বড় হামলার শিকার ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম ‘বাইন্যান্স’, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হলেও ব্যবহারে বিশ্বে ৫৬তম
Advertisement
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:১৮ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, হ্যাকাররা তাদের সিস্টেম থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করেছে। অনলাইন নিরাপত্তা ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এটি বৈশ্বিক ক্রিপ্টো খাতের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সাইবার চুরির ঘটনা হতে পারে।
বাইন্যান্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক তারা তাৎক্ষণিকভাবে ফ্রিজ বা অকার্যকর করতে পেরেছে। তবে বাকি বিপুল পরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি এখনো হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে দুটি শীর্ষস্থানীয় ডিজিটাল বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক তথ্য বলছে, উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট একটি কুখ্যাত হ্যাকার দল এতে জড়িত থাকতে পারে।
ব্লকচেইনভিত্তিক গোয়েন্দা সংস্থা টিআরএম ল্যাবসের (TRM Labs) মতে, বাইন্যান্সে হামলার পদ্ধতির সঙ্গে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট সাইবার হামলায় ব্যবহৃত কৌশলের মিল রয়েছে। বিশেষ করে গত বছর ক্রিপ্টো প্ল্যাটফর্ম বাইবিট (Bybit) থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরির ঘটনার সঙ্গে এ হামলার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য পাওয়া গেছে।
হামলার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি বাইন্যান্স। তবে এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, অপরাধীদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে একাধিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে তারা।
এ ঘটনার পর বাইন্যান্সের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং ব্যবহারকারীদের আমানত কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ক্রিপ্টো ব্যবহারে বিশ্বে ৫৬তম বাংলাদেশ
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে এর লেনদেন বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেনালাইসিসের (Chainalysis) ‘দ্য ২০২৬ জিওগ্রাফি অব ক্রিপ্টো রিপোর্ট’ অনুযায়ী, চলতি বছর তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারে ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৫৬তম।
তালিকায় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারত ষষ্ঠ, পাকিস্তান ২৫তম এবং শ্রীলঙ্কা ৮২তম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক ক্রিপ্টো ব্যবহারের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩তম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর বিশ্বজুড়ে ক্রিপ্টো অর্থনীতি মন্দা কাটিয়ে উঠেছে। এ সময়ে ক্রিপ্টোকারেন্সির মোট বাজারমূল্য প্রায় ৫০ শতাংশ বা ২ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার কমলেও অন-চেইন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। আগের মেয়াদের ৯ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে তা কমে ৯ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা ১ দশমিক ৬ শতাংশ কম।
চলতি বছরের সূচক তৈরিতে চারটি বিষয় বিবেচনা করা হয়েছে। এগুলো হলো সার্ভিস ফ্লো, অভ্যন্তরীণ পিয়ার-টু-পিয়ার (পি২পি) কার্যক্রম, আন্তসীমান্ত লেনদেন এবং অন-চেইন ব্যালেন্স। তৃণমূল পর্যায়ে ক্রিপ্টো ব্যবহারে শীর্ষে রয়েছে ব্রাজিল। ২৫২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে লাতিন আমেরিকার দেশটি সূচকের প্রতিটি উপাদানেই এগিয়ে রয়েছে।
২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এ সময়ে বিটকয়েনের দাম একপর্যায়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছালেও পরে ডলারের হিসাবে বড় দরপতনের মুখে পড়ে। শীর্ষ অবস্থান থেকে এর দাম সর্বোচ্চ ৬৭ হাজার ডলার পর্যন্ত কমেছিল। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, সার্ভিস ইনফ্লো, অভ্যন্তরীণ পিয়ার-টু-পিয়ার কার্যক্রম এবং আন্তসীমান্ত স্থানান্তর মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী ক্রিপ্টো অর্থনীতির কার্যক্রম আগের মেয়াদের তুলনায় মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশে বিটকয়েন, ইথেরিয়াম, রিপল ও লাইটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সি বিভিন্ন কাজে লেনদেন করা হয়। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউয়ের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৪৩ লাখ বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা কোনো দেশের বৈধ কর্তৃপক্ষ ইস্যু করে না। ফলে এসব মুদ্রার বিপরীতে কোনো আর্থিক দাবি স্বীকৃত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থাও এসব মুদ্রার লেনদেন অনুমোদন করে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের (আইবিএ) অধ্যাপক মো. মহিউদ্দিন গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল মুদ্রার লেনদেন বৈধ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে চেনালাইসিসের সূচক কোনো দেশের সরকারি বা আইনি স্বীকৃতি বিশ্লেষণ করে না। বরং বিভিন্ন দেশের সাধারণ মানুষ বা তৃণমূল পর্যায়ে কী পরিমাণ বাস্তব লেনদেন ও কার্যক্রম হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
তিনি বলেন, সরকারের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারকারীরা অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্রিপ্টো ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিবেদনে সেই কার্যক্রমেরই প্রতিফলন ঘটেছে। এ সূচকে শুধু লেনদেনের মোট পরিমাণ বিবেচনা করা হয় না; দেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ভিত্তিতেও তা পরিমাপ করা হয়। ফলে উন্নত দেশের তুলনায় কোনো উন্নয়নশীল বা নিম্ন আয়ের দেশে লেনদেনের পরিমাণ কম হলেও মাথাপিছু হিসাবের কারণে দেশটি সূচকে এগিয়ে থাকতে পারে।
অধ্যাপক মহিউদ্দিনের মতে, উন্নত বিশ্বের মানুষের কাছে ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত বিকল্প বিনিয়োগ বা প্রযুক্তিগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটি অনেক সময় অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম হয়ে উঠছে। ফ্রিল্যান্সারদের অর্থ গ্রহণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জটিলতা এড়ানো এবং সহজে অর্থমূল্য স্থানান্তরের কাজে ক্রিপ্টো ও স্টেবলকয়েনের ব্যবহার বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যাংকভিত্তিক চ্যানেল বন্ধ থাকলেও পিয়ার-টু-পিয়ার নেটওয়ার্ক, বিকেন্দ্রীকৃত এক্সচেঞ্জ এবং আনুষ্ঠানিক খাতের বাইরের বিভিন্ন মাধ্যমে মানুষ ক্রিপ্টো লেনদেন করছে। মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে থাকা উদীয়মান বাজারগুলোতে তৃণমূল পর্যায়ে এ ধরনের লেনদেন অব্যাহত রয়েছে।
