচ চালাতে পারব না, সেই ভয়।’
দেশটির অর্থমন্ত্রী আলী মাদানিজাদেহ মঙ্গলবার জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তিনি বলেন, মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছেন পেনশনভোগী, শ্রমিক ও সরকারি কর্মচারীরা।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, তিন সদস্যের একটি শ্রমজীবী পরিবারের মাসিক ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় প্রায় ৩৩৬ ডলার। অথচ মুক্তবাজারের বিনিময় হার অনুযায়ী গড় মাসিক মজুরি প্রায় ৯২ ডলার। অর্থাৎ আয়ের তুলনায় ব্যয় কয়েক গুণ বেশি। সেপ্টেম্বরে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। আবাসন, পরিষেবা ও জ্বালানির ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৩৮ শতাংশ।
চাকরির বাজারেও বাড়ছে চাপ। বসন্তকালে ইরানের বেকারত্বের হার বেড়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেকার। অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যয় কমিয়ে নতুন নিয়োগ বন্ধ রাখায় চাকরিপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।
যুদ্ধের কারণে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের তেল রপ্তানি, বাণিজ্য ও সরকারি রাজস্বে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানি বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার প্রভাব।
দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মূল্য গত এক বছরে অর্ধেকেরও বেশি কমে যাওয়ায় বিদেশে পড়াশোনার স্বপ্নও ভেঙে যাচ্ছে অনেক তরুণের। তুরস্কে দুই বছর চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়ার পর টিউশন ফি দিতে না পেরে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী শাহরিয়ার। তার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থী একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারিত নিষেধাজ্ঞা। গত ২৪ আগস্ট ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ঘোষিত এসব নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের জন্য তেহরানের অর্থায়ন কমানো। তবে আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা ও কাঁচামাল সংগ্রহে বাধা এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সংকটে পড়েছে।
অর্থনৈতিক দুরবস্থা ইরানের সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে কেন্দ্র করে দেশটিতে একাধিকবার বিক্ষোভ হয়েছে। জানুয়ারির অস্থিরতায় হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইরানি কর্মকর্তারা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। যুদ্ধ, বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
