নির্বাচনের পর নতুন সমীকরণ, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন কে?
Advertisement
প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫১ এএম
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী শেষ পর্যন্ত কে হবেন, তা নিশ্চিত হয়নি। সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নির্বাচন শেষ হলেও ইসরাইলে সরকার গঠন নিয়ে কাটেনি অনিশ্চয়তা। গত মঙ্গলবারের নির্বাচনে কোনো পক্ষই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ফলে আবারও প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। মূলত আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে দেশটিতে।
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। তার বিরোধী ইহুদিবাদী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। আর আরব নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট পেয়েছে সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন। ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন।
বিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে আপত্তি জানিয়েছেন। ফলে কোনো পক্ষের পক্ষেই এখন পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়নি।
তবে বিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতা আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে আপত্তি জানিয়েছেন। ফলে কোনো পক্ষের পক্ষেই এখন পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এতেই শুরু হয়েছে দেশটির নেতৃত্ব নির্ধারণে অচলবস্থা।
এর মাঝেই ইসরাইলের নির্বাচনে আরব দলগুলো কারচুপির মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দখলদার দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। এ অভিযোগের পক্ষে ভোট কেনাবেচা ও বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপের দুটি ঘটনা সামনে এনেছে তার দল লিকুদ পার্টি।
টাইমস অব ইসরাইল জানিয়েছে, এ ঘটনা দুটির মধ্যে কোনো যোগসূত্রের প্রমাণ এখনো প্রকাশ করেনি ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, ঘটনা দুটি পরস্পর সম্পর্কহীন।
প্রথম ঘটনায় আরব দল রা’আমের কর্মীদের বিরুদ্ধে ভোট কেনার পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে। দ্বিতীয় ঘটনায় কাতারসহ বিদেশি শক্তির অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে আরব ইসরাইলিদের ভোটে প্রভাব বিস্তারের সন্দেহ করা হচ্ছে। নির্বাচনের স্বচ্ছতা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের ভূমিকা নিয়েও এসব ঘটনায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গত মঙ্গলবার নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ ইসরাইলের তিন বেদুইন অধিবাসীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তারা আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল রা’আমের কর্মী। পুলিশের দাবি, ভোট কেনাবেচার ষড়যন্ত্রে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২ ও ওয়াইনেটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফ ইদো নর্ডেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোন করার পর গ্রেফতারের ঘটনা ঘটে। আদালতে পুলিশ স্বীকার করেছে, পরোয়ানা ছাড়াই অভিযুক্তদের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়েছিল। তল্লাশিতে কয়েক হাজার শেকেল নগদ অর্থ পাওয়া যায়। তবে অভিযুক্তদের দাবি, অর্থগুলো দাতব্য কাজের জন্য রাখা হয়েছিল।
গতকাল রোববার বিয়ারশেবার ম্যাজিস্ট্রেট আদালত একজন সন্দেহভাজনকে নিঃশর্ত মুক্তি দেন। অন্য দুজনের আটদিনের রিমান্ড আবেদনও নাকচ করেন আদালত। তাদের একজনকে আটদিনের গৃহবন্দি এবং অন্যজনকে আরও দুইদিনের জন্য আটক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। রা’আম দল অভিযোগ অস্বীকার করে গ্রেফতারের ঘটনাকে সাজানো বলে দাবি করেছে।
নেতানিয়াহু নির্বাচনের দিন এক ভিডিও বার্তায় এই গ্রেফতারকে ‘গুরুতর ও অস্বাভাবিক’ উল্লেখ করে বলেন, তার কাছ থেকে নির্বাচন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
অন্যদিকে, বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে বৃহস্পতিবার শিন বেত প্রধান ডেভিড জিনিকে তদন্তের নির্দেশ দেন ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের প্রধান ও সুপ্রিম কোর্টের উপপ্রধান বিচারপতি নোআম সোলবার্গ।
চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ ঘটনায় কাতারের বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি তুরস্ক ও মুসলিম ব্রাদারহুডও আরব ইসরাইলিদের ভোট দিতে উৎসাহিত করার কাজে জড়িত থাকতে পারে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তদন্তে দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদও যুক্ত হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
তবে তদন্ত শুরুর সময় নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে। সোলবার্গের চিঠি প্রকাশিত হয় বৃহস্পতিবার। অথচ কান নিউজের উদ্ধৃত এক নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, শক্ত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত দুই সপ্তাহ ধরেই তদন্ত চলছিল।
নির্বাচনের আগে শিন বেত প্রধান জিনি অ্যাটর্নি জেনারেলকে বিদেশি শক্তির নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার একটি সাধারণ প্রবণতা সম্পর্কে জানিয়েছিলেন। তবে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে চ্যানেল ১২।
এদিকে, নির্বাচনের পর আরব দলগুলোকে ভোট কারচুপির জন্য দায়ী করে বিবৃতি দেয় নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি। দুটি ঘটনাকে একত্র করে দলটি এর নাম দেয় ‘রা’আমগেট’। দলটির দাবি, এ পরিস্থিতিতে কোনো ইহুদিবাদী দলেরই রা’আম কিংবা জয়েন্ট লিস্টের সঙ্গে সমঝোতা করা উচিত নয়।
তবে ব্যাপক নির্বাচনি কারচুপির অভিযোগ নাকচ করেছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন। সংস্থাটির মহাপরিচালক ডিন লিভনে বলেছেন, এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই এবং ভোটকেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
শিন বেতও জানিয়েছে, বিদেশি হস্তক্ষেপের তদন্ত সীমিত পরিসরে পরিচালিত হচ্ছে। আইনসম্মতভাবে ভোট দেওয়া একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে সন্দেহের চোখে দেখার বিষয় এটি নয়।
রোববার এক ভিডিও বার্তায় নির্বাচন কমিশনের প্রধান সোলবার্গ বলেন, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলেও তা পুরো নির্বাচনি প্রক্রিয়া কিংবা সামগ্রিক ফলাফলের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না। তবে লিকুদ পার্টি এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের ফলের ওপর সন্দেহ থেকেই যাবে।
অন্যদিকে, বিদেশি হস্তক্ষেপের তদন্তকে স্বাগত জানিয়ে অভিযোগে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছে রা’আম। জয়েন্ট লিস্টের নেতারা নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বর্ণবাদী বক্তব্য ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন।
দলটির নেতা ইউসুফ জাবারিন বলেন, তিনি যে একমাত্র বিদেশি হস্তক্ষেপের কথা জানেন, তা হলো নেতানিয়াহুর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন।
নির্বাচনে নেতানিয়াহুর বিরোধী ইহুদিবাদী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট মিলিয়ে পেয়েছে ১৯টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কোনো পক্ষই নিশ্চিত করতে পারেনি। আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনে বিরোধী জোটের অধিকাংশ নেতার আপত্তি থাকায় ইসরাইলে সরকার গঠন নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।


