বাইন্যান্সে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো চুরি, অভিযোগের তীর এশিয়ার এক দেশের দিকে
Advertisement
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৭ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে হ্যাকাররা। বিশ্লেষকদের ধারণা, উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকাররা এ হামলা চালিয়েছে। ঘটনাটি ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে দরপতন ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাইন্যান্স অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় এবং গ্রাহকদের ক্ষতির অর্থ প্রতিষ্ঠানটি বহন করবে বলে জানায়। টেথার, সার্কেল ও ডোনাল্ড ট্রাম্প-সমর্থিত ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়ালের মতো স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক দ্রুত ফ্রিজ করতে সক্ষম হয়েছে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বাইন্যান্স জানায়, ‘এটি ছিল জটিল একটি হামলা। পরিস্থিতি সমাধানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানিয়েছে, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের একটি অংশ জব্দ করতে অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। আগামী ৪৫ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলনসেবা চালু করার প্রত্যাশা করছে বাইন্যান্স। তবে বাকি ৩৩০ কোটি ডলারের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
বাইন্যান্সের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তাজনিত বিপর্যয়ের সময় গ্রাহকদের সম্পদ সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির এক বিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন রিজার্ভ রয়েছে। ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ নামে পরিচিত এ তহবিল গ্রাহকদের সম্পদ রক্ষায় গঠিত। বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, ক্ষতির অর্থ কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকেও বহন করা হবে।
মার্কিন ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেনালাইসিসের মতে, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শুরু হওয়া হামলার মূল অংশটি প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়। উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আগে যেসব বড় সাইবার হামলার অভিযোগ উঠেছিল, এ ঘটনার সঙ্গে সেগুলোর কৌশলগত মিল রয়েছে।
টিআরএমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাইন্যান্সের ব্যবহৃত কিছু ওয়ালেট থেকে অর্থ সরিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটে পাঠানোর নির্দেশ দিতে সক্ষম হয়েছিল। ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে চালানো হামলার সঙ্গেও এর মিল রয়েছে। ওই ঘটনায় বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
টিআরএম তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিশ্লেষণে বলেছে, এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার বিশেষায়িত হ্যাকার ইউনিট জড়িত বলে তাদের ধারণা। টিআরএম ও চেনালাইসিস—উভয় প্রতিষ্ঠানই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়েছে।
‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাক’
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত সাইবার ইউনিট ব্যবহার করে গুপ্তচরবৃত্তি, অর্থ চুরি ও রাজস্ব সংগ্রহের কাজ চালিয়ে আসছে। তবে পিয়ংইয়ং বরাবরই এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেনেভায় উত্তর কোরিয়ার মিশন ও চীনে দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাইন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা টেং এক্সে লিখেছেন, ‘আপনাদের অর্থ নিরাপদ এবং সব ধরনের ক্ষতির দায় আমরা নিচ্ছি। আমাদের তদন্তে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করা যায়নি।’
ক্রিপ্টো বাজারে ব্যাপক দরপতনের মধ্যে বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জিএসআরের আরাভিন্দ শ্রীনিবাসন ঘটনাটিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাক’ বলে মন্তব্য করেছেন।
হামলার খবরের পর বিটকয়েনের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে নেমে আসে। ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে পৌঁছায়। পরে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়।
বাইন্যান্সের নিজস্ব টোকেন বিএনবির দামও কমেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজার বিশ্লেষণকারী ওয়েবসাইট কয়েনগেকোর তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় টোকেনটির দাম ৫ শতাংশ কমে ৭০৯ ডলার ৭০ সেন্টে দাঁড়ায়। এ ঘটনার প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেও।
ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস গ্লোবাল জানিয়েছে, এ হামলায় তাদের কোনো ক্ষতি হয়নি। তারপরও প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমেছে। বিটকয়েন কেনার জন্য পরিচিত প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজির শেয়ারও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বর্ধিত লেনদেনে প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে।
প্রকৌশলীর ল্যাপটপ থেকে হামলার সূত্রপাতের সন্দেহ
বাইন্যান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির এক প্রকৌশলীর হ্যাক হওয়া ল্যাপটপ থেকে হামলার সূত্রপাত হতে পারে। ওই ল্যাপটপের মাধ্যমে হামলাকারী বাইন্যান্সের একটি সিস্টেমে প্রবেশ করে অননুমোদিতভাবে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পায়।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, ‘হামলার প্রবেশপথ হতে পারে এমন আক্রান্ত কম্পিউটারের মাধ্যমে পুরো আক্রমণের গতিপথ শনাক্ত করার চেষ্টা করছে আমাদের নিরাপত্তা দল।’ পরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, নিরাপত্তাব্যবস্থায় আরও কয়েকটি দুর্বল প্রবেশপথের সন্ধান পাওয়া গেছে।
টোকিওভিত্তিক বিলুপ্ত বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ মাউন্ট গক্সের সাবেক প্রধান মার্ক কারপেলেসের মতে, হামলাকারীরা বাইন্যান্সের অন্তত দুটি ওয়ালেটের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি বা প্রাইভেট কি-তে প্রবেশাধিকার পেয়ে থাকতে পারে। প্রায় ১২ বছর আগে ৫০ কোটি ডলারের বিটকয়েন চুরির ঘটনার পর ধসে পড়েছিল মাউন্ট গক্স।
কারপেলেস বলেন, বাইন্যান্স সম্ভবত একাধিক সিস্টেমে তাদের সম্পদ ভাগ করে রেখেছিল, যাতে কোনো একটি সিস্টেমে হামলা হলেও সব সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তবে এরপরও একক হামলায় বিপুল পরিমাণ সম্পদ হারানোর ঝুঁকি থেকে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পদ চুরির সম্ভাব্য ক্ষতির বাইরেও এ ঘটনার প্রভাব পুরো ক্রিপ্টো খাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ সুদের হার এবং এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ায় এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে এ খাত।
হংকংভিত্তিক হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সান বলেন, এ ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার আগ্রহ আরও কমিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জে রাখা ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
বাইন্যান্সের নিরাপত্তা তহবিলের চেয়েও বেশি চুরি
বাইন্যান্সের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন ডিজিটাল সম্পদ কেনাবেচা ও লেনদেন করতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে তাদের নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। ওই বছর প্রতিষ্ঠানটির হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
হামলার পর বিভিন্ন ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান চুরি হওয়া সম্পদ উদ্ধারে পদক্ষেপ নিয়েছে। স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, এ ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ তারা ফ্রিজ করেছে। সার্কেল ফ্রিজ করেছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ।
ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল জানিয়েছে, সম্পদ জব্দ করতে তারা কাস্টডিয়ান প্রতিষ্ঠান বিটগোর সঙ্গে কাজ করেছে। বাইন্যান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ইয়ে হে জানিয়েছেন, ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং ওয়ার্ল্ড লিবার্টির প্রায় ২০ লাখ ডলারের টোকেন জব্দ করা হয়েছে। ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান রিপলও প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ ফ্রিজ করেছে বলে জানান তিনি।
ক্রিপ্টো খাতে ধারাবাহিক চুরির ঘটনার মধ্যে নতুন এ হামলা যুক্ত হলো। টিআরএম ল্যাবসের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি হামলায় মোট ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটগেট জানিয়েছিল, তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছে। এসব ঘটনা ডিজিটাল সম্পদ খাতের নিরাপত্তা দুর্বলতার বিষয়টি সামনে এনেছে।
মুডিস রেটিংসের ডিজিটাল সম্পদ বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিয়ানো ভেনট্রিচেল্লি বলেন, এ ঘটনার সামগ্রিক ঋণ ও শিল্প খাতের ওপর প্রভাব নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কত সম্পদ উদ্ধার করা যায়, কতটা ক্ষতি হয়, কোন কোন প্রতিষ্ঠান এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এর ফলে ডিজিটাল সম্পদ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন বা আস্থার সংকট তৈরি হয় কি না—তার ওপর।
