সৌদি আরবের পতাকায় ‘পবিত্র কালেমা’ লেখা কেন?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম
সৌদি আরবের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের প্রতিটি স্বাধীন দেশের জাতীয় পতাকা সেই জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি, আদর্শ ও পরিচয়ের প্রতীক। তবে বিশ্বের সব জাতীয় পতাকার মধ্যে সৌদি আরবের পতাকা একেবারেই ব্যতিক্রম। গাঢ় সবুজ পটভূমিতে সাদা হরফে খচিত পবিত্র কালেমা তাইয়্যেবা এবং তার নিচে একটি সাদা তরবারি— এই অনন্য নকশা শুধু একটি রাষ্ট্রের পরিচয় নয়, বরং মুসলিম উম্মাহর ইমান, তাওহিদ ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
অনেকের ধারণা, বর্তমান সৌদি পতাকার নকশা কোনো একক ব্যক্তির সৃষ্টি। কিন্তু ইতিহাস বলছে, এটি একদিনে তৈরি হয়নি; বরং কয়েক শতকের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের রূপ লাভ করেছে।
প্রথম সৌদি রাষ্ট্র থেকেই কালেমার ব্যবহার
সৌদি পতাকায় কালেমা তাইয়্যেবা যুক্ত হওয়ার ইতিহাস শুরু হয় ১৭৪৪ সালে, যখন সৌদ পরিবারের সঙ্গে প্রখ্যাত ইসলামি সংস্কারক শেখ মুহাম্মদ ইবনে আবদিল ওয়াহাব-এর ঐতিহাসিক জোটের মাধ্যমে প্রথম সৌদি রাষ্ট্র (দিরিয়াহ আমিরাত) প্রতিষ্ঠিত হয়।
সে সময় শাসকদের রাজকীয় ব্যানার ছিল সবুজ রেশমের, যার মাঝখানে সাদা হরফে লেখা থাকত—
‘لا إله إلا الله محمد رسول الله’
‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসুল।’
কীভাবে যুক্ত হলো তরবারি?
১৯০২ সালে আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবন সৌদ রিয়াদ পুনর্দখল করে সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনা করেন। এ সময় তিনি পতাকার নিচে একটি আরবি তরবারি যুক্ত করার নির্দেশ দেন।
এরপর থেকে পতাকার প্রতিটি উপাদান একটি বিশেষ অর্থ বহন করে—
সবুজ রং: ইসলাম, সমৃদ্ধি ও সৌদি ঐতিহ্যের প্রতীক।
কালেমা তাইয়্যেবা: তাওহিদের ঘোষণা এবং ইসলামি শরিয়ত অনুসারে রাষ্ট্র পরিচালনার অঙ্গীকার।
সাদা তরবারি: ন্যায়বিচার, শক্তি, নিরাপত্তা ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
পরবর্তী সময়ে পতাকার নকশায় কয়েক দফা পরিবর্তন এলেও মূল ভাবধারা অপরিবর্তিত থাকে।
বর্তমান নকশা যেভাবে চূড়ান্ত হয়
ইতিহাসবিদদের মতে, বর্তমান সৌদি পতাকার নকশা কোনো একক ব্যক্তির সৃষ্টি নয়। বরং প্রথম সৌদি রাষ্ট্র থেকে শুরু করে এটি ধাপে ধাপে পরিমার্জিত হয়েছে।
১৯৩৭ সালে সৌদি শুরা কাউন্সিল জাতীয় পতাকার আনুষ্ঠানিক রূপরেখা নির্ধারণ করে, যা একই বছরের ১১ মার্চ বাদশাহ আবদুল আজিজ অনুমোদন করেন। এই দিনটিকে স্মরণ করে ২০২৩ সাল থেকে প্রতি বছর ১১ মার্চ 'জাতীয় পতাকা দিবস' হিসেবে পালন করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে বাদশাহ ফয়সালের শাসনামলে পতাকার অনুপাত, ক্যালিগ্রাফির ধরন এবং তরবারির অবস্থান আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়। বর্তমানে সেই নকশাই ব্যবহৃত হচ্ছে।
কেন এই পতাকা এত অনন্য?
সৌদি আরবের পতাকার সবচেয়ে বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি দ্বিমুখী (Double-sided) কাপড়ে তৈরি করা হয়। ফলে পতাকার যেকোনো দিক থেকেই তাকালে কালেমা সঠিকভাবে ডান থেকে বামে পড়া যায়। একইভাবে তরবারির অবস্থানও এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়, যাতে উভয় পাশ থেকেই এটি সঠিকভাবে দেখা যায়।
পতাকার ক্যালিগ্রাফি আরবি ছুলুছ (Thuluth) শৈলীতে লেখা, যা ইসলামি ক্যালিগ্রাফির অন্যতম নান্দনিক রূপ।
কেন সৌদি পতাকা কখনো অর্ধনমিত করা হয় না?
সৌদি আরবের জাতীয় পতাকায় পবিত্র কালেমা খচিত থাকায় এটিকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দেওয়া হয়। এ কারণে—
কোনো জাতীয় শোক, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যুতেও এই পতাকা কখনো অর্ধনমিত করা হয় না।
টি-শার্ট, জুতা, খেলাধুলার সামগ্রী কিংবা অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্যে এই পতাকার ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
পতাকাকে মাটিতে ফেলা, অপবিত্র স্থানে নেওয়া বা অসম্মানজনকভাবে ব্যবহার করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
সাধারণভাবে পতাকাটি উল্লম্বভাবে টাঙানো হয় না; প্রয়োজনে বিশেষ নকশায় কালেমা ও তরবারির অবস্থান পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়।
ফুটবলে সৌদি পতাকা ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক
২০০২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ উপলক্ষে সব দেশের পতাকা সংবলিত একটি ফুটবল তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে সৌদি আরব এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তাদের যুক্তি ছিল, পবিত্র কালেমা খচিত পতাকায় লাথি লাগা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে। পরে এই আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা কেবল একটি রাষ্ট্রের পরিচয়চিহ্ন নয়; এটি ইসলামি বিশ্বাস, তাওহিদের ঘোষণা এবং জাতীয় ইতিহাসের এক অনন্য প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিবর্তিত এই পতাকা আজও সৌদি রাষ্ট্রের আদর্শ, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে সম্মানের সঙ্গে উড়ছে। আর পবিত্র কালেমা খচিত হওয়ার কারণেই বিশ্বের জাতীয় পতাকাগুলোর মধ্যে এটি একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী।
আল-ওয়াতান ডটকম অবলম্বনে

