Logo
Logo
×

Advertisement

আন্তর্জাতিক

স্বর্ণে মোড়ানো ১২৬ কক্ষের রাজপ্রাসাদ, প্রবেশমূল্য লাখ ডলার—ট্রাম্পের বিলাসী জগতের অন্দরমহল

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৫৮ পিএম

স্বর্ণে মোড়ানো ১২৬ কক্ষের রাজপ্রাসাদ, প্রবেশমূল্য লাখ ডলার—ট্রাম্পের বিলাসী জগতের অন্দরমহল

সমুদ্রসৈকতের পাশে অবস্থিত মার-আ-লাগো প্রাসাদ। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ফ্লোরিডার অভিজাত এলাকায় সমুদ্রের তীরে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল প্রাসাদ। সোনায় মোড়ানো দেয়াল, শতাব্দীপ্রাচীন টাইলস, নান্দনিক কারুকাজ আর বিলাসবহুল আয়োজন—সব মিলিয়ে যেন রূপকথার রাজপ্রাসাদ। ধনকুবের ও অভিজাতদের অবকাশযাপনের এই ঠিকানার নাম মার-আ-লাগো। তবে এটি কেবল বিলাসিতার কেন্দ্র নয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট  ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের আবাসস্থলও। প্রাসাদটিকে ঘিরে রয়েছে শত বছরের ইতিহাস, বিপুল অর্থের লেনদেন এবং এক বিশেষ অভিজাত জীবনযাত্রার গল্প।

রাজকীয় প্রাসাদের পেছনের ইতিহাস

ফ্লোরিডার সবচেয়ে ধনী এলাকাগুলোর একটিতে সমুদ্রসৈকতের পাশে অবস্থিত মার-আ-লাগো। ধনীদের অবকাশযাপনের জন্য পরিচিত এই জায়গাটি একসময় ছিল বিশিষ্ট সমাজসেবী ও ধনকুবের মার্জরি মেরিওয়েদার পোস্টের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তিনি ছিলেন খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সি ডব্লিউ পোস্টের প্রতিষ্ঠাতা সি ডব্লিউ পোস্টের মেয়ে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের সংবাদ সম্মেলন কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার বহু আগেই এই প্রাসাদের মালিক ছিলেন পোস্ট। পরবর্তী সময়ে ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারে মার-আ-লাগোকে নিজের সম্পদ ও অর্জনের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেন। এমনকি প্রাসাদটিকে তিনি তার 'সমতার প্রতি অঙ্গীকারের' উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করেছিলেন।

জলাভূমি থেকে বিলাসবহুল প্রাসাদ

১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে একটি উপযুক্ত বাড়ির সন্ধানে নামেন মার্জরি মেরিওয়েদার পোস্ট। মার-আ-লাগো ক্লাবের নিজস্ব ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, পাম বিচে নিজের জন্য আদর্শ একটি সম্পত্তি খুঁজে পেতে তাকে বেশ কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল।

ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, পাম বিচের সমাজজীবনে তিনি যখন অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠছিলেন, তখনই নতুন একটি বাড়ি তৈরির পরিকল্পনা করেন। সে সময় এলাকাটির বড় অংশজুড়ে ছিল ঝোপঝাড়, জলাভূমি ও জঙ্গলসদৃশ পরিবেশ। বাড়ি তৈরির উপযোগী জমি খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না।

নিজের রিয়েল এস্টেট এজেন্টকে সঙ্গে নিয়ে পোস্ট নিজেই ঘন ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে হেঁটে উপযুক্ত জমির সন্ধান করতেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর যে জায়গাটি তার পছন্দ হয়, সেখানেই গড়ে ওঠে আজকের বিখ্যাত মার-আ-লাগো প্রাসাদ।


স্প্যানিশ ভাষায় 'মার-আ-লাগো' শব্দের অর্থ 'সমুদ্র থেকে হ্রদ'। নামের সঙ্গে মিল রেখেই সমুদ্র ও হ্রদের মাঝামাঝি অবস্থানে তৈরি করা হয় এই ঐতিহাসিক স্থাপনা।

১৯২৭ সালে প্রায় ৮০ লাখ ডলার ব্যয়ে নিজের পছন্দমতো প্রাসাদটি নির্মাণ করেন পোস্ট। সে সময়ের হিসাবে এটি ছিল বিপুল অর্থের বিনিয়োগ। টাইম সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রায় ১৭ একর জমির ওপর নির্মিত প্রাসাদটিতে ছিল ১১৫টি কক্ষ।

ঐতিহাসিক স্থাপনার মর্যাদা

মার-আ-লাগোর গুরুত্ব শুধু এর আকার কিংবা বিলাসিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসেও রয়েছে এর বিশেষ স্থান।

১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রাসাদটিকে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পরে ১৯৭৩ সালে মার্কিন কংগ্রেস এটিকে ন্যাশনাল রেজিস্টার অব হিস্টোরিক প্লেসেসে অন্তর্ভুক্ত করে।

একই বছর ৮৬ বছর বয়সে মারা যান মার্জরি মেরিওয়েদার পোস্ট। মৃত্যুর আগে তিনি প্রাসাদটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নামে উইল করে যান। তার ইচ্ছা ছিল, এটি যেন শীতকালীন হোয়াইট হাউস হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও বিদেশি অতিথিদের অবকাশযাপনের জায়গা হিসেবেও এটি ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল।

তবে পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৮০ সালে টাইম সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাসাদটির বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণে প্রায় ১০ লাখ ডলার ব্যয় হতে পারে। বিপুল এই খরচের কথা বিবেচনা করে সরকারি কর্মকর্তারা সম্পত্তিটি পরিচালনার বিষয়ে আগ্রহ হারান।

সোনায় মোড়ানো অন্দরসজ্জা, চোখধাঁধানো কারুকাজ

মার-আ-লাগোর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি এর অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা। প্রতিটি কক্ষেই রয়েছে আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের ছাপ।

পাম বিচ পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, প্রাসাদের বসার ঘরে রয়েছে সোনার পাতের কারুকাজ। খাবার ঘরের দেয়ালজুড়ে রয়েছে হাতে আঁকা ফ্রেস্কো বা দেয়ালচিত্র। আর প্রবেশপথ সাজানো হয়েছে ১৫ শতকের প্রাচীন টাইলস দিয়ে।

ট্রাম্পের বিলাসবহুল ও জাঁকজমকপূর্ণ সাজসজ্জার প্রতি আগ্রহের কথা অনেকেরই জানা। তাই প্রাসাদের এই অন্দরসজ্জা তার রুচির সঙ্গে বেশ মানানসই মনে হতে পারে। তবে মজার বিষয় হলো, এসব নকশা ও সাজসজ্জার অধিকাংশই ট্রাম্পের তৈরি নয়; এগুলো আগের মালিক মার্জরি মেরিওয়েদার পোস্টের সময়েই স্থাপন করা হয়েছিল।


১৯৮৫ সালের শেষ দিকে প্রাসাদটি কেনেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সে সময় অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সম্পত্তিটি কিনতে তিনি ১ কোটি থেকে দেড় কোটি ডলার পর্যন্ত ব্যয় করেছিলেন।

মার-আ-লাগো ক্লাবের ওয়েবসাইটে সম্পত্তিটিকে ফ্লোরিডার সবচেয়ে মূল্যবান জমির অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ট্রাম্পের মালিকানায় আসার পর প্রাসাদটিতে আরও ১১টি কক্ষ যুক্ত করা হয়। ফলে কক্ষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৬-এ।

১২৬ কক্ষের প্রাসাদ থেকে অভিজাত ক্লাব

এত বিশাল প্রাসাদ ব্যক্তিগত বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করাকে একসময় বেশ বড় দায়িত্ব বলে মনে করেন ট্রাম্প। ক্লাবের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তার একটি ছবির পাশে স্বাক্ষরসহ একটি বার্তায় বলা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে তিনি প্রাসাদটিকে ক্লাবে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, ১২৬টি কক্ষ নিয়ে বাড়িটি তার কাছে অত্যন্ত বড় মনে হচ্ছিল।

তবে ক্লাব চালু করলেও প্রাসাদের সব অংশ সাধারণ সদস্যদের জন্য ছেড়ে দেননি ট্রাম্প। নিজের ব্যবহারের জন্য কিছু ব্যক্তিগত কক্ষ রেখে দেন। একই সঙ্গে ক্লাবের সদস্যদের জন্য সর্বোচ্চ মানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করেন।

এভাবেই ব্যক্তিগত প্রাসাদটি ধীরে ধীরে রূপ নেয় যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম আলোচিত অভিজাত ক্লাবে।

সবার জন্য উন্মুক্ত, তবে প্রবেশের মূল্য লাখ ডলার!

পাম বিচের সমুদ্রতীরবর্তী একটি সদস্যনির্ভর অভিজাত ক্লাব যে সবার জন্য সহজে প্রবেশযোগ্য হবে, তা ভাবা কঠিন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি ছিল ভিন্ন।

'গুড মর্নিং আমেরিকা' অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি মার-আ-লাগো ক্লাবকে সমতার প্রতি নিজের অবদানের অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ক্লাবটি 'সবার জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত'।

তবে বাস্তবতা হলো, সেখানে প্রবেশের জন্য গুনতে হয় বিপুল অর্থ।

ক্লাবটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট বার্ন্ড লেম্বকে এবিসি নিউজকে জানান, সে সময় ক্লাবের সদস্য হতে এক লাখ ডলার ফেরত-অযোগ্য ভর্তি ফি দিতে হতো। এর বাইরে প্রতিবছর সদস্যদের ১৪ হাজার ডলার বার্ষিক চাঁদা দিতে হতো। পাশাপাশি খাবারের জন্য বছরে অতিরিক্ত দুই হাজার ডলার খরচ করাও বাধ্যতামূলক ছিল।

অর্থাৎ শুধু সদস্যপদ ধরে রাখতেই বছরে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হতো।

তবে অর্থ থাকলেই যে কেউ সরাসরি সদস্য হতে পারবেন, বিষয়টি এমন নয়। আগ্রহী ব্যক্তিদের প্রথমে ক্লাবের নির্বাহী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিতে হয়। এরপর আবেদন অনুমোদিত হলে তাতে স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয় বলে জানান লেম্বকে।

মাত্র ৫০০ সদস্যের অভিজাত জগৎ

মার-আ-লাগো ক্লাবে ঠিক কতজন সদস্য রয়েছেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করতে চাননি ক্লাবটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তার ব্যাখ্যা, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি এবং পুরোনো সদস্যদের পদত্যাগের কারণে সংখ্যাটি নিয়মিত পরিবর্তিত হয়। বিশেষ করে বয়সজনিত সমস্যা কিংবা শারীরিক অসুস্থতার কারণে অনেকে সদস্যপদ ছেড়ে দেন।

তবে তিনি জানান, ক্লাবটি সর্বোচ্চ ৫০০ সদস্যের সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল।

ক্লাবের সদস্যদের সামাজিক ও জাতিগত পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন করা হয়েছিল তাকে। জবাবে লেম্বকে জানান, সদস্য হওয়ার আবেদনপত্রে কারও জাতিগত কিংবা ধর্মীয় পরিচয় জানতে চাওয়া হয় না।

সব মিলিয়ে মার-আ-লাগো কেবল একটি বিলাসবহুল প্রাসাদ নয়। এর প্রতিটি দেয়াল, কক্ষ ও স্থাপত্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত বছরের ইতিহাস। একসময় যে প্রাসাদ তৈরি হয়েছিল এক ধনকুবের সমাজসেবীর ব্যক্তিগত আবাস হিসেবে, সময়ের পরিক্রমায় সেটিই হয়ে উঠেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিলাসবহুল জীবন, সামাজিক যোগাযোগ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম পরিচিত কেন্দ্র।

তথ্যসূত্র: এবিসি নিউজ 

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ইরানকে সহায়তার অভিযোগে কানাডার ৮ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ইরানকে সহায়তার অভিযোগে কানাডার ৮ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির তথ্য দিলে ২ কোটি ডলার পুরস্কার দেবে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির তথ্য দিলে ২ কোটি ডলার পুরস্কার দেবে যুক্তরাষ্ট্র

ইরান ‘দখলের’  ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প

ইরান ‘দখলের’ ইঙ্গিত দিলেন ট্রাম্প

এল-সায়েদ: দ্য লিডার

এল-সায়েদ: দ্য লিডার

কেশম দ্বীপে মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের

কেশম দ্বীপে মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোন ভূপাতিতের দাবি ইরানের

মন্ত্রিসভায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত ট্রাম্পের

মন্ত্রিসভায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত ট্রাম্পের

আরও পড়ুন

স্বর্ণে মোড়ানো ১২৬ কক্ষের রাজপ্রাসাদ, প্রবেশমূল্য লাখ ডলার—ট্রাম্পের বিলাসী জগতের অন্দরমহল

স্বর্ণে মোড়ানো ১২৬ কক্ষের রাজপ্রাসাদ, প্রবেশমূল্য লাখ ডলার—ট্রাম্পের বিলাসী জগতের অন্দরমহল

সান্তিয়াগো পেনা গ্রেফতার, প্যারাগুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট আলিয়ানা

সান্তিয়াগো পেনা গ্রেফতার, প্যারাগুয়ের নতুন প্রেসিডেন্ট আলিয়ানা

সারাদিন ইনস্টাগ্রামে রিলস দেখলেই মিলবে বেতন, অদ্ভুত চাকরির বিজ্ঞাপনে নেটদুনিয়ায় ঝড়

সারাদিন ইনস্টাগ্রামে রিলস দেখলেই মিলবে বেতন, অদ্ভুত চাকরির বিজ্ঞাপনে নেটদুনিয়ায় ঝড়

ইরানকে সহায়তার অভিযোগে কানাডার ৮ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

ইরানকে সহায়তার অভিযোগে কানাডার ৮ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম