Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

মিসরের ইতিহাসে দুই ইউসুফের গল্প: কী তাদের পরিচয়?

Advertisement

Icon

ইসলাম ও জীবন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম

মিসরের ইতিহাসে দুই ইউসুফের গল্প: কী তাদের পরিচয়?

ছবি: উইকিপিডিয়া

Advertisement

ইতিহাসে বহু বিদেশি সেনাপতি, শাসক ও রাষ্ট্রনায়কের নাম আলোচিত। কিন্তু মিসরের ইতিহাসে এমন দুই ‘ইউসুফ’-এর কথা বিশেষভাবে স্মরণীয়, যারা ভিন্ন ভিন্ন যুগে বিদেশি হয়েও দেশটির ইতিহাসে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছেন। একজন ছিলেন আল্লাহর মনোনীত নবী হজরত ইউসুফ (আ.), অন্যজন মুসলিম বিশ্বের কিংবদন্তি শাসক সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)। তাদের যুগ, দায়িত্ব ও মর্যাদা সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও মিসরের ইতিহাসে দুজনই রচনা করেছেন অনন্য অধ্যায়।

প্রথম ইউসুফ: দুর্ভিক্ষ থেকে মিসরকে রক্ষা করা নবী

হজরত ইউসুফ (আ.) ছিলেন হজরত ইয়াকুব (আ.)-এর পুত্র। তার জন্ম কেনান অঞ্চলে, যা বর্তমান ফিলিস্তিনের অংশ। ভাইদের ষড়যন্ত্রে কূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর তিনি দাস হিসেবে মিসরে বিক্রি হন। এরপর দীর্ঘ পরীক্ষা, কারাবাস ও ধৈর্যের কঠিন পথ অতিক্রম করে তিনি নিজের প্রজ্ঞা, সততা এবং স্বপ্নের ব্যাখ্যার অসাধারণ দক্ষতার মাধ্যমে তৎকালীন শাসকের আস্থা অর্জন করেন।

পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি নিজেই দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যভাণ্ডারের দায়িত্ব গ্রহণের আবেদন জানান। তার দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে টানা সাত বছরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ থেকে শুধু মিসরই নয়, আশপাশের বহু অঞ্চলও রক্ষা পায়।

যদিও তিনি মিসরের বাদশাহ ছিলেন না, তবু রাজার অধীনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তার ন্যায়পরায়ণতা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য, সততা ও ক্ষমাশীলতা আজও মানবতার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।

দ্বিতীয় ইউসুফ: বিদেশি তরুণ থেকে মিসরের সুলতান

কয়েক শতাব্দী পরে মিসরের ইতিহাসে আবির্ভূত হন আরেক ‘ইউসুফ’। তার প্রকৃত নাম ছিল ইউসুফ ইবনে আইয়ুব। ইতিহাস তাকে চেনে ‘সালাহউদ্দিন আইয়ুবি’ নামে, যার অর্থ ‘দ্বীনের কল্যাণ’ বা ‘দ্বীনের সংস্কার’।

১১৩৭ বা ১১৩৮ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান ইরাকের তিকরিতে এক কুর্দি মুসলিম পরিবারে তার জন্ম। তার পিতা নাজমুদ্দিন আইয়ুব ছিলেন একজন সম্মানিত সামরিক কর্মকর্তা। পরবর্তীতে দামেস্কে তার শিক্ষা, চরিত্র গঠন এবং সামরিক জীবনের ভিত্তি নির্মিত হয়।

বিদেশি তরুণের মিসরের শীর্ষ নেতৃত্বে উত্থান

সে সময় মিসরে ফাতেমীয় শাসন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সিরিয়ার শাসক নূরুদ্দিন মাহমুদ জেনগির নির্দেশে সালাহউদ্দিন তার চাচা আসাদুদ্দিন শিরকুহর সঙ্গে মিসরে আসেন।

চাচার মৃত্যুর পর মাত্র ত্রিশের কোঠায় তিনি মিসরের ওয়াজির (প্রধানমন্ত্রী) নিযুক্ত হন। এরপর ১১৭১ সালে ফাতেমীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে আইয়ুবি সালতানাত প্রতিষ্ঠা করেন এবং মিসরের সুলতান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তলোয়ারের আগে ঐক্য

জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের আগে প্রায় এক দশক তিনি মুসলিম ভূখণ্ডে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠায় মনোনিবেশ করেন। মিসর, সিরিয়া ও আশপাশের অঞ্চলকে ধীরে ধীরে এক নেতৃত্বের অধীনে এনে তিনি বিশ্বাস করতেন— অভ্যন্তরীণ বিভক্তি দূর না করে বাইরের শক্তির বিরুদ্ধে স্থায়ী বিজয় অর্জন সম্ভব নয়। এই রাষ্ট্রদর্শনই পরবর্তীকালে তার সামরিক সাফল্যের দৃঢ় ভিত্তি হয়ে ওঠে।

নূরুদ্দিনের স্বপ্ন পূরণ

১১৮৭ সালের ঐতিহাসিক হিত্তিনের যুদ্ধে বিজয়ের পর সালাহউদ্দিন শান্তিপূর্ণভাবে জেরুজালেম পুনরুদ্ধার করেন। প্রায় ৯০ বছর পর মুসলমানরা আবারও পবিত্র নগরীর দায়িত্ব ফিরে পায়।

এই বিজয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তার শিক্ষক ও অভিভাবকতুল্য নূরুদ্দিন মাহমুদ জেনগির একটি অপূর্ণ স্বপ্ন। জেরুজালেম পুনরুদ্ধারের আশায় তিনি আগেই একটি দৃষ্টিনন্দন কাঠের মিম্বর নির্মাণ করিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় সেই স্বপ্ন পূরণ না হলেও সালাহউদ্দিন বিজয়ের পর মিম্বরটি মসজিদুল আকসায় স্থাপন করে তার গুরুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেন।

প্রতিশোধ নয়, মহানুভবতা

জেরুজালেম বিজয়ের পর সালাহউদ্দিনের আচরণ ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। প্রতিশোধের পথ না বেছে তিনি বহু মানুষকে নিরাপদে শহর ত্যাগের সুযোগ দেন।

তৃতীয় ক্রুসেড চলাকালে ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট অসুস্থ হলে তার জন্য বরফ ও তাজা ফল পাঠিয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। এমনকি রিচার্ডের ঘোড়া নিহত হলে তার জন্য দুটি উৎকৃষ্ট ঘোড়াও পাঠানো হয়। যুদ্ধের মাঝেও মানবিকতার এই অনন্য পরিচয় তাকে প্রতিপক্ষের কাছেও সম্মানিত করে তোলে।

জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষক

সালাহউদ্দিন শুধু একজন বিজেতাই ছিলেন না; তিনি ছিলেন জ্ঞানচর্চারও একজন বড় পৃষ্ঠপোষক। মিসরে সুন্নি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে তিনি বহু মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার আনেন। ফাতেমীয় যুগের অবসানের পর আল-আজহারও নতুন ধারায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায় এবং পরবর্তী সময়ে সুন্নি ইসলামি জ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়।

প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় বিদায়

১১৯৩ সালে তার মৃত্যুর সময় ব্যক্তিগত ভাণ্ডারে ছিল মাত্র একটি স্বর্ণমুদ্রা (দিনার) এবং অল্প কিছু রৌপ্যমুদ্রা (দিরহাম)। বিশাল মুসলিম সাম্রাজ্যের শাসক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ব্যক্তিগত বিলাস-সম্পদ সঞ্চয় করেননি। জীবনের অধিকাংশ সম্পদ ব্যয় করেছিলেন জনকল্যাণ, দান-সদকা এবং মানুষের সেবায়।

দুই ইউসুফ, এক অনন্য শিক্ষা

হজরত ইউসুফ (আ.) ও সালাহউদ্দিন আইয়ুবি (রহ.)—দুজনের পরিচয়, মর্যাদা ও দায়িত্ব এক নয়। একজন ছিলেন আল্লাহর মনোনীত নবী, অন্যজন ছিলেন একজন ন্যায়পরায়ণ মুসলিম শাসক। তাই তাদের মধ্যে মর্যাদাগত তুলনার কোনো সুযোগ নেই।

তবে ইতিহাসের এই দুই ইউসুফ আমাদের একটি অভিন্ন সত্যের শিক্ষা দেন— জন্মস্থান নয়; বরং ইমান, সততা, প্রজ্ঞা, ধৈর্য, ন্যায়বিচার এবং আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থাই একজন মানুষকে ইতিহাসে এবং মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী মর্যাদা এনে দেয়।

তথ্যসূত্র: সুরা ইউসুফ; বাহাউদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ; অ্যামিন মালুফ; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা; ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি এনসাইক্লোপিডিয়া; ইবনুল আসির।

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

সৌদিকে সামরিক সহায়তা দিতে মিসরের পার্লামেন্টের অনুমোদন

সৌদিকে সামরিক সহায়তা দিতে মিসরের পার্লামেন্টের অনুমোদন

একসঙ্গে ১৪টি চুম্বক গিলে ফেলেছিল কিশোরী, অতঃপর...

একসঙ্গে ১৪টি চুম্বক গিলে ফেলেছিল কিশোরী, অতঃপর...

যেকোনো পরিস্থিতিতে সৌদির পাশে থাকার ঘোষণা মিসরের

যেকোনো পরিস্থিতিতে সৌদির পাশে থাকার ঘোষণা মিসরের

মিসরের ক্ষমতা আঁকড়ে না থাকার ঘোষণা সিসির, কবে বিদায় নেবেন?

মিসরের ক্ষমতা আঁকড়ে না থাকার ঘোষণা সিসির, কবে বিদায় নেবেন?

এবার সৌদিকে সামরিক সহায়তায় প্রস্তুত মিসর

এবার সৌদিকে সামরিক সহায়তায় প্রস্তুত মিসর

৭ অক্টোবরের হামলার ১১ দিন আগে ইসরাইল সফরে এসেছিলেন মিশরের গোয়েন্দাপ্রধান: নেতানিয়াহু

৭ অক্টোবরের হামলার ১১ দিন আগে ইসরাইল সফরে এসেছিলেন মিশরের গোয়েন্দাপ্রধান: নেতানিয়াহু

আরও পড়ুন

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

শেষ রাতের যে ৫ আমল বদলে দিতে পারে জীবন

শেষ রাতের যে ৫ আমল বদলে দিতে পারে জীবন

ধূমপানের কারণে কি অজু ভেঙে যায়?

ধূমপানের কারণে কি অজু ভেঙে যায়?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম