Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

পর্তুগালের হৃদয়জয়ী মসজিদ: সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

পর্তুগালের হৃদয়জয়ী মসজিদ: সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক

লিসবন সেন্ট্রাল মসজিদ, পর্তুগাল। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইউরোপের পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত মনোরম দেশ পর্তুগাল। ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের জন্য যেমন দেশটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত, তেমনি রাজধানী লিসবনের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা লিসবন কেন্দ্রীয় মসজিদ (Mesquita Central de Lisboa) আজ ধর্মীয় উপাসনালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানবতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও আন্তধর্মীয় সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছে। অনন্য স্থাপত্য, শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং অসাধারণ মানবিক উদ্যোগের কারণে এই মসজিদ মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবার হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে।

সংগ্রামের পথ পেরিয়ে এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন

লিসবনে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মাণের স্বপ্নের সূচনা হয় ১৯৬৬ সালে। সে সময় পাঁচজন মুসলিম ও পাঁচজন অমুসলিম নাগরিকের একটি প্রতিনিধি দল মেয়রের কাছে মসজিদ নির্মাণের অনুমতি চাইলেও পৌরসভা তা প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে মোজাম্বিকসহ তৎকালীন পর্তুগিজ উপনিবেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিম শিক্ষার্থী লিসবনে আসতে শুরু করলে একটি কেন্দ্রীয় মসজিদের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১৯৭৩ সালের আরব তেলসংকটের পর মুসলিম বিশ্বের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। ১৯৭৭ সালে লিসবনের মেয়র মসজিদের জন্য জমি বরাদ্দ দেন এবং ১৯৭৮ সালে সরকার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করে। ১৯৭৯ সালে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং দীর্ঘ সাত বছরের প্রচেষ্টার পর ১৯৮৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় পর্তুগালের বৃহত্তম এই মসজিদ।

মসজিদ নির্মাণে সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, লিবিয়া, মিসর, পাকিস্তান ও ইরানসহ বিভিন্ন মুসলিম দেশ গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। বিশেষভাবে সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ খালিদ বিন আবদুল আজিজের উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য অনুদান আসে। ১৯৮১ সালে মসজিদের সম্মানে সংলগ্ন সড়কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রুয়া দা মস্কিতা’ (মসজিদ সড়ক)। পরবর্তীতে প্রিন্স সালমান বিন আবদুল আজিজ (বর্তমান বাদশাহ) কাবা শরিফের গিলাফের একটি অংশ উপহার দেন, যা আজও মসজিদের দেয়ালে সংরক্ষিত রয়েছে।

স্থাপত্যে ঐতিহ্য ও নান্দনিকতার অনন্য সমন্বয়

বিশিষ্ট স্থপতি আন্তোনিও মারিয়া ব্রাগা ও জোয়াও পাওলো কনসেইসাও-এর যৌথ নকশায় নির্মিত এই মসজিদে ইসলামি স্থাপত্যের ঐতিহ্য এবং পর্তুগিজ নকশার চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। সুউচ্চ মিনার, তিনটি দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ, সুসজ্জিত প্রার্থনাকক্ষ, অভ্যর্থনা হল, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং সুবিশাল অডিটরিয়াম—সব মিলিয়ে এটি এক নান্দনিক স্থাপত্যকীর্তি।

মসজিদের অভ্যন্তর আরবি ক্যালিগ্রাফি ও মনোমুগ্ধকর অলংকরণে সুশোভিত। একসঙ্গে এক হাজারেরও বেশি মুসল্লি এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। ২০১৫ সাল থেকে হাফেজ শায়খ ডেভিড মুনির এই মসজিদের প্রধান ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

মানবসেবায় এক আলোকবর্তিকা

ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হওয়ায় পর্তুগাল সরকার এই মসজিদকে কোনো আর্থিক অনুদান দেয় না। তবুও স্থানীয় মুসলিম সমাজ ও বিভিন্ন মুসলিম দেশের সহযোগিতায় এটি মানবসেবার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

২০১১ সাল থেকে প্রতি মাসে নির্ধারিত দিনে অসচ্ছল মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ করা হয়। বড়দিনের এক সপ্তাহ আগে থেকে প্রায় ২০০ জন অমুসলিম ও অভাবী মানুষের জন্য প্রতিদিন খাবার ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। সারা বছর দরিদ্র মানুষের মাঝে পোশাক বিতরণের কার্যক্রমও পরিচালিত হয়।

রমজান মাসে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার রোজাদারের জন্য বিনামূল্যে ইফতারের আয়োজন করা হয়, যা সামাজিক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

পরিবার ও সমাজের নির্ভরতার কেন্দ্র

এই মসজিদে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বিবাহ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি হালাল খাবারের সুব্যবস্থাসহ ভোজ আয়োজনের জন্য রয়েছে আধুনিক ডাইনিং হল। এছাড়া মরদেহ গোসল, জানাজা এবং পর্তুগাল সরকারের বরাদ্দ দেওয়া মুসলিম কবরস্থানে দাফনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাও এখান থেকে পরিচালিত হয়।

শিক্ষার আলো ছড়ানো পাঁচটি পাঠশালা

> লিসবন কেন্দ্রীয় মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থান নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কেন্দ্রও।

> এখানে শিশুদের জন্য আরবি ভাষা ও ইসলামি নৈতিকতা শিক্ষা, প্রাপ্তবয়স্কদের নৈশকালীন আরবি ভাষা কোর্স।

> নবমুসলিমদের জন্য বিশেষ ইসলামি শিক্ষা।

> নারীদের জন্য পৃথক আরবি ও ফিকহ শিক্ষা। এবং

> শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য কুরআন হিফজের পৃথক ক্লাস পরিচালিত হয়।

এসব শিক্ষা কার্যক্রমে মুসলিমদের পাশাপাশি বহু অমুসলিম শিক্ষার্থীও অংশগ্রহণ করেন, যা পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত

এই মসজিদের মূলনীতি— ‘দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।’ ইসলামের উদারতা ও মানবিক মূল্যবোধে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রতি মাসে দুই থেকে তিনজন মানুষ স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

পর্তুগালের নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিরা দায়িত্ব গ্রহণের পর এই মসজিদ পরিদর্শন করেন, যা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এর মর্যাদার প্রতীক। ২০০৮ সালে তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামাও এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। এটি ছিল তার জীবনের প্রথম কোনো মসজিদ সফর, যা তিনি তার অন্যতম স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

প্রতিবছর প্রায় নয় হাজার শিক্ষার্থী, গবেষক ও দর্শনার্থী এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। মুসলিম ও অমুসলিমদের মধ্যে সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ধারণা গড়ে তুলতে এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

লিসবন কেন্দ্রীয় মসজিদ শুধু পর্তুগালের বৃহত্তম মসজিদই নয়; এটি মানবিকতা, শিক্ষা, সামাজিক সম্প্রীতি এবং আন্তধর্মীয় সহাবস্থানের এক জীবন্ত প্রতীক। উপাসনার পাশাপাশি সমাজসেবা, জ্ঞানচর্চা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মাধ্যমে এটি প্রমাণ করেছে— একটি মসজিদ কেবল ইবাদতের স্থান নয়, বরং একটি আদর্শ সমাজ গঠনের প্রাণকেন্দ্রও হতে পারে। তাই লিসবনের এই ঐতিহাসিক মসজিদ আজ সত্যিই পর্তুগালের বুকে মানবতার এক উজ্জ্বল আলোকস্তম্ভ।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে আপত্তিকর ছবি চোখে পড়লে কি ওজু ভেঙে যাবে?

ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে আপত্তিকর ছবি চোখে পড়লে কি ওজু ভেঙে যাবে?

দেখতে কেমন ছিলেন আমাদের প্রিয় নবীজি

দেখতে কেমন ছিলেন আমাদের প্রিয় নবীজি

ভুলবশত নাপাক কাপড়ে একাধিক ওয়াক্তের নামাজ পড়লে কি তা আদায় হবে?

ভুলবশত নাপাক কাপড়ে একাধিক ওয়াক্তের নামাজ পড়লে কি তা আদায় হবে?

স্ত্রী দাম্পত্য অধিকার আদায় করতে না পারলে দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে কি?

স্ত্রী দাম্পত্য অধিকার আদায় করতে না পারলে দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে কি?

হারাম উপার্জনের টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ: শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ?

হারাম উপার্জনের টাকা দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ: শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু বৈধ?

যানবাহনে নামাজ আদায়ের সঠিক পদ্ধতি ও শরয়ি বিধান

যানবাহনে নামাজ আদায়ের সঠিক পদ্ধতি ও শরয়ি বিধান

আরও পড়ুন

ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে আপত্তিকর ছবি চোখে পড়লে কি ওজু ভেঙে যাবে?

ফেসবুক স্ক্রল করতে গিয়ে আপত্তিকর ছবি চোখে পড়লে কি ওজু ভেঙে যাবে?

দেখতে কেমন ছিলেন আমাদের প্রিয় নবীজি

দেখতে কেমন ছিলেন আমাদের প্রিয় নবীজি

ভুলবশত নাপাক কাপড়ে একাধিক ওয়াক্তের নামাজ পড়লে কি তা আদায় হবে?

ভুলবশত নাপাক কাপড়ে একাধিক ওয়াক্তের নামাজ পড়লে কি তা আদায় হবে?

স্ত্রী দাম্পত্য অধিকার আদায় করতে না পারলে দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে কি?

স্ত্রী দাম্পত্য অধিকার আদায় করতে না পারলে দ্বিতীয় বিয়ে করা যাবে কি?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম