সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানও ঋণঝুঁকিতে, চীনে নতুন উদ্বেগ
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চীনের ক্রেডিট মার্কেটে গত দুই বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় দরপতনের ঘটনা ঘটেছে। দেশটির অন্যতম বৃহৎ স্থানীয় সরকার-মালিকানাধীন শিল্পগোষ্ঠী ঝুহাই হুয়াফা গ্রুপের ঋণসংকট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলারের সুদবাহী ঋণের চাপ সামাল দিতে প্রতিষ্ঠানটি হিমশিম খাচ্ছে। এতে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি সম্পর্কের কারণে আর্থিক সংকট থেকে সুরক্ষা পায়—এমন ধারণাও নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
ব্লুমবার্গের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুয়াংডং প্রদেশের স্থানীয় সরকারের মালিকানাধীন হুয়াফা সম্প্রতি দুটি ট্রাস্ট পণ্যের নির্ধারিত অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে।
পাশাপাশি কয়েকটি ব্যাংকের কাছে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা চীনে তুলনামূলক বিরল। ফলে হুয়াফার আর্থিক সংকট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। গত শুক্রবার থেকে এ উদ্বেগ আরও বাড়তে থাকে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার পর্যন্ত দুই দিনে চীনের করপোরেট বন্ডে বিনিয়োগ ধরে রাখতে বিনিয়োগকারীরা যে গড় সুদের হার দাবি করেন, তা ১০ দশমিক ৩ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর দুই দিনের হিসাবে এটি ছিল সর্বোচ্চ বৃদ্ধি। তবে মঙ্গলবার সকালে হুয়াফার সমমানের স্থানীয় সর্বোচ্চ এএএ রেটিং পাওয়া তিন বছর মেয়াদি ইউয়ান বন্ডের সুদের হারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
চীনের ৩৩০ মিটার উঁচু ঝুহাই টাওয়ারসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নির্মাণে ভূমিকা রয়েছে হুয়াফার। প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সংকট দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর ঋণঝুঁকিকে সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গত সপ্তাহে হুয়াফার বিদেশি মুদ্রায় ইস্যু করা বন্ডের দাম ব্যাপকভাবে কমে যায়। একপর্যায়ে এসব বন্ডের মূল্য অভিহিত মূল্যের প্রায় ৫৪ শতাংশে নেমে আসে। মার্চ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির সুদবাহী ঋণের পরিমাণ ছিল ৪১৩ বিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৬২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ব্যাংকঋণ, ট্রাস্ট ঋণ ও বন্ডসহ বিভিন্ন উৎসের এই বিপুল দায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক ক্রেডিটসাইটসের এশিয়া ক্রেডিট কৌশল বিভাগের প্রধান জারলিনা জেং বলেন, স্থানীয় সরকারগুলোর অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল—এমন কিছু রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি কার্যত বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা টাইম বোমার মতো।
হুয়াফার সংকটের প্রভাব শুধু চীনের অভ্যন্তরীণ ঋণবাজারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। গত সপ্তাহে চীনের উচ্চ সুদের হারের ডলার বন্ডগুলো প্রায় এক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ সময় পার করেছে। একই সময়ে দেশটির সরকারি ঋণবাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়। শুক্রবার ৩০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের ফিউচার লেনদেনে মার্চের পর এক দিনে সবচেয়ে বড় দরপতন হয়। বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, হুয়াফার সংকট বিভিন্ন বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন সরকার সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করতে সহায়ক মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারগুলোর ঋণঝুঁকি কমাতে নিয়েছে নজিরবিহীন পদক্ষেপ। এসব উদ্যোগের ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণসংকট এড়ানো সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল। কিন্তু হুয়াফার বর্তমান পরিস্থিতি সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বিশেষ করে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় গুয়াংডং প্রদেশে হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। চীনের প্রদেশগুলোর মধ্যে গুয়াংডংয়ের অর্থনীতি সবচেয়ে বড়। ফলে এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক সংকট বৃহত্তর অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিনিয়োগকারীরা।
তবে সংকটের মধ্যে কিছুটা স্বস্তির খবরও এসেছে। হুয়াফা একটি বকেয়া ট্রাস্ট পণ্যের অর্থের অংশবিশেষ বিনিয়োগকারীদের পরিশোধ করেছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির আবাসন ব্যবসার একটি সহযোগী কোম্পানি সোমবার নির্ধারিত ইউয়ান বন্ডের অর্থ পরিশোধ করেছে। এর ফলে ২০২৭ সালে মেয়াদপূর্তির অপেক্ষায় থাকা হুয়াফার অফশোর ইউয়ান বন্ডের দাম অভিহিত মূল্যের প্রায় ৬৩ শতাংশে ফিরে এসেছে।
এদিকে ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা দুর্বল হওয়া এবং নিকটবর্তী সময়ে বিপুল ঋণের মেয়াদপূর্তির ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে ফিচ রেটিংস প্রতিষ্ঠানটিকে নেতিবাচক রেটিং পর্যবেক্ষণে রেখেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির রেটিং বিবিবি, যা বিনিয়োগযোগ্য রেটিংয়ের নিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি।
হুয়াফার মোট সম্পদের পরিমাণ গত মার্চ পর্যন্ত ছিল প্রায় ৭৬৫ বিলিয়ন ইউয়ান। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৯৩ দশমিক ৫ শতাংশ মালিকানা ঝুহাইয়ের রাষ্ট্রীয় সম্পদ তদারকি কর্তৃপক্ষের হাতে। বাকি অংশের মালিক গুয়াংডং প্রদেশের অর্থ বিভাগ।
প্রতিষ্ঠানটির আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে আবাসন উন্নয়ন ও নগর পরিচালনা কার্যক্রম থেকে। তবে দীর্ঘদিনের আবাসন খাতের মন্দার কারণে মুনাফায় বড় ধরনের ওঠানামা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে হুয়াফার আবাসন ব্যবসার একটি প্রতিষ্ঠান ৬ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ইউয়ান নিট লোকসানের কথা জানিয়েছে।
সব মিলিয়ে হুয়াফার ঋণসংকট চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সক্ষমতা এবং সরকারের সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রতিষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত ঋণ পরিশোধে কতটা সক্ষম হয়, তার ওপর চীনের করপোরেট বন্ডবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে।
