Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

মেক্সিকোতে ইসলামের বিস্ময়কর উত্থানের ইতিহাস

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ০৯:৫৪ পিএম

মেক্সিকোতে ইসলামের বিস্ময়কর উত্থানের ইতিহাস

সুরাইয়া মসজিদ (মেজকুইটা সোরায়া), মেক্সিকোর প্রথম মসজিদ। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

মেক্সিকোর নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মায়া ও অ্যাজটেক সভ্যতার নিদর্শন, রঙিন লাতিন সংস্কৃতি, মারিয়াচি সঙ্গীত এবং বিশাল ক্যাথলিক গির্জা। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যপটের আড়ালে গত কয়েক দশকে নীরবে বিকশিত হয়েছে আরেকটি ইতিহাস— ইসলামের ইতিহাস।

যে দেশটির ১২ কোটিরও বেশি মানুষের অধিকাংশই খ্রিস্টান, সেই দেশেই আজ ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য ইসলামিক সেন্টার, মসজিদ এবং ক্রমবর্ধমান মুসলিম সম্প্রদায়। অভিবাসী আরব ব্যবসায়ী, স্থানীয় ধর্মান্তরিত জনগোষ্ঠী এবং মায়া আদিবাসীদের আন্তরিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে মেক্সিকোর মাটিতে ইসলামের যে বীজ রোপিত হয়েছিল, তা আজ ধীরে ধীরে একটি সুদৃঢ় বাস্তবতায় রূপ নিচ্ছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি

১৯ শতকের শেষের দিকে ওমান, সিরিয়া ও লেবানন থেকে আগত আরব অভিবাসীদের মাধ্যমে মেক্সিকোতে ইসলামের আগমন ঘটে। তবে তখন তারা মেক্সিকোর সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থায় মিশে ছিলেন এবং ইসলাম প্রচারের ব্যাপক কোনো উদ্যোগ ছিল না।

মেক্সিকোতে ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাস

মেক্সিকোতে ইসলামের ইতিহাস অনেকের ধারণার চেয়ে পুরোনো। ইতিহাসবিদদের মতে, স্পেনীয় ঔপনিবেশিক যুগে কিছু মুসলিম বংশোদ্ভূত ‘মরিস্কো’ (যেসব মুসলিমকে জোরপূর্বক খ্রিস্টান বানানো হয়েছিল) নতুন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন। যদিও তারা প্রকাশ্যে ইসলামের পরিচয় বহন করতে পারেননি, তবুও তাদের মাধ্যমে ইসলামের কিছু সাংস্কৃতিক প্রভাব লাতিন আমেরিকায় পৌঁছেছিল বলে ধারণা করা হয়।

তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ইসলামের উপস্থিতি দৃশ্যমান হতে শুরু করে উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। সে সময় উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল—বিশেষত বর্তমান লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও তুরস্ক থেকে বহু মানুষ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মেক্সিকোতে অভিবাসন করেন। তাদের মধ্যে কিছু পরিবার মুসলিম পরিচয় ধরে রাখলেও সংখ্যায় কম হওয়ায় তারা দীর্ঘদিন সংগঠিতভাবে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেননি।

অভিবাসীদের হাত ধরে ইসলামের পুনর্জাগরণ

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে মধ্যপ্রাচ্য থেকে নতুন করে মুসলিম অভিবাসন শুরু হলে মেক্সিকোর মুসলিম সমাজ ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তারা একটি স্বতন্ত্র কমিউনিটি গড়ে তোলেন।

এই প্রচেষ্টার ফল হিসেবে ১৯৮৯ সালে কোয়াহুইলা অঙ্গরাজ্যের তোরেওন শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সুরাইয়া মসজিদ’—যা আধুনিক মেক্সিকোর প্রথম স্থায়ী মসজিদ হিসেবে পরিচিত। লেবানিজ বংশোদ্ভূত মুসলিমদের উদ্যোগে নির্মিত এই মসজিদ শুধু একটি ইবাদতখানাই নয়; বরং মেক্সিকোর মুসলিম ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

এর পর থেকে রাজধানী মেক্সিকো সিটি, গুয়াদালাহারা, মনতেরে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরেও ইসলামিক সেন্টার ও মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।

মায়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামের উত্থান: এক অভূতপূর্ব ঘটনা

মেক্সিকোতে ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় নিঃসন্দেহে চিয়াপাস অঞ্চলের মায়া আদিবাসীদের ইসলাম গ্রহণ। ১৯৯৪ সালে চিয়াপাসে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বহু আদিবাসী তাদের জীবন, বিশ্বাস ও পরিচয় নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেন। এমন এক সময়ে স্পেনের গ্রানাডা থেকে আগত মুসলিম দাঈদের মাধ্যমে ইসলামের পরিচয় তাদের কাছে পৌঁছে।

বিশেষ করে তজোতজিল (Tzotzil) মায়া জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার ইসলামের সরলতা, একত্ববাদ এবং নৈতিক জীবনব্যবস্থার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।

ধীরে ধীরে সান ক্রিস্তোবাল দে লাস কাসাস অঞ্চলটি মেক্সিকোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত হয়। এখানকার মুসলিমরা শুধু নামাজ ও ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সামাজিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি বিকল্প জীবনধারা গড়ে তুলেছেন।

মসজিদ যখন কমিউনিটি সেন্টার

মেক্সিকোর মুসলিম সমাজকে একটি বিশেষ আইনি বাস্তবতার মধ্য দিয়ে চলতে হয়। দেশটির আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ ধর্মীয় কাজে ব্যবহৃত ভবন রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির আওতায় চলে যেতে পারে।

ফলে মুসলিমরা তাদের মসজিদগুলোকে বহুমুখী কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এখানে শুধু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই নয়, বরং—

  • কুরআন শিক্ষা
  • আরবি ভাষা শিক্ষা
  • আন্তধর্মীয় সংলাপ
  • সামাজিক সেবা
  • নারী ও শিশুদের প্রশিক্ষণ
  • দাওয়াহ কার্যক্রম

নিয়মিত পরিচালিত হয়। এ কারণে মেক্সিকোর অনেক মসজিদ স্থানীয় সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে এবং ইসলামের প্রতি মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি করছে।

বর্তমান মেক্সিকোতে ইসলামের অবস্থান

আজ মেক্সিকোজুড়ে ৪০টিরও বেশি মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার সক্রিয় রয়েছে। যদিও মুসলিমরা এখনও সংখ্যায় খুবই কম, তবে প্রতি বছর নতুন নতুন মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মেক্সিকোতে ইসলামের বিস্তার মূলত তিনটি কারণে ঘটছে—

  • অভিবাসী মুসলিমদের উপস্থিতি
  • ইসলাম সম্পর্কে আগ্রহ ও গবেষণা
  • স্থানীয় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ধর্মান্তর

বর্তমানে ইসলাম দেশটির দ্রুত বর্ধনশীল ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মেক্সিকোতে ইসলামের ইতিহাস শুধু একটি ধর্মের বিস্তারের গল্প নয়; বরং এটি সত্যের অনুসন্ধান, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং আত্মিক জাগরণের এক অনন্য অধ্যায়। পিরামিড, ক্যাথেড্রাল ও লাতিন সংস্কৃতির দেশটিতে আজ যখন মিনার থেকে আজানের ধ্বনি উচ্চারিত হয়, তখন তা প্রমাণ করে যে সত্য ও তাওহীদের বার্তা ভৌগোলিক সীমানা কিংবা সাংস্কৃতিক প্রাচীর মানে না।

আরব অভিবাসীদের হাত ধরে শুরু হওয়া যে যাত্রা, তা আজ মায়া আদিবাসীদের হৃদয়েও জায়গা করে নিয়েছে। মেক্সিকোর মাটিতে গড়ে ওঠা প্রতিটি মসজিদ যেন এই সাক্ষ্য বহন করে—আল্লাহর নূর পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে পৌঁছাতে পারে, যদি সেখানে সত্যের অনুসন্ধানী কিছু হৃদয় জেগে থাকে।

মেক্সিকোর ইসলামের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়— মানুষের জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সত্যের আহ্বান এক, আর সেই আহ্বান যুগে যুগে পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যায়।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

মার্কিন নির্বাচনে ইতিহাস গড়া প্রথম দক্ষিণ এশীয় মুসলিম নারী, কে এই সাবা হায়দার?

মার্কিন নির্বাচনে ইতিহাস গড়া প্রথম দক্ষিণ এশীয় মুসলিম নারী, কে এই সাবা হায়দার?

ভিপি হয়ে ১০৫ বছরের ইতিহাস ভাঙলেন ভারতের এই মুসলিম তরুণী

ভিপি হয়ে ১০৫ বছরের ইতিহাস ভাঙলেন ভারতের এই মুসলিম তরুণী

ইয়াজুজ-মাজুজ নিয়ে প্রচলিত কাহিনি: কোনটি সত্য আর কোনটি বানোয়াট?

ইয়াজুজ-মাজুজ নিয়ে প্রচলিত কাহিনি: কোনটি সত্য আর কোনটি বানোয়াট?

জুমার আজানের পর দুনিয়াবি কাজ করা যাবে কি?

জুমার আজানের পর দুনিয়াবি কাজ করা যাবে কি?

ইমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণের প্রত্যাশা পূরণের আমল কী?

ইমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণের প্রত্যাশা পূরণের আমল কী?

জুমার খুতবা দাঁড়িয়ে দেওয়াই কি আবশ্যক?

জুমার খুতবা দাঁড়িয়ে দেওয়াই কি আবশ্যক?

আরও পড়ুন

মসজিদে মোবাইল ব্যবহার কি গুনাহ?

মসজিদে মোবাইল ব্যবহার কি গুনাহ?

ঢিলা ব্যবহারের সময় আজানের জবাব দেওয়া যাবে?

ঢিলা ব্যবহারের সময় আজানের জবাব দেওয়া যাবে?

ফ্রিতে ওমরাহ করার বিশাল সুযোগ, যেভাবে পাবেন

ফ্রিতে ওমরাহ করার বিশাল সুযোগ, যেভাবে পাবেন

আজকের নামাজের সময়সূচি: ৭ নভেম্বর ২০২৬

আজকের নামাজের সময়সূচি: ৭ নভেম্বর ২০২৬

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম