Logo
Logo
×

Advertisement

দৃষ্টিপাত

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, মার্কিন নির্বাচন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি: একটি গভীর বিশ্লেষণ

Advertisement

একেএম রেজাউল করিম

একেএম রেজাউল করিম

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩১ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, মার্কিন নির্বাচন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি: একটি গভীর বিশ্লেষণ

Advertisement

বিশ্বরাজনীতি বর্তমানে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সংকটময় সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। ফ্রান্স, ইতালি কিংবা ইউরোপের অন্যান্য দেশে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও আন্দোলন কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি মূলত বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থবিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতারই একটি বহিঃপ্রকাশ। ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার কারণে বিশ্ব অর্থনীতি দিন দিন গভীর খাদের দিকে যাচ্ছে। এর প্রভাব কেবল উন্নত বিশ্বেই নয় বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও মারাত্মকভাবে পড়তে শুরু করেছে।

হরমুজ প্রণালি ও মার্কিন-ইরান কূটনৈতিক টানাপোড়েন

বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান ওয়াশিংটনের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে। আল-জাজিরা, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ওয়াশিংটন পোস্টের ব্রেকিং নিউজ অনুযায়ী, ইরান এখন মার্কিন প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

ইরানের এই প্রস্তাবের মূল শর্তগুলো বেশ স্পষ্ট:

* হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা।

* আমেরিকার হাতে জব্দকৃত ইরানের অর্থ ফেরত দেওয়া।

* সব ফ্রন্টে সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ ঘোষণা করা।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নির্বাচনের ঠিক আগে এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি ‘অফ র‍্যাম্প’ বা সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সম্মানজনক পথ হতে পারে। তবে ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক ও তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্দির মতে, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ইরান মূলত তাদের মিত্রদের (বিশেষ করে চীনকে) এটিই বোঝাতে চাইছে যে, তারা ওয়াশিংটনকে সমঝোতার একটি সুযোগ দিয়েছিল। এরপরও যদি যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল যুদ্ধ বন্ধ না করে, তবে তেহরান সর্বাত্মক যুদ্ধে যেতে কিংবা পরমাণু অস্ত্র অর্জনের চূড়ান্ত ঘোষণা দিতে বাধ্য হবে।

এদিকে সিএনএন জানিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখলেও কোনো শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে তাড়াহুড়ো করতে নারাজ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মিড-টার্ম নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে পারে এবং বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা রয়েছে।

মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও মধ্যপ্রাচ্যের আসন্ন বিপদ

মার্কিন সিনেটর ক্রিস মার্ফি সরকারের কাছ থেকে ক্লাসিফায়েড বা গোপন নথি হাতে পাওয়ার পর বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত ভয়ংকর বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান পরিকল্পনা পরিস্থিতিকে আরও দীর্ঘায়িত করবে এবং এক ধ্বংসাত্মক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।

যদি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা কেবল ইরান বা নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের সরকার ও অবকাঠামো চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে। ওই দেশগুলোর তেল, গ্যাসক্ষেত্র এবং পানি শোধনাগারগুলো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রবাসীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব

গালফ সহযোগিতা পরিষদভুক্ত (GCC) দেশগুলোতে ৫০ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হলে এর সরাসরি এবং মারাত্মক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বন্ধ: মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও গ্যাসভিত্তিক অর্থনীতি ধ্বংস হলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হবেন, যার ফলে বন্ধ হয়ে যাবে দেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক আয়ের উৎস—রেমিট্যান্স।

বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি: স্থানীয় বাজারে পোশাকশ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার উচ্চমূল্য ও বেতনের সংকটের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য ফেরত বিশাল জনগোষ্ঠী যুক্ত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার ভেঙে পড়তে পারে।

ইউরোপের আন্দোলনগুলো যেমন গভীর সংকটের ছোট্ট একটি উপসর্গ মাত্র, ঠিক তেমনি মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধাবস্থা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক গভীর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

পরমাণু ইস্যু ও ইসরাইলি রাজনীতির মারপ্যাঁচ

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিভিন্ন গুঞ্জন থাকলেও তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ওয়াশিংটনকে আগে চুক্তি মানতে হবে এবং জব্দকৃত অর্থ ফেরত দিতে হবে। এরপরই কেবল অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ভৌগোলিক সীমার তোয়াক্কা না করে কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

অন্যদিকে, ইসরাইলের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের ফলাফলেও এক রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোট কিংবা বিরোধী আইজেনকোটের জোট—কারো পক্ষেই এককভাবে সরকার গঠনের মতো নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হয়নি। উগ্র ডানপন্থি দলগুলোর অনড় অবস্থানের কারণে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন চরম সংকটে।

সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াইয়ে বিশ্ব অর্থনীতি আজ এক বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। মার্কিন নির্বাচন এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার পালাবদলের এই খেলায় শেষ পর্যন্ত কী ঘটে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় মোকাবিলায় এখন থেকেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

দুই দিনের মধ্যেই খুলে যাবে হরমুজ প্রণালি, মানতে হবে ইরানের শর্ত

দুই দিনের মধ্যেই খুলে যাবে হরমুজ প্রণালি, মানতে হবে ইরানের শর্ত

হামলার দিনক্ষণ ঠিক করতে নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের ফোন

হামলার দিনক্ষণ ঠিক করতে নেতানিয়াহুকে ট্রাম্পের ফোন

নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারে ইরান, তিন মাস ধরে চলছে প্রস্তুতি

নতুন ফ্রন্ট খুলতে পারে ইরান, তিন মাস ধরে চলছে প্রস্তুতি

ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম

ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ জ্বালানি তেলের দাম

ইরান যুদ্ধে কতজন সেনা নিহত হয়েছে, জানাল যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধে কতজন সেনা নিহত হয়েছে, জানাল যুক্তরাষ্ট্র

সৌদিতে হামলায় সহায়তা করছে আমিরাত, চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

সৌদিতে হামলায় সহায়তা করছে আমিরাত, চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, মার্কিন নির্বাচন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি: একটি গভীর বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি, মার্কিন নির্বাচন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি: একটি গভীর বিশ্লেষণ

ফেল করলেই জীবন শেষ নয়, সন্তানদের স্বপ্ন বাঁচাতে সচেতন হোন

ফেল করলেই জীবন শেষ নয়, সন্তানদের স্বপ্ন বাঁচাতে সচেতন হোন

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যুগের অবসান নাকি নতুন যুদ্ধ?

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু যুগের অবসান নাকি নতুন যুদ্ধ?

কারিগরি শিক্ষার ভিত শক্ত করতে কারিগরি শিক্ষা ক্যাডারদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ জরুরি

কারিগরি শিক্ষার ভিত শক্ত করতে কারিগরি শিক্ষা ক্যাডারদের মানসম্মত প্রশিক্ষণ জরুরি

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম