ডিম্বাশয়ে চকলেট সিস্টে কি বন্ধ্যত্ব হয়, যা বলছেন চিকিৎসক
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৯ পিএম
নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের অন্যতম জটিল সমস্যা এন্ডোমেট্রিওসিস।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নারীদের প্রজননস্বাস্থ্যের অন্যতম জটিল সমস্যা এন্ডোমেট্রিওসিস। এ সমস্যার কারণে ডিম্বাশয়ে তৈরি হতে পারে চকলেট সিস্ট, যা তলপেটে ব্যথা, মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত এবং গর্ভধারণে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়া হলে অনেক ক্ষেত্রে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
চকলেট সিস্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সাহানারা চৌধুরী।
ডিম্বাশয়ে চকলেট সিস্ট কী?
ডা. সাহানারা চৌধুরী জানান, জরায়ুর ভেতরের স্তরকে এন্ডোমেট্রিয়াম বলা হয়। ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের প্রভাবে এ স্তর পুরু হয় এবং মাসিকের সময় এর একটি অংশ রক্তের সঙ্গে শরীর থেকে বের হয়ে যায়। মাসিক শেষ হলে আবার নতুন করে এ স্তর তৈরি হয়।
কিন্তু কখনো কখনো এন্ডোমেট্রিয়ামের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বেড়ে ওঠে। এ অবস্থাকে এন্ডোমেট্রিওসিস বলা হয়। এসব টিস্যু ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব কিংবা পেটের ভেতরের আবরণীতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মাসিকের সময় এসব টিস্যুতেও রক্তক্ষরণ হলেও তা স্বাভাবিকভাবে বের হতে পারে না। ফলে রক্ত জমে ধীরে ধীরে সিস্ট তৈরি হয়।
দীর্ঘদিন ধরে রক্ত জমে ঘন ও গাঢ় বাদামি রং ধারণ করলে তা দেখতে অনেকটা গলানো চকলেটের মতো হয়। এ কারণে এ ধরনের সিস্টকে চকলেট সিস্ট বলা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি এক ধরনের ওভারিয়ান এন্ডোমেট্রিওমা।
কেন হয় চকলেট সিস্ট?
চকলেট সিস্ট হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া কাজ করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—
১. অস্বাভাবিক ঋতুস্রাব: মাসিকের সময় রক্তের কিছু অংশ ফ্যালোপিয়ান টিউব দিয়ে পেটের ভেতরের দিকে প্রবাহিত হতে পারে। একে রেট্রোগ্রেড মেনস্ট্রুয়েশন বলা হয়। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে এন্ডোমেট্রিওসিসের সম্পর্ক রয়েছে।
২. টিস্যুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন: পেটের ভেতরের আবরণীর কিছু কোষ পরিবর্তিত হয়ে এন্ডোমেট্রিয়ামের মতো টিস্যু তৈরি করতে পারে। এ প্রক্রিয়াকে সিলোমিক মেটাপ্লাসিয়া বলা হয়।
৩. হরমোনের প্রভাব: ইস্ট্রোজেন হরমোন এন্ডোমেট্রিওসিসের টিস্যুর বৃদ্ধি ও কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। এ কারণে হরমোনের প্রভাবও রোগটির সঙ্গে সম্পর্কিত।
৪. অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা: সিজারিয়ান বা অন্য কোনো অস্ত্রোপচারের পর কাটা স্থানের দাগে এন্ডোমেট্রিওসিসের টিস্যু তৈরি হতে পারে। তবে এটি সাধারণত অস্ত্রোপচারের স্থানে হওয়া এন্ডোমেট্রিওসিসের একটি ধরন, ডিম্বাশয়ের চকলেট সিস্টের সরাসরি কারণ নয়।
এ ছাড়া বংশগত প্রবণতা ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার কিছু বিষয়ও এন্ডোমেট্রিওসিসের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সবার ক্ষেত্রে একই কারণে এ সমস্যা হয় না।
চকলেট সিস্টের লক্ষণ কী?
চকলেট সিস্টের উপসর্গ রোগীভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে তীব্র ব্যথা দেখা দিলেও কারও আবার উল্লেখযোগ্য কোনো উপসর্গ থাকে না। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
- তলপেটে দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ব্যথা।
- মাসিকের সময় তীব্র ব্যথা।
- মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত।
- যৌনমিলনের সময় বা পরে ব্যথা।
- প্রস্রাব বা মলত্যাগের সময় ব্যথা, বিশেষ করে মাসিকের সময়।
- গর্ভধারণে সমস্যা।
- দীর্ঘদিন ব্যথার কারণে ক্লান্তি, বমি বমি ভাব ও মানসিক অস্বস্তি।
এসব উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে মাসিকের ব্যথা যদি দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করে, তাহলে সেটিকে স্বাভাবিক ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।
চকলেট সিস্ট কি গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করে?
ডা. সাহানারা চৌধুরীর মতে, নারীদের বন্ধ্যাত্বের অন্যতম কারণ এন্ডোমেট্রিওসিস ও চকলেট সিস্ট। এ সমস্যার কারণে প্রজনন অঙ্গগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
চকলেট সিস্ট গর্ভধারণে কয়েকভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
ফ্যালোপিয়ান টিউবের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া: এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে পেটের ভেতরে প্রদাহ ও টিস্যুর মধ্যে আঠালো সংযোগ বা অ্যাডহিশন তৈরি হতে পারে। এতে ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব ও জরায়ুর স্বাভাবিক অবস্থান এবং পারস্পরিক সম্পর্ক বদলে যেতে পারে। ফলে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন কিংবা নিষিক্ত ডিম্বাণুর জরায়ুতে পৌঁছানো কঠিন হতে পারে।
ডিম্বাণুর গুণগত মানে প্রভাব: এন্ডোমেট্রিওসিসের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রদাহজনিত পরিবেশ ডিম্বাণুর কার্যকারিতা ও নিষিক্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
ডিম্বাশয়ের ডিম্বাণুর মজুত কমে যাওয়া: বড় চকলেট সিস্ট ডিম্বাশয়ের স্বাভাবিক টিস্যুর ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের সময়ও ডিম্বাশয়ের কিছু সুস্থ টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে ডিম্বাণুর মজুত বা ওভারিয়ান রিজার্ভ কমে যেতে পারে।
যৌনমিলনে অসুবিধা: তীব্র ব্যথার কারণে যৌনমিলনে অনীহা তৈরি হতে পারে। এতে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সুযোগ কমে যেতে পারে।
তবে চকলেট সিস্ট থাকলেই যে একজন নারী গর্ভধারণ করতে পারবেন না, এমন নয়। সিস্টের আকার, রোগের তীব্রতা, বয়স, ডিম্বাশয়ের কার্যক্ষমতা এবং অন্যান্য প্রজননগত বিষয় বিবেচনা করে গর্ভধারণের সম্ভাবনা নির্ধারণ করা হয়।
কীভাবে চকলেট সিস্ট শনাক্ত করা হয়?
রোগীর উপসর্গ ও চিকিৎসার ইতিহাস জানার পাশাপাশি শারীরিক পরীক্ষা করে চকলেট সিস্ট শনাক্ত করার চেষ্টা করেন চিকিৎসক। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পরীক্ষা করা হতে পারে—
- আলট্রাসনোগ্রাফি: ডিম্বাশয়ে সিস্টের উপস্থিতি, আকার ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয়ে এটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
- ট্রান্সভ্যাজাইনাল আলট্রাসনোগ্রাফি: যোনিপথ দিয়ে করা এ পরীক্ষার মাধ্যমে ডিম্বাশয় ও পেলভিক অঞ্চলের বিস্তারিত ছবি পাওয়া যায়।
- এমআরআই: কিছু ক্ষেত্রে রোগের বিস্তার ও জটিলতা মূল্যায়নে করা হয়।
- ল্যাপারোস্কপি: বিশেষ পরিস্থিতিতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পেটের ভেতর সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা করা হতে পারে।
কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা রোগীর বয়স, উপসর্গ ও চিকিৎসাগত পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।
চকলেট সিস্টের চিকিৎসা কী?
চকলেট সিস্টের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগীর বয়স, ব্যথার তীব্রতা, সিস্টের আকার, রোগের বিস্তার এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার ওপর। সব রোগীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না।
ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা: উপসর্গ তুলনামূলক কম হলে ব্যথানাশক ও হরমোনভিত্তিক ওষুধ দেওয়া হতে পারে। জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল, প্রোজেস্টিনজাতীয় ওষুধ এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে গোনাডোট্রপিন-রিলিজিং হরমোন (জিএনআরএইচ) সংশ্লিষ্ট ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এগুলো ব্যথা ও রোগের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। তবে ওষুধে সিস্ট পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
অস্ত্রোপচার: সিস্ট বড় হলে, তীব্র ব্যথা থাকলে, ওষুধে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ না হলে কিংবা রোগের বৈশিষ্ট্যের কারণে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে সিস্ট অপসারণ এবং আশপাশের অঙ্গের সঙ্গে তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে।
তবে অস্ত্রোপচারের সময় ডিম্বাশয়ের সুস্থ টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকায় সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে—এমন নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সম্ভাব্য উপকার ও ঝুঁকি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি।
চকলেট সিস্ট থাকলে কখন সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করবেন?
চকলেট সিস্ট শনাক্ত হলে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে দেরি না করে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বয়স, ডিম্বাশয়ের ডিম্বাণুর মজুত, সিস্টের আকার এবং স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণের সম্ভাবনা মূল্যায়ন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা যায়।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ সম্ভব হলেও অন্যদের ওষুধ, অস্ত্রোপচার বা সহায়ক প্রজননপ্রযুক্তির প্রয়োজন হতে পারে। তাই সবার জন্য একই চিকিৎসা বা একই সময়ের মধ্যে সন্তান নেওয়ার পরামর্শ প্রযোজ্য নয়।
মনে রাখতে হবে, চকলেট সিস্ট মানেই বন্ধ্যাত্ব নয়। সময়মতো রোগ শনাক্ত করা, ব্যক্তিভিত্তিক চিকিৎসা নেওয়া এবং সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই প্রজননস্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

