শনাক্তের ৪৭৫ দিন আগেই অগ্ন্যাশয় ক্যানসারের সংকেত ধরবে এআই!
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫২ এএম
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রচলিত পরীক্ষায় ধরা না পড়লেও অগ্ন্যাশয়ের টিস্যুতে ক্যানসারের সূক্ষ্ম লক্ষণ শনাক্ত করতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, রোগ নির্ণয়ের গড় ৪৭৫ দিন আগেই এসব লক্ষণ শনাক্ত করতে সক্ষম এআইভিত্তিক একটি মডেল।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার সাধারণত দেরিতে শনাক্ত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগের লক্ষণ তেমন স্পষ্ট থাকে না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে রোগ ধরা পড়ার সময় ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা কঠিন হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি প্রযুক্তি।
রেডিওমিকসভিত্তিক আর্লি ডিটেকশন মডেল বা রেডমড নামের এই প্রযুক্তি অগ্ন্যাশয়ের টিস্যুর এমন কিছু সূক্ষ্ম পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে, যা সাধারণত চিকিৎসকদের চোখে পড়ে না। গাট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গবেষকদের আশা, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার আরও আগে শনাক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। এতে রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা শুরু করার সুযোগ তৈরি হবে। তবে নিয়মিত চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা আরও বিস্তৃতভাবে যাচাই করতে হবে।
যেভাবে কাজ করে এআই
অগ্ন্যাশয়ের ডাক্টাল অ্যাডেনোকার্সিনোমা (পিডিএসি) অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের সবচেয়ে সাধারণ ধরন। এ রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে টিস্যুর পরিবর্তন এতটাই সূক্ষ্ম হতে পারে যে প্রচলিত কম্পিউটেড টোমোগ্রাফি (সিটি) স্ক্যানেও তা শনাক্ত করা কঠিন।
রেডমড সিটি স্ক্যানের ছবি বিশ্লেষণ করে অগ্ন্যাশয়ের টিস্যুর সূক্ষ্ম গঠন ও বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন খুঁজে বের করে। এ ধরনের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের পদ্ধতিকে বলা হয় রেডিওমিক্স।
এ ছাড়া প্রযুক্তিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অগ্ন্যাশয় শনাক্ত করে এবং আশপাশের অঙ্গ থেকে সেটিকে আলাদা করতে পারে। ফলে চিকিৎসকদের হাতে অঙ্গটির সীমানা চিহ্নিত করার প্রয়োজন কমে যায়।
রোগ নির্ণয়ের ৪৭৫ দিন আগেই সংকেত
প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করতে গবেষকেরা ২১৯ জন রোগীর সিটি স্ক্যান বিশ্লেষণ করেন। স্ক্যান করার সময় অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্টরা তাদের কারও মধ্যেই অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারের লক্ষণ শনাক্ত করতে পারেননি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সবারই এ রোগ ধরা পড়ে।
গবেষণায় দেখা যায়, ৮৭ জন রোগীর স্ক্যান করা হয়েছিল রোগ নির্ণয়ের ৩ থেকে ১২ মাস আগে। ৭৬ জনের স্ক্যান করা হয়েছিল ১২ থেকে ২৪ মাস আগে। আর ৫৬ জনের স্ক্যান করা হয়েছিল রোগ নির্ণয়ের দুই বছরেরও বেশি আগে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রায় তিন বছর আগে।
গবেষকেরা এসব স্ক্যানের সঙ্গে এমন ১ হাজার ২৪৩ জনের স্ক্যানের তুলনা করেন, যাদের পরবর্তী তিন বছরেও অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার ধরা পড়েনি।
গবেষকদের মতে, ক্যানসার এত আগে শনাক্ত করা সম্ভব হলে রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ বাড়তে পারে। কারণ, ক্যানসার অগ্ন্যাশয়ের বাইরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই চিকিৎসা শুরু করা গেলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি থাকে।
রেডিওলজিস্টদের চেয়েও এগিয়ে এআই
গবেষণায় ক্যানসার শনাক্ত করার ক্ষেত্রে রেডমডের কার্যকারিতা অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্টদের সঙ্গে তুলনা করা হয়। এতে দেখা যায়, এআই মডেলটির সংবেদনশীলতা ছিল ৭৩ শতাংশ। অন্যদিকে রেডিওলজিস্টদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৩৯ শতাংশ।
রোগ নির্ণয়ের দুই বছরেরও বেশি আগে করা স্ক্যানের ক্ষেত্রে ব্যবধানটি ছিল আরও বেশি। এ সময় রেডমডের শনাক্তকরণের হার ছিল ৬৮ শতাংশ। রেডিওলজিস্টদের ক্ষেত্রে তা ছিল ২৩ শতাংশ।
ক্যানসার নেই—এমন ব্যক্তিদের স্ক্যান শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করা হয়। বিভিন্ন হাসপাতালের ৫৩৯ জনের একটি পৃথক তথ্যসমষ্টিতে রেডমড ৮১ শতাংশের বেশি স্ক্যানকে সঠিকভাবে ক্যানসারমুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের একটি উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে থাকা ৮০ জনের স্ক্যান বিশ্লেষণ করে এ হার পাওয়া যায় ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
একই রোগীর কয়েক মাসের ব্যবধানে করা স্ক্যান বিশ্লেষণ করেও প্রায় ৯০ থেকে ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রে একই ধরনের ফল পেয়েছে এআই মডেলটি। গবেষকদের মতে, এ ধারাবাহিকতা প্রযুক্তিটির কার্যকারিতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
আরও গবেষণা প্রয়োজন
গবেষণার ফল আশাব্যঞ্জক হলেও এখনই নিয়মিত চিকিৎসায় রেডমড ব্যবহারের সুপারিশ করছেন না গবেষকেরা। তাদের মতে, বিভিন্ন জাতিগত জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি বাস্তব চিকিৎসা পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে, এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে হবে।
যাদের কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই ওজন কমছে কিংবা যাদের সম্প্রতি ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে, তাদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন বিজ্ঞানীরা।
অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসার সুযোগ বাড়তে পারে। তবে রেডমড এখনো সাধারণ মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠিত স্ক্রিনিং পরীক্ষা নয়। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগেভাগে রোগ শনাক্ত করা সম্ভব কি না এবং এর মাধ্যমে রোগীদের বেঁচে থাকার হার বাড়ে কিনা, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: সাইন্স ডেইলি
