Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

গিবত বনাম সত্য কথা— পার্থক্যটা আসলে কোথায়?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৫ পিএম

গিবত বনাম সত্য কথা— পার্থক্যটা আসলে কোথায়?

গিবত বনাম সত্য বলা। ছবি: সংগৃহীত

Advertisement

ইসলামে কথা বলা একটি আমানত। প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি মন্তব্য এবং প্রতিটি সমালোচনার পেছনে রয়েছে নৈতিক ও শরিয়তের একটি সীমারেখা। কিন্তু বর্তমান সময়ে একটি বাক্য প্রায়ই শোনা যায়—‘আমি তো সত্য কথাই বলেছি।’ এই যুক্তির আড়ালে অনেক সময় মানুষের সম্মানহানি, বিদ্বেষ ছড়ানো এবং ব্যক্তিগত আঘাত লুকিয়ে থাকে। ফলে প্রশ্ন জাগে— সব সত্য কথা কি হক কথা? আর কোথায় গিয়ে সত্য কথা গিবতে পরিণত হয়?

ইসলাম এই প্রশ্নের খুব স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ উত্তর দিয়েছে। কুরআন, সহিহ হাদিস এবং ফিকহবিদদের ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়— সত্য বলা তখনই ইবাদত, যখন তা প্রয়োজন, শালীনতা ও উদ্দেশ্য-সঠিকতার সীমার মধ্যে থাকে।

গিবত কী?

গিবত (غيبة) অর্থ—কাউকে তার অনুপস্থিতিতে এমনভাবে উল্লেখ করা, যা সে শুনলে অপছন্দ করবে, যদিও তা সত্য হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে গিবতের সংজ্ঞা দেন এভাবে—

قِيلَ: أَرَأَيْتَ إِنْ كَانَ فِي أَخِي مَا أَقُولُ؟ قَالَ: إِنْ كَانَ فِيهِ مَا تَقُولُ فَقَدِ اغْتَبْتَهُ، وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فِيهِ فَقَدْ بَهَتَّهُ

‘যদি তার মধ্যে সেই দোষ থাকে তবে তুমি তার গিবত করলে, আর যদি না থাকে তবে তুমি তার ওপর অপবাদ (বুহতান) আরোপ করলে।’ মুসলিম ২৫৮৯, আবু দাউদ ৪৮৭৪, তিরমিজি ১৯৩৪)

অর্থাৎ, সত্য হলেও যদি তা অনুপস্থিত ব্যক্তির সম্মানহানির উদ্দেশ্যে বলা হয়, সেটিই গিবত।

কুরআনের দৃষ্টিতে গিবত

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَلَا يَغْتَب بَّعْضُكُم بَعْضًا ۚ أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَن يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا

‘তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে?’ (সুরা আল-হুজুরাত: আয়াত ১২)

এই আয়াতে গিবতকে মৃত মানুষের গোশত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—যা এর ভয়াবহতা ও নৈতিক জঘন্যতা প্রকাশ করে।

হাদিসে গিবতের ভয়াবহ চিত্র

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন—

مَرَرْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي عَلَى قَوْمٍ لَهُمْ أَظْفَارٌ مِنْ نُحَاسٍ يَخْمِشُونَ وُجُوهَهُمْ وَصُدُورَهُمْ

‘মেরাজের রাতে আমি এমন কিছু লোককে দেখলাম, যাদের নখ ছিল তামার, তারা নিজেদের মুখ ও বুক আঁচড়াচ্ছিল।’ জিবরাইল (আ.) বললেন,  ‘এরা সেই লোক, যারা মানুষের গোশত খেত (অর্থাৎ গিবত করত)।’ (আবু দাউদ ৪৮৭৮)

এটি গিবতের আখিরাতের ভয়াবহ শাস্তির একটি ইঙ্গিত।

সত্য কথা কি সবসময় গিবত নয়?

না। ইসলাম কখনো সত্য বলাকে নিষিদ্ধ করেনি। তবে উদ্দেশ্য, প্রয়োজন এবং প্রেক্ষাপট—এই তিনটি বিষয় এখানে মূল। ফকিহদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী গিবতের বাইরে কিছু বৈধ ক্ষেত্র রয়েছে—

১. জুলুম প্রতিরোধ ও বিচার চাওয়া

لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ إِلَّا مَن ظُلِمَ

‘আল্লাহ প্রকাশ্যে মন্দ কথা বলা পছন্দ করেন না, তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে তার কথা আলাদা।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১৪৮)

২. পরামর্শ ও সতর্কতা

প্রতারণাকারী বা ক্ষতিকর ব্যক্তির বিষয়ে সতর্ক করা বৈধ।

৩. দ্বীনি ভুল সংশোধন

যখন কেউ প্রকাশ্যে ভুল আকিদা বা বিভ্রান্তি ছড়ায়, তখন দলিলসহ তার ভুল সংশোধন করা জায়েজ— যদি উদ্দেশ্য হয় সংশোধন, অপমান নয়।

৪. পরিচয়ের প্রয়োজনে

যেমন— ‘অমুক অন্ধ ব্যক্তি’ বলা, যদি অন্যভাবে চেনানো না যায়।

ইমাম নববী (রহ.)-এর ব্যাখ্যা

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, মানুষের শরীর, চরিত্র, দ্বীন, পরিবার, পোশাক বা আচরণ নিয়ে এমন কিছু বলা, যা সে অপছন্দ করে—তা গিবত, এমনকি ইঙ্গিত বা ইশারার মাধ্যমেও।

আজকের যুগে এটি আরও বিস্তৃত—

ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব ভিডিও, ইনবক্স ফাঁস, মিম, স্ক্রিনশট— সবই গিবতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

সত্য কথা কখন গিবতে পরিণত হয়?

একটি সত্য কথা তখনই গিবত হয়ে যায়, যখন—

  • প্রয়োজন ছাড়াই বলা হয়
  • উদ্দেশ্য হয় অপমান বা বিদ্বেষ
  • ব্যক্তির সম্মান ক্ষুণ্ণ হয়
  • সংশোধনের পথ না খুঁজে প্রকাশ্যে অপদস্থ করা হয়

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—

مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ

‘যে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (বুখারি, মুসলিম)

আধুনিক যুগের গিবত

আজ গিবত শুধু মুখের কথায় সীমাবদ্ধ নয়। এর নতুন রূপগুলো হলো—

  • ব্যক্তিগত চ্যাট বা ইনবক্স প্রকাশ
  • স্ক্রিনশট ছড়িয়ে দেওয়া
  • ব্যঙ্গাত্মক মিম তৈরি
  • অডিও/ভিডিও কেটে ভাইরাল করা
  • সোশ্যাল মিডিয়ায় ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট

এসবও অনেক সময় সরাসরি গিবতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।

মূল কথা—

গিবত এবং সত্য কথার মূল পার্থক্য হলো উপস্থিতি এবং উদ্দেশ্য। সত্য কথা হলো যা বাস্তবে ঘটেছে তা প্রকাশ করা, আর গিবত হলো কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো সত্য দোষ বা দুর্বলতা আলোচনা করা, যা শুনলে সে কষ্ট পাবে। সত্য মিথ্যা হলে তা অপবাদ হয়, কিন্তু সত্য হলেও গিবত হতে পারে।

গিবত ও সত্য কথার তুলনামূলক পার্থক্য

সত্য কথা (সাধারণ): কোনো ব্যক্তির সামনে বা পেছনে তার ভালো কাজের প্রশংসা করা, গঠনমূলক সমালোচনা করা, বা সঠিক তথ্য তুলে ধরা।

গিবত (পরনিন্দা): কারো অনুপস্থিতিতে তার এমন কোনো দোষ বা গোপনীয়তা অন্যের কাছে বলা, যা সে জানলে অপছন্দ বা দুঃখিত হবে।

গিবত হয়ে গেলে করণীয়

  • আন্তরিক তওবা করা
  • আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া
  • যার গিবত করা হয়েছে, সম্ভব হলে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া
  • তার জন্য দোয়া করা ও ভালো কথা বলা

ইসলাম সত্যকে নিষিদ্ধ করেনি, কিন্তু সত্য ব্যবহারে দায়িত্বশীল হতে শিখিয়েছে। প্রতিটি সত্য কথা যেমন হক কথা নয়, তেমনি প্রতিটি সমালোচনাও দ্বীনি কাজ নয়। কথা বলার আগে একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হলো— উদ্দেশ্য, প্রয়োজন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষা আমাদের সামনে একটি সরল নীতি স্থাপন করে দিয়েছে— ‘ভালো কথা বলো, নতুবা চুপ থাকো।’

এই নীতি মানতে পারলেই সমাজ থেকে গিবতের বিষ দূর হবে এবং হৃদয়গুলো শান্তিতে ভরে উঠবে।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

ক্ষুধার্ত মানুষের তৃপ্তিময় হাসি যখন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

ক্ষুধার্ত মানুষের তৃপ্তিময় হাসি যখন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

ফরজ গোসলের সময় নাকের ভেতরে পানি কতদূর পৌঁছাতে হবে?

ফরজ গোসলের সময় নাকের ভেতরে পানি কতদূর পৌঁছাতে হবে?

ঋণ পরিশোধের ছোট্ট দোয়া

ঋণ পরিশোধের ছোট্ট দোয়া

মৃত্যুর চেয়েও যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর

মৃত্যুর চেয়েও যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর

‘আল্লাহ ভালো রেখেছেন’ এ কথা বলার শরয়ি বিধান কী?

‘আল্লাহ ভালো রেখেছেন’ এ কথা বলার শরয়ি বিধান কী?

ইসলামে যাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধন হারাম

ইসলামে যাদের সঙ্গে বিবাহ বন্ধন হারাম

আরও পড়ুন

ক্ষুধার্ত মানুষের তৃপ্তিময় হাসি যখন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

ক্ষুধার্ত মানুষের তৃপ্তিময় হাসি যখন শ্রেষ্ঠ ইবাদত

ফরজ গোসলের সময় নাকের ভেতরে পানি কতদূর পৌঁছাতে হবে?

ফরজ গোসলের সময় নাকের ভেতরে পানি কতদূর পৌঁছাতে হবে?

ঋণ পরিশোধের ছোট্ট দোয়া

ঋণ পরিশোধের ছোট্ট দোয়া

মৃত্যুর চেয়েও যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর

মৃত্যুর চেয়েও যেসব বিষয় সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম