ফরজ গোসলের সময় নাকের ভেতরে পানি কতদূর পৌঁছাতে হবে?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামি পরিচ্ছন্নতা ও পবিত্রতার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো গোসল। পবিত্রতা অর্জন ছাড়া অনেক ইবাদত, বিশেষ করে সালাত বা নামাজ আদায় সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক নিয়মের অজ্ঞতার কারণে আমাদের অনেকের মনেই পবিত্রতা নিয়ে নানা রকম অহেতুক সংশয় ও ভুল ধারণার জন্ম নেয়। বিশেষ করে ফরজ গোসলের সময় নাকে পানি পৌঁছানোর নির্দিষ্ট সীমানা নিয়ে অনেকেই দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন।
কেউ কেউ মনে করেন, নাকে জোরপূর্বক পানি টেনে মাথার তালু পর্যন্ত তুলতে হবে বা নাকের ভেতরে চরম ঝাঁজ না লাগলে বুঝি গোসল সম্পূর্ণ হবে না! তবে বাস্তবে আমাদের দ্বীন অত্যন্ত সহজ ও যুক্তিবান্ধব। শরিয়তের নির্দেশ অনুসরণ করে অহেতুক কষ্ট এড়ানোই ইসলামের সৌন্দর্য।
নাকের ‘মারিন’ বা নরম অংশ: ফিকহের নিখুঁত বিশ্লেষণ
ফরজ গোসলের তিনটি মৌলিক দাপের একটি হলো নাকে পানি দেওয়া বা নাকের ভেতরের অংশ ধৌত করা। কিন্তু এই পানি কতটুকু পৌঁছানো জরুরি, সে বিষয়ে ফিকহের স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে—
‘মারিন’ (المارن) কী?
ফিকহের পরিভাষায় ফরজ গোসলে নাকের যে সীমানায় পানি পৌঁছানো ফরজ, তাকে বলা হয় ‘মারিন’। ফুকাহায়ে কেরাম ও আরবি অভিধানবিদদের মতে, المارن: ما لان من الأنف وهو ما دون العظم—অর্থাৎ নাকের শক্ত হাড়ের নিচের অগ্রভাগের সম্পূর্ণ নরম অংশটুকুই হলো মারিন। মানবদেহের গঠন (এনাটমি) অনুযায়ীও নাকের সামনের এই অংশটি বেশ নরম ও নাড়ানো যায়, যার পরেই শক্ত হাড়ের শুরু।
পানি পৌঁছানোর সঠিক সীমানা
গোসলের সময় কেবল এই নরম অংশের ভেতরের পুরো ত্বকে পানি পৌঁছানো এবং সেখানে কোনো শুষ্ক ময়লা থাকলে তা পরিষ্কার করে পানি প্রবাহিত করা ফরজ।
ঝাঁজ লাগানোর প্রচলিত ভুল ধারণা
নাকের শক্ত হাড়ে বা মাথার তালুর দিকে পানি টেনে নেওয়া কিংবা জোরপূর্বক শ্বাস টেনে ভেতরে পানির তীব্র ঝাঁজ লাগানো কোনো অবস্থাতেই ফরজ বা ওয়াজিব নয়।
অতিরিক্ত পানি টানা বা ‘মুবালাগাহ্’ (المبالغة)-র বিধান
নাকের নরম অংশ অতিক্রম করে পেছনের শক্ত হাড়ের দিকে গভীরভাবে পানি পৌঁছানোকে শরীয়তের পরিভাষায় ‘মুবালাগাহ্’ (المبالغة) বা অতিরঞ্জন বলা হয়।
কখন এটি মুস্তাহাব?
ব্যক্তি যদি রোজা না রাখা অবস্থায় থাকে, তবে কেবল তখন নাকে গভীরভাবে পানি দেওয়া মুস্তাহাব (উত্তম), কিন্তু কখনোই ফরজ নয়।
শারীরিক ঝুঁকি এড়াতে শরিয়তের ছাড়
অনেকে অজ্ঞতাবশত শ্বাস দিয়ে তীব্র শক্তিতে পানি ওপরের দিকে টেনে নিয়ে ঝাঁজ লাগান, যা নাকের সূক্ষ্ম ঝিল্লি ও মস্তিষ্কের জন্য শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। শরিয়ত কখনোই মানুষকে এমন ক্ষতিকর কষ্টে নিপতিত করে না। নরম অংশে স্বাভাবিকভাবে পানি পৌঁছালেই গোসলের এই ফরজটি শতভাগ সঠিকভাবে আদায় হয়ে যায়।
নাকে পানি দেওয়া ও রোজাদারের ক্ষেত্রে সতর্কতা
নাক পরিষ্কার করা এবং অতিরিক্ত পানি টানার ক্ষেত্রে নবীজি (সা.) চমৎকার নির্দেশনা দিয়েছেন—
وَبَالِغْ فِي الاِسْتِنْشَاقِ إِلاَّ أَنْ تَكُونَ صَائِمًا
‘তুমি (অজু ও গোসলের সময়) গভীরভাবে নাকে পানি দাও, তবে যদি তুমি রোজাদার হও (তবে গভীর পানি টানা থেকে বিরত থাকো)।’ (আবু দাউদ ১৪২, তিরমিজি ৭৮৮)
ইসলামি শরিয়ত অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সহজ। গোসলের মতো দৈনন্দিন ইবাদতেও অজ্ঞতাজনিত অতিরঞ্জন বা জোরপূর্বক কষ্ট নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। নাকের কেবল সামনের নরম অংশে পানি পৌঁছে ভেতরে স্বাভাবিক ধৌত করাই ফরজ আদায়ের জন্য যথেষ্ট। অহেতুক মাথার দিকে পানি টেনে নিজের শারীরিক ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকাই দ্বীনের সঠিক জ্ঞান।
আসুন, মনের সংশয় ও ভুল ধারণা পেছনে ফেলে সঠিক ফিকহি নিয়ম জেনে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সহজ ও সুন্দরভাবে পবিত্রতা অর্জন করি। আল্লাহ আমাদের সকলকে সঠিক বুজ ও সুন্নাহ অনুসরণের তৌফিক দান করুন। আমিন।

