কৃষিজমির আগুন, আতশবাজি— দূষণে নাজেহাল দিল্লি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৬ এএম
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দীপাবলির আগের দিন গত ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত বাতাসের রেকর্ড গড়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। শনিবার শহরটির বায়ুমান সূচক (একিউআই) বেড়ে ৩৬৯-এ পৌঁছায়, যা ‘খুব খারাপ’ পর্যায়ের। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, বাতাসের গতি কম থাকায় দূষণ সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারবে না। ফলে সোমবার ভোরে দিল্লির বায়ুমান ‘ভয়াবহ’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
শনিবার সন্ধ্যায় আতশবাজি পোড়ানোর নির্ধারিত সময় শুরু হওয়ার পর দূষণের মাত্রা আরও দ্রুত বাড়তে থাকে। একই সময়ে পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ঘটনাও মৌসুমের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দুই রাজ্যের আগুনের ধোঁয়া এবং আতশবাজির দূষণ মিলিয়ে দীপাবলির রাতের আগে দিল্লির বাতাস আরও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে।
হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার বিকেল ৪টায় দিল্লির একিউআই ছিল ৩৬৯। ২০১৬ সালের পর দীপাবলির আগের দিন এটিই সর্বোচ্চ। ওই বছর একিউআই ছিল ৪০৪। চলতি মাসের ১ নভেম্বর শহরটির একিউআই ছিল ২৬১। অর্থাৎ এক সপ্তাহের ব্যবধানে দূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
শনিবার সকাল ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে দিল্লির ৫৯টি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে অতিক্ষুদ্র বস্তুকণা পিএম ২.৫-এর গড় ঘনত্ব ছিল ২৯৫ মাইক্রোগ্রাম। এর মধ্যে ৩৬টি কেন্দ্রে এই মাত্রা ২৫০ ছাড়িয়ে যায়। ভারতের কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের (সিপিসিবি) হিসাবে, পিএম ২.৫-এর মাত্রা ২৫০ ছাড়ালে তা ‘ভয়াবহ’ পর্যায়ের দূষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
সন্ধ্যা ৮টায় আতশবাজি পোড়ানোর অনুমোদিত সময় শুরু হওয়ার পর দূষণ দ্রুত বাড়ে। সন্ধ্যা ৭টা ৪৫ মিনিটে পিএম ২.৫-এর মাত্রা ছিল প্রতি ঘনমিটারে ১৭৭ মাইক্রোগ্রাম। রাত ৮টায় তা বেড়ে ২০৮ হয়। এরপর প্রতি ১৫ মিনিটে দূষণের মাত্রা বাড়তে থাকে। রাত ১০টায় ৫৫টি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গড় মাত্রা দাঁড়ায় ২৮৯ মাইক্রোগ্রামে।
আবাসিক এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। পাঞ্জাবি বাগ এলাকায় মাত্র এক ঘণ্টায় পিএম ২.৫-এর ঘনত্ব প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৫৯৩ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছায়। আর কে পুরম এলাকায় রাত ৯টায় এই মাত্রা ছিল ৬২১। মুন্ডকা এলাকায় তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭১৮ মাইক্রোগ্রামে।
আতশবাজি ও কৃষিজমির আগুনে বাড়ছে দূষণ
দিল্লিতে দীপাবলি উপলক্ষে আতশবাজি পোড়ানোর ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষ অনুমতি দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। ২ নভেম্বর প্রকাশিত আদালতের নির্দেশনায় শনিবার ও রোববার সকালে এক ঘণ্টা এবং সন্ধ্যায় দুই ঘণ্টা অনুমোদিত সবুজ আতশবাজি পোড়ানোর সুযোগ রাখা হয়েছে।
তবে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে। দিল্লি পুলিশ ২৫০টির বেশি বিশেষ দল গঠন করেছে। প্রতিটি থানায় অন্তত একটি দল কাজ করছে। কিন্তু কোন আতশবাজি সবুজ, আর কোনটি প্রচলিত— তা তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা কঠিন বলে জানিয়েছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা।
এরই মধ্যে আদালতের নির্দেশ অমান্য করে বিভিন্ন বাজারে প্রচলিত আতশবাজি বিক্রির খবর পাওয়া গেছে। চাঁদনি চক ও সদর বাজারসহ কয়েকটি এলাকায় অনুরোধ করলে এসব আতশবাজি পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আতশবাজির বাক্সে কিউআর কোড থাকার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও তা পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানায় ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর ঘটনাও দূষণ বাড়াচ্ছে। ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর ইনস্যাট-৩ডিএস স্যাটেলাইট শনিবার দুই রাজ্যে ৪১৫টি আগুনের অবস্থান শনাক্ত করেছে। ১ নভেম্বরের তুলনায় এই সংখ্যা সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি। শনাক্ত হওয়া আগুনের ৬৪৭টি বিকেল ৪টা থেকে ৬টার মধ্যে দেখা গেছে।
সোমবার ভয়াবহ পর্যায়ে যেতে পারে বায়ুদূষণ
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, রোববার দিল্লিতে বাতাসের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৩ কিলোমিটার থাকতে পারে। বাতাসের গতি কম থাকলে দূষিত কণা সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। ফলে সেগুলো ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি জমে থাকে। রাতে উষ্ণ বাতাসের একটি স্তর দূষণকে মাটির কাছাকাছি আটকে রাখে, যা সকালে সূর্যের তাপে ভেঙে যাওয়ার আগপর্যন্ত পরিস্থিতি আরও খারাপ করে।
ভারতের ট্রপিক্যাল মেটিওরোলজি ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, রোববার রাত থেকে দূষণ বাড়তে পারে। সোমবার ভোর ৪টার দিকে দিল্লির একিউআই ৪০৬-এ পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। একিউআই ৪০০ ছাড়ালে তা ‘ভয়াবহ’ পর্যায়ে পড়ে।
পরিবেশবিষয়ক গবেষণা সংস্থা এনভায়রোক্যাটালিস্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান বিশ্লেষক সুনীল দাহিয়া বলেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দিল্লির পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তাঁর মতে, আতশবাজি কমানো, শহরে ট্রাক চলাচল সীমিত করা এবং বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা গেলে দূষণ নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সহায়তা মিলতে পারে।
গত বছর দীপাবলির রাতে ভোর ২টার দিকে দিল্লির ২৭টি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পিএম ২.৫-এর গড় মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে ১ হাজার ১৩৭ মাইক্রোগ্রামে পৌঁছেছিল। রাত ১০টায় এই মাত্রা ছিল ৫৩৫। ভারতের ২৪ ঘণ্টার জন্য নির্ধারিত পিএম ২.৫-এর সীমা প্রতি ঘনমিটারে ৬০ মাইক্রোগ্রাম।
এ বছর আবহাওয়া ও আগে থেকেই বেশি দূষণের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ২০১৫ সালের পর গত ১১ বছরের মধ্যে চারবার দীপাবলির পরদিন দিল্লির একিউআই ৪০০ ছাড়িয়েছে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

