Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

বায়তুল মালের টাকা কোথায় কোথায় ব্যয় করা যায়?

Advertisement

মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ

মুহাম্মদ ছাইফুল্লাহ

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০৪ পিএম

বায়তুল মালের টাকা কোথায় কোথায় ব্যয় করা যায়?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যেখানে ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতির সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হলো— ‘বায়তুল মাল’। এটি কেবল একটি কোষাগার নয় বরং ন্যায়বিচার, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক অর্থনীতির বাস্তব রূপ। ইসলামের পরিভাষায় বায়তুল মাল কী, এর উৎস, খাত ও কার্যাবলি— এই বিষয়গুলো নিয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি আলোচনা উপস্থাপন করা হলো—

বায়তুল মাল (بيت المال) কী?

বায়তুল মাল (بيت المال) ইসলামি সরকারের সরকারি ধন-সম্পদ, খাজনা বা ট্রেজারি, যা মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত ইসলামি সরকারের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি ও সামাজিক সেবার জন্য সংরক্ষিত তহবিল। ইসলামি সমাজে দরিদ্র, অনাথ, অসহায় ও সেবামূলক কার্যক্রম চালানোর একটি প্রধান মাধ্যম।

বায়তুল মাল শব্দটি আরবি— বায়ত (بيت) অর্থ ঘর বা কেন্দ্র; আর মাল (مال) অর্থ সম্পদ।

ইসলামের পরিভাষায়— ইসলামি রাষ্ট্রের সকল বৈধ আয় সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও জনকল্যাণে ব্যয়ের কেন্দ্রীয় কোষাগারকে বায়তুল মাল বলা হয়। এটি কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন ভাণ্ডার নয় বরং সমগ্র উম্মাহর আমানত।

বায়তুল মালের শরিয়া ভিত্তি

যদিও কুরআনে ‘বায়তুল মাল’ শব্দটি সরাসরি নেই, তবে এর ধারণা ও কার্যক্রম কুরআন–সুন্নাহ দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তাআলা বলেন—

كَيْ لَا يَكُونَ دُولَةً بَيْنَ الْأَغْنِيَاءِ مِنْكُمْ

‘যাতে সম্পদ শুধু তোমাদের ধনীদের মাঝেই আবর্তিত না হয়।’ (সুরা আল-হাশর: আয়াত ৭)

এই আয়াত ইসলামি অর্থনীতির মূলনীতি নির্ধারণ করে, যার বাস্তব প্রয়োগ হলো বায়তুল মাল।

রাসুলুল্লাহ (সা.) রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন এবং একে গুলুল (খেয়ানত) বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন—

مَنِ اسْتَعْمَلْنَاهُ عَلَى عَمَلٍ فَرَزَقْنَاهُ رِزْقًا فَمَا أَخَذَ بَعْدَ ذَلِكَ فَهُوَ غُلُولٌ

‘যাকে আমরা কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত করি, সে যদি এর বাইরে কিছু গ্রহণ করে, তবে তা হবে খেয়ানত।’ (আবু দাউদ ২৯৩৩)

ইসলামি অর্থনীতিতে বায়তুল মালের প্রধান উৎস

ইসলামি রাষ্ট্রে বায়তুল মাল গঠিত হয় একাধিক বৈধ উৎস থেকে—

১. জাকাত (الزكاة)

ফরজ ইবাদত ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রধান উৎস

নির্দিষ্ট ৮টি খাতে ব্যয় হয়

২. খুমস (الخُمس)

যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ

রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কল্যাণে ব্যয়

৩. জিযিয়া (الجزية)

অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা কর

৪. খারাজ (الخراج)

কৃষিজ ভূমির ওপর আরোপিত কর

৫. ফাই (الفي)

যুদ্ধ ছাড়াই প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সম্পদ

৬. উশর (العُشْر)

কৃষিপণ্যের ওপর নির্ধারিত অংশ

৭. হাদিয়া

দান ও উপহার
৮. রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জরিমানা

খনিজ, বন, খাল-বিল, অনাথ সম্পদ ইত্যাদি

১. জাকাত (الزكاة) কী?

জাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। শরিয়তের পরিভাষায়— নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে নির্ধারিত অংশ নির্ধারিত খাতে প্রদান করাকে যাকাত বলা হয়। এটি ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম এবং ফরজ ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ

‘তোমরা নামাজ কায়েম করো এবং জাকাত আদায় করো।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ৪৩)

যাকাত কাদের ওপর ফরজ?

> মুসলিম হতে হবে

> নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে

> এক হিজরি বছর সম্পদের ওপর অতিক্রান্ত হতে হবে (কিছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম)

যাকাতের অর্থ ব্যয়ের খাত: নির্ধারিত আট শ্রেণির জন্য জাকাতের অর্থ ব্যয়ের নির্দেশনা এসেছে কুরআনে—

اِنَّمَا الصَّدَقٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَ الۡمَسٰكِیۡنِ وَ الۡعٰمِلِیۡنَ عَلَیۡهَا وَ الۡمُؤَلَّفَۃِ قُلُوۡبُهُمۡ وَ فِی الرِّقَابِ وَ الۡغٰرِمِیۡنَ وَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰهِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ؕ فَرِیۡضَۃً مِّنَ اللّٰهِ ؕ وَ اللّٰهُ عَلِیۡمٌ حَكِیۡمٌ

‘সাদাকাহ হচ্ছে শুধুমাত্র গরিবদের ও অভাবগ্রস্তদের, আর এই সাদাকাহর (আদায়ের) জন্য নিযুক্ত কর্মচারীদের এবং (দ্বীনের ব্যাপারে) যাদের মন রক্ষা করতে (অভিপ্রায়) হয় (তাদের), আর গোলামদের আজাদ করার কাজে এবং কর্জদারদের কর্জে (কর্জ পরিশোধে), আর জিহাদে (অর্থাৎ যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য) আর মুসাফিরদের সাহায্যার্থে। এই হুকুম আল্লাহর পক্ষ হতে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, অতি প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ৬০)

জাকাত না দেওয়ার পরিণাম

জাকাত অস্বীকার করা কুফরসমতুল্য এবং অলসতাবশত না দেওয়া মারাত্মক গুনাহ। কেয়ামতের দিন এর কঠিন শাস্তির কথা হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।

২. খুমস (الخُمس) কী?

খুমস অর্থ পাঁচ ভাগের এক ভাগ (২০%)। ইসলামি শরিয়তে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ (গনিমত) থেকে নির্ধারিত এক-পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রদান করাকে খুমস বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَاعْلَمُوا أَنَّمَا غَنِمْتُمْ مِنْ شَيْءٍ فَأَنَّ لِلَّهِ خُمُسَهُ وَلِلرَّسُولِ وَلِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَابْنِ السَّبِيلِ

‘তোমরা জেনে রাখো! যুদ্ধে যা কিছু তোমরা লাভ করো, তার এক-পঞ্চমাংশ আল্লাহর, রাসুলের, আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরের জন্য।’ (সুরা আল-আনফাল: আয়াত ৪১)

খুমসের অর্থ ব্যয় করা হয়—

> ইসলামি রাষ্ট্র ও দাওয়াহ কার্যক্রমে

> এতিম, মিসকিন ও অসহায়দের সহায়তায়

> রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর নিকটাত্মীয় (বনু হাশিম)

> সমাজের কল্যাণমূলক কাজে

আহলুস সুন্নাহ মতে, খুমস কেবল গনিমতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। কিছু মাজহাবে খনিজ সম্পদের ক্ষেত্রেও খুমসের বিধান আলোচনা করা হয়েছে। সাধারণ সম্পদ বা ব্যবসায়িক লাভে খুমস ফরজ নয়।

৩. জিযিয়া (الجزية) কী?

জিযিয়া হলো ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিকদের (যিম্মি) কাছ থেকে নেওয়া একটি নিরাপত্তা কর। আল্লাহ তাআলা বলেন—

حَتَّىٰ يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ

‘যতক্ষণ না তারা জিযিয়া প্রদান করে সন্তুষ্টচিত্তে ও রাষ্ট্রের অধীনতা মেনে।’ (সুরা আত-তাওবা: আয়াত ২৯)

জিযিয়ার উদ্দেশ্য

> রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

> অমুসলিমদের জান-মাল ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা

> মুসলিমদের ওপর আরোপিত সামরিক দায়িত্ব থেকে তাদের অব্যাহতি

কারা জিযিয়া দেবে?

> প্রাপ্তবয়স্ক, সক্ষম পুরুষ অমুসলিম

> নারী, শিশু, বৃদ্ধ, অসুস্থ, দরিদ্র, সন্ন্যাসী—মুক্ত

ইতিহাস থেকে উদাহরণ

খলিফা হজরত ওমর (রা.) এর শাসনামলে—

> কোনো অমুসলিম নিরাপত্তা না পেলে জিযিয়া ফেরত দেওয়া হতো

> দরিদ্র অমুসলিমদের বায়তুল মাল থেকে ভাতা দেওয়া হতো

৪. খারাজ (الخراج)

খারাজ হলো ইসলামি রাষ্ট্রে অধিগৃহীত বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণাধীন কৃষিজ ভূমির ওপর আরোপিত ভূমি-কর। এটি ভূমির উৎপাদনক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় এবং নিয়মিতভাবে বায়তুল মালে জমা হয়।

মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ—

> এটি ভূমির ওপর কর, ব্যক্তির ওপর নয়।

> মুসলিম বা অমুসলিম—যে-ই ভূমি ভোগ করুক, ভূমিটি খারাজি হলে খারাজ প্রযোজ্য।

করের হার অঞ্চল, ভূমির উর্বরতা, সেচব্যবস্থা ও উৎপাদনের সক্ষমতা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট— 

খলিফা হজরত ওমর (রা.) ইরাক, শাম ও মিসরের বিজিত ভূখণ্ডে ভূমি ব্যক্তিগতভাবে বন্টন না করে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রেখে খারাজ আরোপ করেন— যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার সংরক্ষিত থাকে এবং রাষ্ট্রের স্থায়ী আয় নিশ্চিত হয়।

উদ্দেশ্য ও ব্যয়—

> রাষ্ট্রের নিয়মিত আয় নিশ্চিত করা

> কৃষি অবকাঠামো, সেচ ও জনকল্যাণে ব্যয়

> দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তা

খারাজ বনাম উশর—

খারাজ: খারাজি ভূমির ওপর নির্ধারিত ভূমি-কর (উৎপাদন থাকুক বা না থাকুক নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে প্রযোজ্য)

উশর: উশরি ভূমিতে উৎপাদনের শতাংশ হিসেবে আদায় (সাধারণত ১০% বা ৫%)

৫. ফাই (الفي)

ফাই হলো ইসলামি রাষ্ট্র যে সম্পদ যুদ্ধ সংঘটিত না করে অর্জন করে—অর্থাৎ শত্রু পক্ষ স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করলে, চুক্তির মাধ্যমে, ভীতি বা রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে কিংবা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে সম্পদ লাভ হয়, তাকে ফাই বলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন—

مَا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَىٰ رَسُولِهِ مِنْهُمْ فَمَا أَوْجَفْتُمْ عَلَيْهِ مِنْ خَيْلٍ وَلَا رِكَابٍ

‘আল্লাহ তাদের কাছ থেকে তার রাসুলকে যে ফাই দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা কোনো ঘোড়া বা উট দৌড়াওনি।’ (সুরা আল-হাশর: আয়াত ৬)

ফাইয়ের বৈশিষ্ট্য

> এটি যুদ্ধ ছাড়াই প্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সম্পদ

> গনিমতের মতো ব্যক্তিগত বন্টনযোগ্য নয়

> সম্পূর্ণভাবে বায়তুল মালের মালিকানাধীন

ফাইয়ের অন্তর্ভুক্ত সম্পদ

> আত্মসমর্পণের মাধ্যমে পাওয়া ভূমি ও সম্পদ

> শান্তিচুক্তির বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ বা সম্পত্তি

> রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে পরিত্যক্ত জমি ও সম্পদ

> শত্রুপক্ষের ফেলে যাওয়া মালামাল (যুদ্ধ ছাড়াই)

ফাইয়ের ব্যয়ের খাত

কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী ফাই ব্যয় করা হয়—

مَاۤ اَفَآءَ اللّٰهُ عَلٰی رَسُوۡلِهٖ مِنۡ اَهۡلِ الۡقُرٰی فَلِلّٰهِ وَ لِلرَّسُوۡلِ وَ لِذِی الۡقُرۡبٰی وَ الۡیَتٰمٰی وَ الۡمَسٰكِیۡنِ وَ ابۡنِ السَّبِیۡلِ ۙ كَیۡ لَا یَكُوۡنَ دُوۡلَۃًۢ بَیۡنَ الۡاَغۡنِیَآءِ مِنۡكُمۡ ؕ وَ مَاۤ اٰتٰىكُمُ الرَّسُوۡلُ فَخُذُوۡهُ ٭ وَ مَا نَهٰىكُمۡ عَنۡهُ فَانۡتَهُوۡا ۚ وَ اتَّقُوا اللّٰهَ ؕ اِنَّ اللّٰهَ شَدِیۡدُ الۡعِقَابِ 

‘আল্লাহ জনপদবাসীদের কাছ থেকে তার রাসুলকে ফাই হিসেবে যা দিয়েছেন তা আল্লাহর, রাসুলের, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের এটি এ জন্য যে, যাতে ধন-সম্পদ তোমাদের মধ্যকার বিত্তশালীদের মাঝেই কেবল আবর্তিত না থাকে। রাসুল তোমাদের যা দেয় তা গ্রহণ কর, আর যা থেকে সে তোমাদের নিষেধ করে তা থেকে বিরত হও এবং আল্লাহকেই ভয় কর, নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি প্রদানে কঠোর।’ (সুরা আল-হাশর: আয়াত ৭)

ফাই ও গনিমতের পার্থক্য

> ফাই: যুদ্ধ ছাড়াই অর্জিত সম্পদ— সম্পূর্ণ বায়তুল মালের জন্য

> গনিমত: যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ— নির্দিষ্ট নিয়মে বন্টনযোগ্য

ঐতিহাসিক উদাহরণ

বনু নাদির ইহুদি গোত্রের সম্পদ রাসুলুল্লাহ (সা.) যুদ্ধ ছাড়াই লাভ করেন—এটি ফাই হিসেবে গণ্য হয় এবং তা রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কল্যাণে ব্যয় করা হয়।

৬. উশর (العُشْر)

উশর হলো ইসলামি শরিয়তে কৃষিপণ্যের ওপর নির্ধারিত জাকাত জাতীয় অংশ, যা ফসল উৎপাদনের সময় আদায় করা হয়। এটি ইসলামি অর্থব্যবস্থায় কৃষিখাত থেকে বায়তুল মালে আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

শরীয়ি পরিচয়

উশর বলতে বোঝায়— নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কৃষিজ উৎপাদনের ওপর আল্লাহর জন্য নির্ধারিত অংশ প্রদান করা। এটি মূলত ফসলের জাকাত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

فِيْمَا سَقَتِ السَّمَاءُ وَالْعُيُوْنُ أَوْ كَانَ عَثَرِيًّا الْعُشْرُ، وَمَا سُقِىَ بِالنَّضْحِ نِصْفُ الْعُشْرِ-

‘বৃষ্টি ও ঝরনার পানি দ্বারা সিক্ত ভূমিতে উৎপাদিত ফসল বা নালার পানিতে উৎপন্ন ফসলের উপর ‘ওশর’ (দশ ভাগের এক ভাগ) ১০% জাকাত ওয়াজিব। আর সেচ দ্বারা উৎপাদিত ফসলের উপর ‘অর্ধ ওশর’ (বিশ ভাগের এক ভাগ) ৫% জাকাত ওয়াজিব।’ (বুখারি ১৪৮৩, মিশকাত ১৭৯৭)

উশরের হার

> প্রাকৃতিকভাবে সেচকৃত জমি → ১০% (উশর)

> কৃত্রিম সেচ (খরচসাপেক্ষ) → ৫% (অর্ধ উশর)

উশর ফরজ হওয়ার শর্ত

ফসল খাদ্যযোগ্য ও সংরক্ষণযোগ্য হতে হবে (যেমন— ধান, গম, খেজুর)

ফসল নিসাব পরিমাণে পৌঁছাতে হবে (প্রায় ৫ ওয়াসক— ৬৫৩ কেজি)

ফসল উৎপন্ন হলেই আদায়যোগ্য—এতে এক বছর পূর্ণ হওয়ার শর্ত নেই

উশর কাদের ওপর প্রযোজ্য?

> উশরি জমির মালিক মুসলিম

> জমি নিজে চাষ করুক বা অন্যকে দিয়ে করুক—দায় মালিকের

উশর বনাম খারাজ

উশর: মুসলিম মালিকানাধীন উশরি জমিতে ফসলের ওপর জাকাতস্বরূপ অংশ

খারাজ: খারাজি জমিতে ভূমির ওপর নির্ধারিত কর (উৎপাদনক্ষমতার ভিত্তিতে)

উশরের ব্যয়

উশর জাকাতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় তা যাকাতের আট খাতেই ব্যয়যোগ্য।

৭. হাদিয়া (দান ও উপহার) কী?

হাদিয়া অর্থ উপহার। ইসলামি পরিভাষায়—স্বেচ্ছায়, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির উদ্দেশে কাউকে সম্পদ বা বস্তু প্রদান করাকে হাদিয়া বলা হয়। এটি ফরজ নয় বরং নফল ও উত্তম আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

تَهَادُوا تَحَابُّوا

‘তোমরা একে অপরকে উপহার দাও, এতে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ ৫৯৭)

হাদিয়ার উদ্দেশ্য

> পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্পর্ক সুদৃঢ় করা

> মনোমালিন্য দূর করা

> সামাজিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি

হাদিয়া কারা পেতে পারে?

> আত্মীয়-স্বজন

> প্রতিবেশী

> বন্ধু-বান্ধব

> এমনকি অমুসলিমও (যদি শরিয়তবিরোধী উদ্দেশ্য না থাকে)

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

> জাকাতকে হাদিয়া বলে দেওয়া জায়েজ নয়

> হাদিয়ার নামে জাকাতের খাত পরিবর্তন করা বৈধ নয়

> আত্মীয়কে জাকাত দেওয়া যাবে, যদি সে জাকাতের উপযুক্ত হয় (পিতা-মাতা ও সন্তান ছাড়া)

৮. রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জরিমানা

রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জরিমানা হলো ইসলামি রাষ্ট্রের আয় ও বায়তুল মালে অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এতে আসে—

> রাষ্ট্রীয় সম্পদ: যেমন বন, খাল-বিল, নদী, খনিজ ও সরকারি স্থাপনা। এই সম্পদ থেকে প্রাপ্ত আয় সরাসরি বায়তুল মালে জমা হয়।

> জরিমানা ও ফৌজদারি অর্থ: যেসব ব্যক্তি শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে তাদের উপর আরোপিত জরিমানা বা অর্থ (দণ্ডমূলক) রাষ্ট্রীয় তহবিলে যায়।

বৈশিষ্ট্য ও নিয়ম

রাষ্ট্রীয় সম্পদ এবং জরিমানা সরাসরি ব্যক্তিগত মালিকানায় যায় না।

এই অর্থ শুধুমাত্র সাধারণ কল্যাণ ও বায়তুল মালের নির্ধারিত খাতে ব্যয় করা হয়।

দরিদ্র, ফকির, মিসকিন, এতিম ও সমাজের অন্যান্য অসহায়দের সহায়তা করা হয়।

উদাহরণ—

কোনো ব্যক্তির আর্থিক দণ্ড বা ভ্রষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তা থেকে বাজেয়াপ্ত সম্পদ রাষ্ট্রীয় তহবিলে জমা।

বন, খাল বা সরকারি জমি থেকে প্রাপ্ত কর বা রাজস্ব বায়তুল মালের মাধ্যমে জনকল্যাণে ব্যবহার।

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য—

> সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা

> দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তা করা

> রাষ্ট্রের স্থায়ী আয় ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করা

বায়তুল মালের ব্যয়ের খাত

বায়তুল মালের তহবিলগুলো ব্যবহার করা হয়—

> দরিদ্র, ফকির, মিসকিন ও অসহায়দের জন্য

> এতিম, বিধবা ও প্রতিবন্ধীদের ভাতা

> শিক্ষা, মাদরাসা ও দাওয়াহ কার্যক্রম

> স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো

> রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রশাসনিক ব্যয়

> সেনা, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা

> রাস্তা, সেতু ও হাসপাতাল নির্মাণ

খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে বায়তুল মাল

হজরত আবু বকর (রা.)

তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদে ব্যক্তিগত অধিকার দাবি করেননি এবং মৃত্যুর সময় নিজের সব প্রাপ্ত ভাতা ফেরত দিয়েছেন।

হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)

বায়তুল মালকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। শিশু, বৃদ্ধ ও অমুসলিম দরিদ্রদের জন্য ভাতা চালু করেন। তিনি বলেন— ‘ফোরাত নদীর তীরে একটি কুকুরও যদি অনাহারে থাকে, তার দায় ওমরের ওপর।’

হজরত ওসমান (রা.) ও আলী (রা.)

রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারে বায়তুল মাল পরিচালনা করেছেন।

বায়তুল মাল ও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা

আজকের কল্যাণরাষ্ট্রের (Welfare State) যে ধারণা— সামাজিক নিরাপত্তা, দরিদ্র ভাতা, রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্য ও শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি বহু আগেই ইসলামে বায়তুল মাল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

> বায়তুল মাল অপব্যবহার করা গুরুতর গুনাহ ও রাষ্ট্রীয় অপরাধ

> রাষ্ট্রীয় সম্পদে খেয়ানত কেয়ামতের দিন লজ্জা ও শাস্তির কারণ

> এটি আমানত—ক্ষমতা নয়

ইসলামের পরিভাষায় বায়তুল মাল হলো উম্মাহর সম্মিলিত সম্পদের নিরাপদ ভাণ্ডার ও ন্যায়ভিত্তিক বন্টনব্যবস্থা। এটি দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক ভারসাম্য ও রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচারের প্রধান হাতিয়ার। খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগে এর বাস্তব প্রয়োগ মানব ইতিহাসে এক অনন্য কল্যাণরাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

আজকের মুসলিম সমাজে বায়তুল মালের আদর্শ পুনরুজ্জীবন মানেই—স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পথে ফিরে যাওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমানতের খেয়ানত থেকে রক্ষা করুন এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের তাওফিক দিন। আমিন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ব্যবসার প্রচারে ফেসবুকে ছবি ও লাইভ, শরিয়তের বিধান কী?

ব্যবসার প্রচারে ফেসবুকে ছবি ও লাইভ, শরিয়তের বিধান কী?

সুদের টাকা দরিদ্র আত্মীয়কে দান করা যাবে কি?

সুদের টাকা দরিদ্র আত্মীয়কে দান করা যাবে কি?

নারী-পুরুষ একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়?

নারী-পুরুষ একে অপরকে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিলেই কি বিয়ে সম্পন্ন হয়?

অ্যাম্বুলেন্সে লাশ রেখে জানাজা পড়ার বিধান কী?

অ্যাম্বুলেন্সে লাশ রেখে জানাজা পড়ার বিধান কী?

অজু ছাড়া ‘দরুদ শরিফ’ পাঠের বিধান: ইসলাম কী বলে?

অজু ছাড়া ‘দরুদ শরিফ’ পাঠের বিধান: ইসলাম কী বলে?

জুয়া— ইহকাল ও পরকালের ধ্বংসের ফাঁদ

জুয়া— ইহকাল ও পরকালের ধ্বংসের ফাঁদ

আরও পড়ুন

লিমিটেড কোম্পানির ব্যবসা কি জায়েজ?

লিমিটেড কোম্পানির ব্যবসা কি জায়েজ?

ঋণ দিয়ে পরে তা জাকাত হিসেবে গণ্য করা যাবে কি?

ঋণ দিয়ে পরে তা জাকাত হিসেবে গণ্য করা যাবে কি?

ব্যবসার প্রচারে ফেসবুকে ছবি ও লাইভ, শরিয়তের বিধান কী?

ব্যবসার প্রচারে ফেসবুকে ছবি ও লাইভ, শরিয়তের বিধান কী?

সুন্দর হতে গায়ের রঙ পরিবর্তন করা কি গুনাহ?

সুন্দর হতে গায়ের রঙ পরিবর্তন করা কি গুনাহ?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম