প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে এআই দিয়ে তৈরি ভাইরাস প্রবেশ
Advertisement
আইটি ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৮ পিএম
অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না, এমন ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এআই।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না, এমন ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। এআই প্রযুক্তির সাহায্যে নকশা করা একটি ভাইরাস পরীক্ষামূলকভাবে এক রোগীর শরীরে প্রয়োগ করেছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ওই রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত ভাইরাসটি তৈরি করেছে ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক এআই স্টার্টআপ র্যাডিক্যাল নিউমেরিকস। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চিকিৎসার উদ্দেশ্যে এআই দিয়ে নকশা করা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রয়োগের ঘটনা এটিই প্রথম।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্টের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুরুতর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত এক রোগীর চিকিৎসায় পরীক্ষামূলকভাবে এই ভাইরাস ব্যবহার করা হয়েছে। ভাইরাসটি তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মডেল ‘ওমনি-১’ ব্যবহার করা হয়েছে।
এই মডেল মূলত ব্যাকটেরিওফাজ বা ফাজ নামের বিশেষ ধরনের ভাইরাস নকশা করতে পারে। ফাজ মানুষের কোষে আক্রমণ না করে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত ও ধ্বংস করে। প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়লে গুরুতর সংক্রমণের চিকিৎসায় বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে ফাজ থেরাপি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে।
সাধারণত ফাজ থেরাপির ক্ষেত্রে রোগীর সংক্রমণের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে, এমন প্রাকৃতিক ভাইরাস খুঁজে বের করতে হয়। তবে র্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের এআই মডেল অনুসরণ করেছে ভিন্ন কৌশল। নতুন কোনো ভাইরাস খোঁজার পরিবর্তে আগে থেকেই থাকা একটি ভাইরাসের নির্দিষ্ট অংশ পুনরায় নকশা করেছে এটি। এর উদ্দেশ্য হলো, সংক্রমণ ঘটানো নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াকে আরও নিখুঁতভাবে শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সক্ষম ভাইরাস তৈরি করা।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এআইনির্ভর এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে রোগীর সংক্রমণের ধরন বিশ্লেষণ করে কয়েক দিনের মধ্যেই উপযোগী ভাইরাস তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। এতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জটিল সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন বিকল্প খুঁজে পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, প্রচলিত চিকিৎসায় কাজ না হলে বিশেষ পরিস্থিতিতে পরীক্ষামূলক চিকিৎসা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, এমন একটি কর্মসূচির আওতায় রোগীর শরীরে ভাইরাসটি প্রয়োগ করা হয়। এর আগে রোগীর শরীর থেকে সংগ্রহ করা ব্যাকটেরিয়ার নমুনায় ভাইরাসটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছিল। র্যাডিক্যাল নিউমেরিকসের দাবি, পরীক্ষাগারে ভাইরাসের মিশ্রণটি নমুনায় থাকা অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
তবে চিকিৎসার পর রোগীর শারীরিক অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছে, সংক্রমণ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়েছে কি না কিংবা রোগীর সুনির্দিষ্ট রোগনির্ণয় কী ছিল—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া এখনো চিকিৎসাটির ফলাফল কোনো বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি।
এআই দিয়ে ভাইরাস তৈরিতে সম্ভাবনার পাশাপাশি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
জীববিজ্ঞানের গবেষণায় এআইয়ের ব্যবহার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও এ প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। গত আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আর্ক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা এআই ব্যবহার করে নতুন ধরনের ভাইরাস নকশার কথা জানান। তাদের তৈরি ভাইরাসগুলো পরীক্ষাগারে ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিল।
গবেষণায় এআই দিয়ে নকশা করা প্রায় ৩০০টি ভাইরাল জিনোম সংশ্লেষণ ও পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১৬টি কার্যকর ভাইরাস তৈরি করা সম্ভব হয়েছিল। তবে এই গবেষণার পরীক্ষা মানুষের শরীরে নয়, পরীক্ষাগারে ব্যাকটেরিয়ার ওপর পরিচালিত হয়েছিল।
গবেষকদের মতে, এআইয়ের মাধ্যমে নতুন ভাইরাস নকশা করার সক্ষমতা চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আনতে পারে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এ প্রযুক্তি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই প্রযুক্তি অপব্যবহারের মাধ্যমে মানুষ বা প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর ভাইরাস তৈরির ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
স্ট্যানফোর্ডের গবেষকেরা তাই তাদের গবেষণায় মানুষ বা প্রাণীকে আক্রমণ করতে পারে, এমন ভাইরাসের পরিবর্তে ব্যাকটেরিয়াকে লক্ষ্যবস্তু করে এমন ভাইরাস তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
সব মিলিয়ে, এআইনির্ভর ভাইরাস নকশার প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। তবে মানুষের চিকিৎসায় এর কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ এবং কঠোর জীববৈজ্ঞানিক নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

-6ae43a38e4efc.jpg)