যে উপায় ও আমলে মিলবে শবে কদর
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪১ পিএম
লাইলাতুল কদর পেতে ইবাদত। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
পবিত্র মাহে রমজান ধীরে ধীরে বিদায়ের পথে। আর এই বিদায়ের সময়েই আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের জন্য বিশেষ পুরস্কার হিসেবে দান করেছেন মহিমান্বিত রাত লাইলাতুল কদর। এই রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম—যার ইবাদতের সওয়াব প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদতের সমান। তাই এই রাতের মর্যাদা ও ফজিলত মুসলিম জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমন কিছু উপায় ও আমল রয়েছে যাতে লাইলাতুল কদর পাওয়ার সৌভাগ্য নসিব হবে। কী সেই সব উপায় ও আমল?
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ
‘শবে কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা আল-কদর: আয়াত ৩)
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় কদরের রাতে ইবাদত করবে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি ১৯০১, মুসলিম ৭৬০)
এই মহিমান্বিত রাতের বরকত লাভের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপায়সহ আমল ও প্রস্তুতি তুলে ধরা হলো—
১. নির্দিষ্ট রাতটি খোঁজার চেষ্টা করুন
লাইলাতুল কদর নির্দিষ্ট কোনো রাত বলে নিশ্চিতভাবে নির্ধারিত হয়নি। তবে ইসলামি শিক্ষায় বলা হয়েছে, রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে—২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯তম রাতে— কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তাই এই রাতগুলোতে ইবাদতের বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ
‘রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।’ (বুখারি ২০১৭)
২. ইতেকাফের মাধ্যমে মনোযোগ বাড়ানো
রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে ইতেকাফ করা সুন্নত। ইতেকাফের মাধ্যমে মানুষ দুনিয়ার ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে দূরে থেকে আল্লাহর ইবাদতে মনোযোগী হতে পারে। তবে কেউ যদি পুরো দশ দিন ইতেকাফ করতে না পারেন, তাহলে সাধ্যমতো কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের জন্য হলেও ইতেকাফের নিয়ত করতে পারেন। এতে আল্লাহর সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক আরও গভীর হবে।
৩. ইবাদতের রুটিন তৈরি করুন
কদরের রাতকে অর্থবহ করতে সময়ের সঠিক ব্যবহার জরুরি। তারাবিহর নামাজের পর থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়টুকু ইবাদতের জন্য পরিকল্পনা করে নেওয়া উত্তম। এই সময়ে কুরআন তিলাওয়াত করা, অর্থসহ পড়া ও তা নিয়ে চিন্তা করা, নফল নামাজ ও তাহাজ্জুদ আদায় করা এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল।
৪. বিশেষ দোয়া ও দান-সদকা
হজরত আয়েশা (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যদি তিনি লাইলাতুল কদর পেয়ে যান তবে কোন দোয়া পড়বেন। তখন নবীজি (সা.) তাকে এই দোয়াটি শিখিয়ে দেন—
اللَّهُمَّ إِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ العَفْوَ فَاعْفُ عَنِّي
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুয়্যুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ (তিরমিজি ৩৫১৩)
এছাড়াও এই রাতে দান-সদকা করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি উত্তম মাধ্যম।
৫. আল্লাহর কাছে নিজের চাওয়া ও আগামীর পরিকল্পনা পেশ করুন
লাইলাতুল কদর মানুষের জীবনের জন্য এক অনন্য সুযোগ। এই রাতে বান্দা তার জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আল্লাহর কাছে তুলে ধরতে পারে। নিজের ভুলের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং আগামী দিনে সৎ পথে চলার দৃঢ় সংকল্প নেওয়া উচিত। একই সঙ্গে চেষ্টা করা উচিত— রমজানে অর্জিত ভালো অভ্যাসগুলো যেন সারা বছর ধরে রাখা যায়।
পবিত্র এই রাতটি আমাদের জীবনের গতিপথ পরিবর্তনের এক মহামূল্যবান সুযোগ। তাই অলসতা বা অবহেলা না করে ইবাদত, দোয়া ও সৎকর্মের মাধ্যমে আমরা এই রাতের রহমত ও মুক্তি লাভের চেষ্টা করতে পারি। পাশাপাশি এ আমলগুলোও করতে পারি—
৬. সময়কে গুরুত্ব দিন
শবে কদর পাওয়ার জন্ইয তিকাফে বসে অযথা সময় নষ্ট না করা। তারাবিহ নামাজ শেষ হওয়ার পর থেকে সেহরি পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদতে কাটানোর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিন। আলস্য দূরে ঠেলে নিজের সবটুকু শক্তি ও মনোযোগ ইবাদতে ব্যয় করুন।
৭. কুরআন তিলাওয়াত করুন
তারাবিহ শেষ করে কুরআন তিলাওয়াতে লিপ্ত থাকুন। শুধু তিলাওয়াত না করে এর অর্থ ও মর্ম উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। এছাড়া নিজের সব চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আল্লাহর সঙ্গে একান্ত মনে কথা বলুন। নিজের ভুলগুলোর জন্য অনুতপ্ত হয়ে অন্তর থেকে তার কাছে ক্ষমা চান।
৮. সামান্য বিরতি ও পানি পান করুন
দীর্ঘ সময় ইবাদত করতে করতে ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। ক্লান্তি দূর করতে মাঝে মাঝে বিরতি নিন এবং পর্যাপ্ত পানি পান করে শরীর হাইড্রেটেড রাখুন। এতে ইবাদতে মন বসানো সহজ হবে।
৯. নফল নামাজ ও তাহাজ্জুদ
সারা রাত বেশি বেশি নফল নামাজ আদায় করুন। তবে সেহরি খাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়তে ভুলবেন না, কারণ এই সময়ের দোয়া কবুলের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
১০. সদাচরণ ও ধৈর্য
ইতিকাফের পুরোটা সময় সবার সঙ্গে বিনয়ী ও নম্র আচরণ করুন। নিজের রাগ ও আচরণের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখুন। কারণ, সদাচারণ ও ধৈর্য ইবাদতের অংশ।
