পুরুষদের চেয়ে নারীরা কেন বেশি দিন বাঁচেন?
Advertisement
লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:২৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের প্রায় সব দেশেই নারীদের গড় আয়ু পুরুষদের তুলনায় বেশি। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বব্যাপী নারীরা সাধারণত পুরুষদের চেয়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ বছর বেশি বাঁচেন। কিন্তু কেন এই পার্থক্য? পুরুষদের শরীর কি তুলনামূলক দুর্বল, নাকি জীবনযাপনের ধরন ও সামাজিক আচরণ তাদের আয়ু কমিয়ে দেয়?
গবেষকদের মতে, এর পেছনে কোনো একক কারণ দায়ী নয়। বরং জিনগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের প্রভাব, ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন, পেশাগত পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অভ্যাস— সবকিছু মিলেই নারী-পুরুষের গড় আয়ুর ব্যবধান তৈরি করে। বিষয়গুলোকে মূলত তিনটি ভাগে ব্যাখ্যা করা যায়—
১. জৈবিক ও জিনগত কারণ: প্রকৃতিগত কিছু সুবিধা
নারী ও পুরুষের শারীরিক গঠন, ক্রোমোজোম এবং হরমোনের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এসব পার্থক্য রোগ প্রতিরোধ, হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য এবং বার্ধক্যজনিত পরিবর্তনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এক্স ক্রোমোজোমের ভূমিকা
নারীদের সাধারণত দুটি এক্স ক্রোমোজোম (XX) থাকে। অন্যদিকে, পুরুষদের সাধারণত একটি এক্স ও একটি ওয়াই ক্রোমোজোম (XY) থাকে।
এক্স ক্রোমোজোমে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনের একাধিক অনুলিপি নারীদের নির্দিষ্ট কিছু জিনগত সমস্যার বিরুদ্ধে বাড়তি সুরক্ষা দিতে পারে। নারীদের একটি এক্স ক্রোমোজোমে কোনো জিনগত ত্রুটি থাকলে অন্যটির সংশ্লিষ্ট জিন কিছু ক্ষেত্রে সেই ঘাটতির প্রভাব কমাতে পারে। পুরুষদের একটি মাত্র এক্স ক্রোমোজোম থাকায় এক্স-লিঙ্কড কিছু বংশগত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নারীরা সব ধরনের রোগের বিরুদ্ধে বেশি সুরক্ষিত। রোগভেদে নারী-পুরুষের ঝুঁকি আলাদা হতে পারে।
হরমোনের প্রভাব: ইস্ট্রোজেন ও টেস্টোস্টেরন
নারীদের প্রধান যৌন হরমোনগুলোর একটি হলো ইস্ট্রোজেন (Estrogen)। এটি প্রজননস্বাস্থ্যের পাশাপাশি হাড়, রক্তনালি ও শরীরের বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। প্রজননক্ষম বয়সে ইস্ট্রোজেনের কিছু প্রভাব নারীদের হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক হতে পারে।
অন্যদিকে, পুরুষদের প্রধান যৌন হরমোন টেস্টোস্টেরন (Testosterone), যা পেশি, হাড়, যৌনস্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। হরমোনের প্রভাব নারী-পুরুষের শরীরে কিছু পার্থক্য তৈরি করলেও টেস্টোস্টেরন সরাসরি আগ্রাসী আচরণ বা হৃদরোগের কারণ—এমন সরল সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
নারীদের মেনোপজ বা ঋতুস্রাব স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার পর ইস্ট্রোজেনের মাত্রা কমে যায়। এর ফলে হৃদ্রোগসহ কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে নারী-পুরুষের আয়ুর পার্থক্য শুধু হরমোন দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
২. জীবনযাপন ও আচরণগত কারণ: ঝুঁকি বেশি, বিপদও বেশি
জৈবিক পার্থক্যের পাশাপাশি দৈনন্দিন অভ্যাস এবং সামাজিক পরিবেশও পুরুষদের গড় আয়ু কম হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা
অনেক সমাজে পুরুষদের সাহসী, শক্তিশালী ও ঝুঁকি নিতে সক্ষম হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার চাপ থাকে। এর ফলে কিছু পুরুষ বিপজ্জনক আচরণে জড়িয়ে পড়তে পারেন।
সড়ক দুর্ঘটনা, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, মারামারি, সহিংসতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে পুরুষদের মৃত্যুঝুঁকি অনেক ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়। এর পেছনে জৈবিক বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি সামাজিক প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত আচরণও ভূমিকা রাখে।
এসব কারণে অনেক পুরুষ কর্মজীবনের শুরুতেই দুর্ঘটনা বা সহিংসতার শিকার হন, যা সামগ্রিকভাবে পুরুষদের গড় আয়ু কমিয়ে দিতে পারে।
পেশাগত ঝুঁকি
বিশ্বের অনেক দেশে খনি, নির্মাণকাজ, ভারী শিল্পকারখানা, যুদ্ধক্ষেত্র ও অগ্নিনির্বাপণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় পুরুষদের অংশগ্রহণ বেশি।
এসব কাজে ভারী যন্ত্রপাতি, বিষাক্ত পদার্থ, অতিরিক্ত তাপ, ধুলাবালি, উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া এবং প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঘাটতি থাকলে এসব ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার কারণে কিছু পেশায় শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যানসার কিংবা অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসমস্যাও দেখা দিতে পারে। ফলে পেশাগত ঝুঁকি পুরুষদের অকালমৃত্যুর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠতে পারে।
অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস
অনেক দেশে নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে ধূমপান, অতিরিক্ত মদ্যপান এবং কিছু অন্যান্য ক্ষতিকর অভ্যাসের প্রবণতা বেশি। তবে দেশ, বয়স ও সামাজিক পরিবেশভেদে এই চিত্রে পার্থক্য রয়েছে।
ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। অতিরিক্ত মদ্যপান লিভারের ক্ষতি, লিভার সিরোসিস, কিছু ধরনের ক্যানসার এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। অন্যান্য মাদক গ্রহণও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি করতে পারে এবং অকালমৃত্যুর আশঙ্কা বাড়ায়।
দীর্ঘদিন এসব অভ্যাস বজায় থাকলে তা ব্যক্তির সুস্থ জীবনযাপনের সময় কমিয়ে দিতে পারে। তাই স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং তামাক ও ক্ষতিকর মাদক থেকে দূরে থাকা দীর্ঘায়ুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
৩. স্বাস্থ্যসচেতনতা ও মানসিক চাপ: নীরবে বাড়ে বিপদ
শরীরের যত্ন নেওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং মানসিক সমস্যার কথা প্রকাশ করার অভ্যাসও দীর্ঘায়ুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রেও অনেক সমাজে নারী-পুরুষের আচরণগত পার্থক্য দেখা যায়।
চিকিৎসকের কাছে যেতে অনীহা
কিছু পুরুষ অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিলেও তা সহজে স্বীকার করতে চান না। কেউ কাজের ব্যস্ততায় চিকিৎসা পিছিয়ে দেন, আবার কেউ মনে করেন সামান্য সমস্যা নিজে থেকেই সেরে যাবে।
ফলে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ কিংবা ক্যানসারের মতো রোগ সময়মতো শনাক্ত না হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু না করলে অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা বাড়ে এবং চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে চলা অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
মানসিক চাপ চেপে রাখা
অনেক সমাজে পুরুষদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়, কাঁদা বা দুর্বলতা প্রকাশ করা উচিত নয়। নিজের কষ্ট গোপন রাখা কিংবা সব পরিস্থিতিতে শক্ত থাকার এই সামাজিক প্রত্যাশা কিছু পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। মানসিক চাপ ও বিষণ্ণতা শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এ ছাড়া অনেক দেশে পুরুষদের আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুহার নারীদের তুলনায় বেশি দেখা যায়।
তবে মানসিক চাপ সরাসরি হার্ট অ্যাটাক বা আত্মহত্যার একমাত্র কারণ নয়। ব্যক্তির পরিস্থিতি, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ, সামাজিক সহায়তা এবং অন্যান্য ঝুঁকিও গুরুত্বপূর্ণ।
মানসিক কষ্ট হলে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা, প্রয়োজনে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া এবং নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে শেখা অত্যন্ত জরুরি।
তাহলে কি পুরুষদের আয়ু কম হওয়া অনিবার্য?
না। নারীদের তুলনায় পুরুষদের গড় আয়ু কম হলেও এর অর্থ এই নয় যে প্রত্যেক পুরুষ নারীদের আগে মারা যাবেন। গড় আয়ু হলো একটি জনসংখ্যাভিত্তিক পরিসংখ্যান; ব্যক্তির আয়ু নির্ভর করে তার স্বাস্থ্য, জীবনযাপন, পরিবেশ, জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং চিকিৎসাসেবার সুযোগসহ নানা বিষয়ের ওপর।
পুরুষদের অকালমৃত্যুর অনেক ঝুঁকিই কমানো সম্ভব। ধূমপান ও ক্ষতিকর মাদক পরিহার, নিরাপদে গাড়ি চালানো, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা নিশ্চিত করা, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপনে সহায়তা করতে পারে।
একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া এবং প্রয়োজনের সময় সাহায্য চাওয়াও জরুরি। নিজের সমস্যার কথা বলা দুর্বলতা নয়; বরং নিজের সুস্থতার দায়িত্ব নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুরুষদের তুলনায় নারীদের গড় আয়ু বেশি হওয়ার পেছনে জৈবিক ও জিনগত বৈশিষ্ট্য, হরমোনের প্রভাব, জীবনযাপনের ধরন, পেশাগত ঝুঁকি এবং স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের অভ্যাস— সবকিছুরই ভূমিকা রয়েছে। কোনো একটি কারণ দিয়ে এই ব্যবধানের সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া যায় না।
প্রকৃতিগত কিছু সুবিধা নারীদের দীর্ঘায়ুতে সহায়তা করতে পারে। অন্যদিকে, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ, অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস, চিকিৎসা নিতে দেরি করা এবং মানসিক কষ্ট চেপে রাখার প্রবণতা কিছু পুরুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সহজ কথায়, দীর্ঘায়ু শুধু প্রকৃতির দেওয়া উপহারের ওপর নির্ভর করে না; নিজের শরীর ও মনের যত্ন নেওয়ার অভ্যাসও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নারী-পুরুষ সবার জন্যই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ সুস্থ ও দীর্ঘ জীবনের অন্যতম চাবিকাঠি।
