Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

ইয়াজুজ-মাজুজ নিয়ে প্রচলিত কাহিনি: কোনটি সত্য আর কোনটি বানোয়াট?

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০১:১০ পিএম

ইয়াজুজ-মাজুজ নিয়ে প্রচলিত কাহিনি: কোনটি সত্য আর কোনটি বানোয়াট?

ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

পৃথিবীর শেষ সময় ও কিয়ামতের বড় আলামতগুলোর মধ্যে ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাব অন্যতম। পবিত্র কুরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসে তাদের অস্তিত্ব, পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি, যুলকারনাইনের নির্মিত প্রতিবন্ধক এবং কিয়ামতের আগে তাদের বেরিয়ে আসার বিষয়ে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়কে কেন্দ্র করে যুগে যুগে মানুষের মুখে মুখে এবং বিভিন্ন তাফসির ও ইতিহাসগ্রন্থে অসংখ্য বিস্ময়কর কাহিনি ছড়িয়ে পড়েছে।

কোনো বর্ণনায় বলা হয়েছে, ইয়াজুজ-মাজুজের একেকজন ১২০ হাত লম্বা। কেউ কেউ নাকি নিজেদের কান বিছানা ও কম্বল হিসেবে ব্যবহার করে। আবার অন্য বর্ণনায় তাদের উচ্চতা মাত্র এক থেকে তিন বিঘত বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি তাদের জন্ম, খাদ্যাভ্যাস, দৈহিক গঠন ও জীবনযাপন নিয়েও নানা অদ্ভুত গল্প প্রচলিত রয়েছে।

প্রশ্ন হলো— এসব কাহিনির কোনটি কুরআন-হাদিস দ্বারা প্রমাণিত? কোনটি দুর্বল, কোনটি জাল এবং কোনটি ইসরাইলি বর্ণনা থেকে এসেছে? কোনো তাফসিরগ্রন্থে কিংবা কোনো সাহাবির নামে বর্ণনা পাওয়া গেলেই কি সেটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস হিসেবে বিশ্বাস করতে হবে?

ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে কোনো কথা প্রচার করার আগে তার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা। তাই ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে প্রচলিত কাহিনিগুলো আবেগ বা বিস্ময়ের ভিত্তিতে গ্রহণ না করে কুরআন, সহিহ হাদিস এবং মুহাদ্দিসদের বিশ্লেষণের আলোকে বিষয়টি জানা প্রয়োজন।

এ আলোচনায় কুরআনের বক্তব্য, নির্ভরযোগ্য হাদিস, দুর্বল ও বানোয়াট বর্ণনা এবং ইসরাইলি কাহিনির পার্থক্য তুলে ধরা হলো। বিশেষভাবে মুহাম্মদ আবু শাহবাহ (রহ.)-এর আল-ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল মাওদুআত ফি কুতুবিত তাফসির গ্রন্থের আলোচনাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

১. ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বক্তব্য

ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস হলো পবিত্র কুরআন। কুরআনে তাদের সম্পর্কে মূলত সুরা আল-কাহফ ও সুরা আল-আম্বিয়ায় আলোচনা করা হয়েছে।

যুলকারনাইনের কাছে একটি সম্প্রদায়ের আবেদন

সুরা আল-কাহফের ৮৩ থেকে ৯৮ নম্বর আয়াতে বাদশাহ যুলকারনাইনের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ভ্রমণ করেছিলেন। একপর্যায়ে এমন একটি জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছান, যারা ইয়াজুজ-মাজুজের অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল। তারা যুলকারনাইনের কাছে আবেদন জানায়, তিনি যেন তাদের ও ইয়াজুজ-মাজুজের মধ্যে একটি শক্তিশালী প্রতিবন্ধক নির্মাণ করে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

قَالُوا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَىٰ أَن تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا

তারা বলল, হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। তাই আমরা কি আপনাকে কিছু অর্থ দেব, যাতে আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেন? (সুরা আল-কাহফ: আয়াত ৯৪)

যুলকারনাইন তাদের কাছ থেকে কোনো পারিশ্রমিক গ্রহণ না করে নিজের সামর্থ্য ও আল্লাহর দেওয়া উপকরণ কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিবন্ধক নির্মাণ করেন। তিনি লোহার বড় বড় খণ্ড একত্র করে সেগুলো উত্তপ্ত করেন এবং তার ওপর গলিত তামা ঢেলে দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَمَا اسْطَاعُوا أَن يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا

অতঃপর তারা সেটির ওপর আরোহণ করতে পারল না এবং সেটি ভেদ করতেও সক্ষম হলো না। (সুরা আল-কাহফ: আয়াত ৯৭)

এখানে কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত এবং যুলকারনাইনের নির্মিত প্রতিবন্ধক তাদের চলাচল বাধাগ্রস্ত করেছিল।

কিয়ামতের আগে ইয়াজুজ-মাজুজ বেরিয়ে আসবে

কুরআনের অন্য একটি স্থানে আল্লাহ তাআলা তাদের ভবিষ্যৎ আবির্ভাবের কথা ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন—

حَتَّىٰ إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُم مِّن كُلِّ حَدَبٍ يَنسِلُونَ

অবশেষে যখন ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্ত করে দেওয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি থেকে দ্রুত ছুটে আসবে। (সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত ৯৬)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, কিয়ামতের আগে তাদের আবির্ভাব ঘটবে এবং তারা ব্যাপকভাবে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে।

তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো— কুরআনে তাদের দৈহিক উচ্চতা, চেহারা, কান, দাঁত, চোখ কিংবা শরীরের গঠন সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়নি। তাদের সংখ্যা সম্পর্কেও নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান উল্লেখ করা হয়নি। অতএব, এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি বা সংখ্যা বিশ্বাস করা জরুরি নয়।

২. ইয়াজুজ-মাজুজ ১২০ হাত লম্বা!: অদ্ভুত বর্ণনাটির সত্যতা কতটুকু?

ইয়াজুজ-মাজুজের শারীরিক গঠন ও আকার-আকৃতি নিয়ে বিভিন্ন তাফসিরগ্রন্থে কিছু বিস্ময়কর বর্ণনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি বর্ণনায় দাবি করা হয়েছে, তাদের একেকটি দল চার লাখ উপদলে বিভক্ত। তাদের প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের ঔরসজাত এক হাজার পুরুষ সন্তান না দেখে মারা যায় না।

একই বর্ণনায় তাদের দৈহিক গঠনকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

  • প্রথম দলের লোকেরা ‘আরজ’ নামের একটি গাছের মতো দীর্ঘাকৃতির। কথিত আছে, গাছটির উচ্চতা ১২০ হাত।
  • দ্বিতীয় দলের লোকেরা নিজেদের একটি কান বিছানা হিসেবে ব্যবহার করে এবং অন্য কান দিয়ে শরীর ঢেকে রাখে। তারা হাতি, উট, বন্য প্রাণী, শূকর এমনকি নিজেদের মৃত সঙ্গীদেরও খেয়ে ফেলে।
  • তৃতীয় দলের লোকদের শারীরিক গঠন সম্পর্কেও অস্বাভাবিক বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

এই বর্ণনাটি জালালুদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) তার আদ-দুররুল মানসুর গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক আল-উক্কাশির সূত্রে হজরত হুজাইফা (রা.) থেকে উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু হাদিসবিশারদদের কাছে এর বর্ণনাকারী মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক আল-উক্কাশি নির্ভরযোগ্য নন। বরং তাঁর বিরুদ্ধে জাল হাদিস বর্ণনার অভিযোগ রয়েছে।

ইবনুল জাওজি (রহ.) তার আল-মাওদুআত গ্রন্থে এই বর্ণনাকারীকে মুনকারুল হাদিস হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তার বর্ণনাকে জাল ও অগ্রহণযোগ্য বলে চিহ্নিত করেছেন।

ইবনু আদি (রহ.) তার আল-কামিল ফি দুয়াফায়ির রিজাল গ্রন্থে এ ধরনের বর্ণনা সম্পর্কে বলেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক আল-উক্কাশি থেকে বর্ণিত এসব হাদিস মুনকার ও বানোয়াট। (আল-মাওদুআত ১/২০৬-২০৭, আল-কামিল ফি দুয়াফায়ির রিজাল ৭/৩৬৮-৩৬৯)

অতএব, ১২০ হাত লম্বা ইয়াজুজ-মাজুজ কিংবা কানকে বিছানা ও কম্বল হিসেবে ব্যবহার করার গল্পকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস হিসেবে প্রচার করার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই।

মুহাম্মদ আবু শাহবাহ (রহ.) তার আল-ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল মাওদুআত গ্রন্থে এ ধরনের বর্ণনার অসংগতি ও নির্ভরযোগ্যতার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

৩. ইসরাইলি বর্ণনায় ইয়াজুজ-মাজুজের শারীরিক গঠন

ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে শুধু জাল হাদিসই নয়, বিভিন্ন ইসরাইলি বর্ণনাও তাফসির ও ইতিহাসগ্রন্থে স্থান পেয়েছে।

হজরত কাব আল-আহবার (রহ.)-এর নামে বর্ণিত একটি বক্তব্যে বলা হয়েছে, ইয়াজুজ-মাজুজকে তিন ধরনের শারীরিক গঠনে সৃষ্টি করা হয়েছে।

  • একদল ‘আরজ’ গাছের মতো দীর্ঘাকৃতির।
  • দ্বিতীয় দলের লোকেরা চার হাত লম্বা ও চার হাত চওড়া।
  • তৃতীয় দল নিজেদের একটি কান বিছানা হিসেবে ব্যবহার করে এবং অন্য কান দিয়ে শরীর ঢেকে রাখে। এমনকি তারা নিজেদের প্রসূতি নারীদের নাড়িভুঁড়িও খেয়ে ফেলে বলে দাবি করা হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় বোঝা জরুরি। কাব আল-আহবার (রহ.) ছিলেন একজন তাবেঈ। তিনি ইসলাম গ্রহণের আগে ইহুদি ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার কাছ থেকে ইসরাইলি সূত্রের বিভিন্ন তথ্য বর্ণিত হয়েছে।

কোনো বক্তব্য কাব আল-আহবারের নামে বর্ণিত হলেই সেটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস হয়ে যায় না। তার বক্তব্যকে নবীজির বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করার আগে পৃথকভাবে সনদ যাচাই করা জরুরি।

আবার কোথাও ইয়াজুজ-মাজুজকে খর্বাকৃতির বলা হয়েছে!

বিস্ময়কর বিষয় হলো, ইয়াজুজ-মাজুজের দৈহিক গঠন নিয়ে এর সম্পূর্ণ বিপরীত বর্ণনাও পাওয়া যায়।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.)-এর নামে একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, ইয়াজুজ-মাজুজ অত্যন্ত খর্বাকৃতির। তাদের কারও উচ্চতা এক বিঘত, কারও দুই বিঘত। তাদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ ব্যক্তির উচ্চতাও তিন বিঘতের বেশি নয়।

কিন্তু এ বর্ণনাটিও নির্ভরযোগ্য সহিহ হাদিস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

একই সম্প্রদায়ের দৈহিক গঠন নিয়ে কোথাও ১২০ হাত উচ্চতা, কোথাও চার হাত উচ্চতা, আবার কোথাও মাত্র এক থেকে তিন বিঘত উচ্চতার কথা বলা হচ্ছে।

এমন পরস্পরবিরোধী বর্ণনা আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, কেবল কোনো সাহাবি বা তাবেঈর নামে বর্ণনা পাওয়া গেলেই তা যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়। (মুহাম্মদ আবু শাহবাহ, আল-ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল মাওদুআত ফি কুতুবিত তাফসির পৃষ্ঠা ২৪৫-২৪৭)

৪. ইয়াজুজ-মাজুজ প্রতিদিন প্রাচীর খনন করে—বর্ণনাটি কি সহিহ?

ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে বহুল প্রচলিত আরেকটি বর্ণনা হলো, তারা প্রতিদিন যুলকারনাইনের নির্মিত প্রাচীর খনন করতে থাকে। একপর্যায়ে যখন সূর্যের আলো দেখতে পায়, তখন তাদের নেতা বলে, আজ ফিরে যাও; আগামীকাল এসে বাকিটুকু খনন করবে। কিন্তু তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ না বলার কারণে পরদিন ফিরে এসে দেখে, প্রাচীরটি আবার আগের মতো শক্ত হয়ে গেছে।

এভাবে দীর্ঘদিন চলতে থাকার পর একসময় আল্লাহ তাদের বের হওয়ার অনুমতি দেবেন। সেদিন তাদের নেতা বলবে, আগামীকাল ইনশাআল্লাহ আমরা প্রাচীরটি ভেদ করব। তখন পরদিন ফিরে এসে তারা আগের দিনের খনন করা অংশ পাবে এবং প্রাচীর ভেদ করে বেরিয়ে আসবে।

এরপর তারা পৃথিবীতে ব্যাপক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। পানির উৎসগুলো পান করে শেষ করে ফেলবে। মানুষ তাদের ভয়ে দুর্গে আশ্রয় নেবে। তারা আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করবে। তীরগুলো রক্তমাখা অবস্থায় ফিরে এলে তারা মনে করবে, পৃথিবী ও আকাশের অধিবাসীদের পরাজিত করেছে।

এরপর আল্লাহ তাদের ঘাড়ে ‘নাগাফ’ নামের একধরনের ক্ষুদ্র পোকা পাঠাবেন। এর আক্রমণে তারা সবাই মারা যাবে।

বর্ণনার শেষাংশে বলা হয়েছে, তাদের মৃতদেহের মাংস ও রক্ত খেয়ে পৃথিবীর পশুপাখি অত্যন্ত মোটা-তাজা হয়ে উঠবে।

বর্ণনাটির সূত্র ও হাদিসবিশারদদের মূল্যায়ন

এই বর্ণনাটি হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম আহমদ, ইমাম তিরমিজি ও ইবনে মাজাহসহ একাধিক মুহাদ্দিস তাদের গ্রন্থে এটি উল্লেখ করেছেন। মুসনাদে আহমদ ১০৬৩২, তিরমিজি ৩১৫৩, ইবনে মাজাহ ৪০৮০)

ইমাম তিরমিজি বর্ণনাটিকে গরিব বলেছেন এবং এর সনদকে ভালো ও শক্তিশালী হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে বিখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসির (রহ.) এই বর্ণনাটির সনদ ভালো হওয়া সত্ত্বেও এর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য হিসেবে বর্ণিত হওয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বলেন—

إِسْنَادُهُ جَيِّدٌ قَوِيٌّ، وَلَكِنْ مَتْنُهُ فِي رَفْعِهِ نَكَارَةٌ

এর সনদ ভালো ও শক্তিশালী; কিন্তু এটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে এর বক্তব্যে অস্বাভাবিকতা রয়েছে। (তাফসির ইবনে কাসির ৫/১৯৪, সুরা আল-কাহফ, আয়াত ৯৭-এর তাফসির)

ইবনে কাসির (রহ.)-এর আপত্তির মূল কারণ হলো, পবিত্র কুরআনের আয়াতের বাহ্যিক বক্তব্যে বোঝা যায়, যুলকারনাইনের নির্মিত প্রতিবন্ধক এতটাই শক্তিশালী ছিল যে ইয়াজুজ-মাজুজ সেটির ওপর উঠতে কিংবা সেটি ভেদ করতে সক্ষম হয়নি। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَمَا اسْطَاعُوا أَن يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا

তারা সেটির ওপর আরোহণ করতে পারেনি এবং সেটি ভেদ করতেও সক্ষম হয়নি।' (সুরা আল-কাহফ: আয়াত ৯৭)

ইবনে কাসির (রহ.) আরও বলেন, কাব আল-আহবারের সূত্রে একটি বর্ণনা পাওয়া যায়, যেখানে বলা হয়েছে, ইয়াজুজ-মাজুজ প্রাচীরটি প্রতিদিন চাটতে থাকে। একপর্যায়ে সামান্য অংশ বাকি থাকতে তারা ফিরে যায়। পরদিন এসে দেখে, সেটি আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। একসময় তারা ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে ফিরে যাবে এবং পরদিন এসে দেখবে, প্রাচীরটি আগের দিনের অবস্থাতেই রয়েছে। তখন তারা সেটি ভেদ করে বেরিয়ে আসবে।

ইবনে কাসির (রহ.) ধারণা প্রকাশ করেছেন, আবু হুরায়রা (রা.) হয়তো কাব আল-আহবারের কাছ থেকে এ কাহিনি শুনেছিলেন। পরবর্তী কোনো বর্ণনাকারী ভুলবশত এটিকে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বক্তব্য হিসেবে বর্ণনা করে থাকতে পারেন। তবে এটি ইবনে কাসির (রহ.)-এর একটি ব্যাখ্যা ও সম্ভাব্য ধারণা; একে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।


৫. প্রাচীরের কিছু অংশ কি ইতোমধ্যে খুলে গেছে? সহিহ হাদিস কী বলে?

প্রাচীর খননের আগের বর্ণনাটি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ইবনে কাসির (রহ.) আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস উল্লেখ করেছেন। হজরত যায়নাব বিনতে জাহশ (রা.) বলেন, একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। তাঁর চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল। তিনি বলছিলেন—

لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَيْلٌ لِلْعَرَبِ مِنْ شَرٍّ قَدِ اقْتَرَبَ، فُتِحَ الْيَوْمَ مِنْ رَدْمِ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مِثْلُ هَذِهِ

আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই! আরবদের জন্য ধ্বংস অনিবার্য এমন এক অনিষ্টের কারণে, যা অত্যন্ত নিকটে চলে এসেছে। আজ ইয়াজুজ ও মাজুজের প্রাচীর থেকে এতটুকু খুলে দেওয়া হয়েছে। এ কথা বলার সময় রাসুলুল্লাহ (সা.) তার বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী দিয়ে একটি বৃত্ত তৈরি করে দেখালেন। হজরত যায়নাব (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে নেককার লোক থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাব? তিনি বললেন—

نَعَمْ، إِذَا كَثُرَ الْخَبَثُ

হ্যাঁ, যখন পাপাচার ও অনাচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। (বুখারি ৩৩৪৬, মুসলিম ২৮৮০)

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সময়েই প্রাচীরের একটি অংশ খুলে যাওয়ার সংবাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। হাদিসে প্রাচীরের সামান্য অংশ খুলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে; ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পূর্ণভাবে বেরিয়ে আসার কথা বলা হয়নি। তাই এ হাদিসের সঙ্গে কিয়ামতের আগে তাদের ব্যাপকভাবে বেরিয়ে আসার বিষয়টি সাংঘর্ষিক নয়।

তাহলে প্রাচীর খননের বর্ণনাটি কীভাবে বুঝতে হবে?

এখানে ইবনে কাসির (রহ.)-এর বিশ্লেষণ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি মনে করেছেন, প্রতিদিন প্রাচীর খনন ও ‘ইনশাআল্লাহ’ বলার ঘটনাটি হয়তো কাব আল-আহবারের কাছ থেকে আসা ইসরাইলি বর্ণনা। পরবর্তী সময়ে সেটি ভুলবশত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস হিসেবে বর্ণিত হয়ে থাকতে পারে।

তবে এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, ইবনে কাসিরের এই আপত্তি তার নিজস্ব হাদিস-সমালোচনামূলক মূল্যায়ন। ইমাম তিরমিজি বর্ণনাটির সনদকে শক্তিশালী বলেছেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে উভয় দিকের মূল্যায়ন উল্লেখ করা উচিত।

সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো— কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্য এবং বুখারি ও মুসলিমের বর্ণনাকে ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। অন্য বর্ণনাগুলোকে মুহাদ্দিসদের মূল্যায়নসহ উপস্থাপন করা।

৬. ইয়াজুজ-মাজুজ কি আদম (আ.)-এর বীর্য থেকে সৃষ্টি হয়েছিল?

ইয়াজুজ-মাজুজের সৃষ্টি সম্পর্কে আরও একটি অদ্ভুত ইসরাইলি কাহিনি প্রচলিত রয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে, হজরত আদম (আ.) একবার ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নদোষের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর বীর্য মাটিতে মিশে যাওয়ার ফলে ইয়াজুজ-মাজুজের সৃষ্টি হয়েছিল। এ ধরনের বক্তব্যের পক্ষে কুরআন কিংবা নির্ভরযোগ্য হাদিসে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

ইবনে কাসির (রহ.) এ ধরনের কাহিনিকে ভিত্তিহীন ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য জ্ঞান, যুক্তি কিংবা শরিয়তসম্মত দলিল নেই। ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বর্ণনা বা ভিত্তিহীন গল্পের ওপর নির্ভর করে আকিদাগত কোনো বিষয় প্রতিষ্ঠা করা যায় না। (মুহাম্মদ আবু শাহবাহ, আল-ইসরাইলিয়্যাত ওয়াল মাওদুআত ফি কুতুবিত তাফসির, পৃষ্ঠা ২৪৮)

অতএব, আদম (আ.)-এর বীর্য থেকে ইয়াজুজ-মাজুজের সৃষ্টি হওয়ার গল্পকে ইসলামের স্বীকৃত কোনো তথ্য হিসেবে প্রচার করা যাবে না।

৭. ইয়াজুজ-মাজুজের ভবিষ্যৎ আবির্ভাব সম্পর্কে সহিহ হাদিস কী জানায়?

ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাব ও তাদের পরিণতি সম্পর্কে সহিহ হাদিসে গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ রয়েছে। এসব বর্ণনা থেকে তাদের বিষয়ে নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত তথ্যগুলো জানা যায়।

হজরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) দাজ্জাল ও ঈসা (আ.)-এর অবতরণের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এরপর আল্লাহ তাআলা ঈসা (আ.)-কে জানাবেন যে, এমন এক সম্প্রদায়কে বের করে দেওয়া হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষমতা কারও নেই। তখন তিনি মুমিনদের নিয়ে তুর পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করবেন।

এরপর ইয়াজুজ-মাজুজ পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে।

হাদিসে এসেছে, তাদের প্রথম দলটি তাবারিয়া হ্রদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এর পানি পান করে ফেলবে। পরবর্তী দলটি এসে বলবে, এখানে একসময় পানি ছিল! এরপর ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। আল্লাহ তাদের ঘাড়ে একধরনের পোকা পাঠাবেন, যার আক্রমণে তারা সবাই একসঙ্গে মারা যাবে। পরে আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তাদের মৃতদেহ সরিয়ে ফেলবেন। (মুসলিম ২৯৩৭)

এ হাদিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—

وَيَمُرُّ أَوَّلُهُمْ عَلَى بُحَيْرَةِ طَبَرِيَّةَ فَيَشْرَبُونَ مَا فِيهَا

তাদের প্রথম দলটি তাবারিয়া হ্রদের পাশ দিয়ে অতিক্রম করবে এবং তাতে যা পানি রয়েছে, তা পান করে ফেলবে।

এটি ইয়াজুজ-মাজুজের বিপুল সংখ্যা ও ব্যাপক বিস্তারের একটি বর্ণনা। তবে তাদের সঠিক সংখ্যা কত, তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।

ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে কুরআন ও সহিহ হাদিসে যতটুকু তথ্য দেওয়া হয়েছে, একজন মুসলমানের জন্য ততটুকু বিশ্বাস করাই জরুরি। এর বাইরে তাদের দৈহিক গঠন, উচ্চতা, সংখ্যা কিংবা জীবনযাপন সম্পর্কে প্রচলিত প্রতিটি গল্পকে সত্য বলে গ্রহণ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

বিশেষ করে ১২০ হাত লম্বা ইয়াজুজ-মাজুজ, নিজেদের কানকে বিছানা ও কম্বল হিসেবে ব্যবহার করা কিংবা আদম (আ.)-এর বীর্য থেকে তাদের সৃষ্টি হওয়ার মতো কাহিনির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এসব বর্ণনার অনেকগুলো জাল, দুর্বল কিংবা ইসরাইলি সূত্র থেকে আসা।

আবার কয়েকটি বর্ণনা দুর্বল বা বানোয়াট প্রমাণিত হয়েছে বলে ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে সব হাদিস অস্বীকার করাও সঠিক নয়। প্রতিটি হাদিসের সনদ ও বক্তব্য আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। এমনকি কোনো বর্ণনার সনদ ভালো হলেও তার বক্তব্য নিয়ে মুহাদ্দিসদের সমালোচনা থাকতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, ধর্মীয় বিষয়ে বিস্ময়কর কোনো গল্প শুনলেই সেটিকে সত্য মনে করা যাবে না। বিশেষ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামে কোনো কথা প্রচার করার আগে তার গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করা প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা আমাদের কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান অর্জন করার, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বর্ণনা থেকে বেঁচে থাকার এবং সব ধরনের ফিতনা থেকে ইমানের সঙ্গে হেফাজত থাকার তেৌফিক দান করুন। আমিন।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

সুরা কাহফ তিলাওয়াতের ফজিলত ও ৪ শিক্ষণীয় ঘটনা

জুমার দিনের বিশেষ আমল সুরা কাহফ তিলাওয়াতের ফজিলত ও ৪ শিক্ষণীয় ঘটনা

জীবনের সংকট কাটাতে, রিজিকে বরকত পেতে ১০ আমল ও দোয়া

জীবনের সংকট কাটাতে, রিজিকে বরকত পেতে ১০ আমল ও দোয়া

জুমার আজানের পর দুনিয়াবি কাজ করা যাবে কি?

জুমার আজানের পর দুনিয়াবি কাজ করা যাবে কি?

ইমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণের প্রত্যাশা পূরণের আমল কী?

ইমানের সঙ্গে মৃত্যুবরণের প্রত্যাশা পূরণের আমল কী?

জুমার খুতবা দাঁড়িয়ে দেওয়াই কি আবশ্যক?

জুমার খুতবা দাঁড়িয়ে দেওয়াই কি আবশ্যক?

খুতবা ছাড়া কি জুমার নামাজ আদায় হবে?

খুতবা ছাড়া কি জুমার নামাজ আদায় হবে?

আরও পড়ুন

ইয়াজুজ-মাজুজ নিয়ে প্রচলিত কাহিনি: কোনটি সত্য আর কোনটি বানোয়াট?

ইয়াজুজ-মাজুজ নিয়ে প্রচলিত কাহিনি: কোনটি সত্য আর কোনটি বানোয়াট?

জুমার দিনের বিশেষ আমল সুরা কাহফ তিলাওয়াতের ফজিলত ও ৪ শিক্ষণীয় ঘটনা

সুরা কাহফ তিলাওয়াতের ফজিলত ও ৪ শিক্ষণীয় ঘটনা

জীবনের সংকট কাটাতে, রিজিকে বরকত পেতে ১০ আমল ও দোয়া

জীবনের সংকট কাটাতে, রিজিকে বরকত পেতে ১০ আমল ও দোয়া

জুমার আজানের পর দুনিয়াবি কাজ করা যাবে কি?

জুমার আজানের পর দুনিয়াবি কাজ করা যাবে কি?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম