চীনা বিনিয়োগে যেভাবে শক্তিশালী হচ্ছে তালেবান
Advertisement
যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১৬ পিএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
আফগানিস্তানে খনিজ সম্পদ উত্তোলন, অবকাঠামো নির্মাণ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে চীন। এতে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে তালেবান সরকার।
তবে এসব প্রকল্প ঘিরে স্থানীয় মানুষের জমি, পানির অধিকার ও জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। খনিজ সম্পদ থেকে অর্জিত আয়ের সুফলও পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট-এ সাংবাদিক নাতিক মালিকজাদার এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে চীনের বিনিয়োগ শুধু অর্থনৈতিক স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পশ্চিমা দেশগুলো আফগানিস্তানে কূটনৈতিক উপস্থিতি কমিয়ে আনলেও চীন কাবুলে দূতাবাস চালু রাখে। নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশটির খনিজ সম্পদ ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয় বেইজিং। বর্তমানে চীন আফগানিস্তানের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
খনিজ সম্পদে চীনের আগ্রহ
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তালেবান সরকার চীনের জিনজিয়াং সেন্ট্রাল এশিয়া পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড গ্যাস কোম্পানির সঙ্গে আমু দরিয়া অববাহিকায় তেল উত্তোলনের জন্য ২৫ বছর মেয়াদি চুক্তি করে। এতে ৫৪ কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেয় কোম্পানিটি।
এ ছাড়া লোগার প্রদেশের মেস আয়নাক তামার খনিতেও চীনা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০০৮ সালে আগের আফগান সরকারের কাছ থেকে ৩০ বছরের জন্য খনিটির ইজারা পেয়েছিল একটি চীনা কনসোর্টিয়াম। নিরাপত্তা ও পরিবেশগত সমস্যায় দীর্ঘদিন প্রকল্পটির কাজ আটকে থাকলেও ২০২৪ সালে তালেবান সরকার এটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়।
চীনের বিনিয়োগ শুধু খনিতে সীমাবদ্ধ নয়। কাবুলে চীনা পরিচালিত হোটেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও বাড়ছে। চীনা বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে চীনা ভাষাজানা আফগানদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালে আফগান পণ্যের জন্য চীনের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের সুযোগও তৈরি হয়।
খনি প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয়রা
খনিজ সম্পদ উত্তোলন ঘিরে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কোম্পানিগুলোর বিরোধ বাড়ছে। ২০২৩ সালের আগস্টে তাখার প্রদেশের চাহ আব জেলায় সামতি সোনার খনির ইজারা দেওয়া হয় একটি চীন-আফগানিস্তান কোম্পানিকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, খনির কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পানির উৎসে প্রবেশাধিকার কমছে এবং প্রকল্পের আর্থিক সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে খনির কার্যক্রম ঘিরে সংঘর্ষে তিনজন স্থানীয় বাসিন্দা ও একটি কোম্পানির একজন কর্মী নিহত হন। আহত হন আরও পাঁচজন। তালেবান কর্তৃপক্ষ খনির কার্যক্রম স্থগিত করে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতেও সম্পত্তির ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করেছিলেন।
বদাখশান প্রদেশেও চীনা অংশীদারিতে সোনা উত্তোলন নিয়ে জমি ও পানির অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়রা রাস্তা, পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন দাবি করলেও তাদের প্রতিবাদ তালেবান কর্তৃপক্ষ দমন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তালেবানের সঙ্গে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক
চীন এখনো তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। তবে দুই পক্ষের কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। ২০২৩ সালে চীন প্রথম দেশ হিসেবে তালেবান সরকারের কাছে নতুন রাষ্ট্রদূত পাঠায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং তালেবান সরকারের রাষ্ট্রদূতের পরিচয়পত্র গ্রহণ করেন।
২০২৬ সালের এপ্রিলে চীনের উরুমকিতে তালেবান ও পাকিস্তানের মধ্যে শান্তি আলোচনার আয়োজন করে বেইজিং। এতে আঞ্চলিক কূটনীতিতে চীনের ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়।
তবে নারী অধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনে তালেবানের ব্যর্থতা নিয়ে চীনের চাপ সীমিত। মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা তালেবানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ কমিয়ে দিতে পারে।
জিনজিয়াং ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ
আফগানিস্তানে চীনের আগ্রহের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তাগত স্বার্থও রয়েছে। বিশেষ করে জিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ঠেকাতে তালেবানের সহযোগিতা চায় বেইজিং। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্টের (ইটিআইএম) সদস্যদের আফগানিস্তানে অবস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ফিরে আসার সম্ভাবনাও চীনের উদ্বেগের কারণ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে চীন, রাশিয়া, ইরান ও পাকিস্তান আফগানিস্তান এবং এর আশপাশে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে।
অন্যদিকে, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর আফগানিস্তান পর্যন্ত সম্প্রসারণের বিষয়ে ২০২৫ সালের মে মাসে তিন দেশ সম্মত হয়। ২০২৬ সালের অক্টোবরে তালেবান সরকার চীনের সীমান্তের দিকে ওয়াখান করিডরে ১২১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক উদ্বোধন করে। তবে সেখানে এখনো বাণিজ্যিকভাবে সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা চালু হয়নি।
প্রতিবেদনে নাতিক মালিকজাদা বিশ্লেষণ করেছেন, চীনের বিনিয়োগ ও কূটনৈতিক সহায়তা তালেবান সরকারের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি আফগানিস্তানে বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়াচ্ছে। এতে খনিজ সম্পদ উত্তোলন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হলেও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও অধিকার উপেক্ষিত থাকছে।
ফলে আফগানিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে সরকার ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা লাভবান হলেও যেসব এলাকার সম্পদ উত্তোলন করা হচ্ছে, সেখানকার সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সুফল পাচ্ছেন না।
