Logo
Logo
×

Advertisement

ইসলাম ও জীবন

মদীনার প্রথম জুমা, যে যুবকের হাত ধরে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল অলি-গলিতে

Advertisement

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম

মদীনার প্রথম জুমা, যে যুবকের হাত ধরে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল অলি-গলিতে

Advertisement

মক্কার বিলাসী জীবন ছেড়ে এক তরুণ কুরাইশ যুবক যেদিন ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, সেদিন হয়তো কেউ ভাবেননি যে তিনিই একদিন হয়ে উঠবেন নবুওয়াতের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক দূত। 

মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) মক্কার সবচেয়ে সুদর্শন, সবচেয়ে সুরুচিসম্পন্ন এবং সবচেয়ে ধনী পরিবারের সন্তানদের একজন ইসলামের জন্য নিজের সব বিলাসিতা, পারিবারিক স্নেহ ও সামাজিক মর্যাদা বিসর্জন দিয়েছিলেন। তার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায়টি রচিত হয় মদীনায়, যেখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করে পৌঁছানোর আগেই তিনি মুসলিমদের নিয়ে ইতিহাসের প্রথম জুমার নামাজ আদায় করেছিলেন।

বিলাসিতা থেকে ত্যাগের পথে

মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) এর জন্ম মক্কার কুরাইশ বংশের বনু আবদুদ দার শাখায়, ৬১৪ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন বলে সিরাত গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায়। ধনাঢ্য পরিবারে বেড়ে ওঠা এই যুবকের আরাম-আয়েশের কোনো কমতি ছিল না। 

সিরাতবিদ ওয়াকিদির বর্ণনা অনুসারে, মক্কার তরুণ সমাজে সৌন্দর্য, রুচিশীলতা ও প্রজ্ঞার দিক থেকে মুসআবের সমকক্ষ আর কেউ ছিল না। কিন্তু নবীজি (সা.) এর দাওয়াতের কথা শুনে তিনি গোপনে দারুল আরকামে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। 

এই সিদ্ধান্তের মূল্য তাকে দিতে হয়েছিল কঠোরভাবে। তার মা, যিনি ছেলের ইসলাম গ্রহণের কথা জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন, তাকে পারিবারিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত করেন। 

রাতারাতি এক বিলাসী যুবক পরিণত হন দরিদ্র, ছেঁড়া পোশাক পরিহিত এক মুসাফিরে। সিরাতের বর্ণনামতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও একদিন মুসআবের জীর্ণ পোশাক দেখে সাহাবিদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, এই সেই যুবক, যাকে মক্কায় সবচেয়ে সুন্দর পোশাকে দেখা যেত।

মদীনায় ইসলামের প্রথম দূত

আকাবার প্রথম শপথের পর মদীনার কিছু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে মক্কায় ফিরে আসেন এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অনুরোধ করেন, যেন কাউকে মদীনায় পাঠিয়ে নতুন মুসলিমদের কুরআন শিক্ষা দেওয়া হয় এবং ইসলামের বার্তা আরও বিস্তৃত করা হয়। 

সিরাত প্রণেতা ইবনে ইসহাকের বর্ণনা অনুযায়ী, এই গুরুদায়িত্বের জন্য নবীজি (সা.) বেছে নেন মুসআব ইবনে উমাইরকে (রা.) এবং প্রথম আকাবার শপথে অংশগ্রহণকারী মদীনাবাসী সাহাবিদের সঙ্গে তাকে পাঠিয়ে দেন। বয়সে তরুণ হলেও তার জ্ঞান, ধৈর্য ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা তাকে এই দায়িত্বের জন্য উপযুক্ত করে তুলেছিল। 

এভাবেই তিনি পরিচিতি পান ইসলামের ইতিহাসের প্রথম প্রেরিত দাঈ বা রাষ্ট্রদূত হিসেবে।

মদীনায় পৌঁছে মুসআব (রা.) থাকতে শুরু করেন আসআদ ইবনে যুরারা (রা.) বাড়িতে, যিনি নিজেও ছিলেন মদীনায় ইসলাম প্রচারের প্রথম দিককার একজন কর্মী। সেখান থেকে তিনি ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। তার সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে তখন, যখন বনু আবদুল আশহাল গোত্রের দুই প্রভাবশালী নেতা সাদ ইবনে মুআয ও উসাইদ ইবনে হুদাই (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। 

কথিত আছে, উসাইদ প্রথমে ক্ষুব্ধ হয়ে মুসআবকে (রা.) থামাতে এসেছিলেন, কিন্তু তার বিনয়ী ব্যবহার ও কুরআনের বাণী শুনে নিজেই ইসলাম গ্রহণ করেন। এই দুই নেতার ইসলাম গ্রহণের পর মদীনার আরও অসংখ্য মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করতে শুরু করে।

ইতিহাসের প্রথম জুমা

মুসআব (রা.) মদীনা মিশনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর হিজরতের আগেই। মদীনায় মুসলিমদের সংখ্যা যখন যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়, তখন সেখানে সম্মিলিত সাপ্তাহিক নামাজের প্রচলন শুরু হয়। 

সিরাতগ্রন্থগুলোতে এ বিষয়ে দুটি প্রধান বর্ণনা পাওয়া যায়। একদল ইতিহাসবিদের মতে মদীনায় প্রথম জুমার নামাজের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আসআদ ইবনে যুরারা (রা.), যার বাড়িতে মুসআব (রা.) অবস্থান করতেন এবং যিনি ছিলেন মদীনার প্রাথমিক দাওয়াতী কাজের অন্যতম সহযোগী। 

অন্য একটি বর্ণনা অনুযায়ী মদীনায় সর্বপ্রথম জুমার নামাজ কায়েম করেছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর বিশেষ প্রতিনিধি মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)। এই দ্বিতীয় বর্ণনার ভিত্তিতেই তাকে ইতিহাসে মদীনার প্রথম জুমার ইমাম হিসেবে স্মরণ করা হয়, যা ঘটেছিল রাসুলুল্লাহ (সা.) এর নিজ শহরে পৌঁছানোরও আগে।

কোনো বর্ণনা অনুযায়ী নেতৃত্ব যিনিই দিয়ে থাকুন না কেন, ঘটনাটির তাৎপর্য একই থেকে যায়। এটি শুধু একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং মদীনায় গড়ে ওঠা নবীন মুসলিম সমাজের সাংগঠনিক শক্তি ও ঐক্যের প্রথম প্রকাশ্য প্রদর্শনী। 

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে উপস্থিত না থেকেও তার প্রেরিত প্রতিনিধির হাত ধরে যে সংগঠিত ইবাদত মদীনায় প্রতিষ্ঠিত হলো, তা প্রমাণ করে মুসআব (রা.) এর ওপর নবীজি (সা.) এর আস্থা কতটা গভীর ছিল।

উহুদের প্রান্তরে চূড়ান্ত আত্মত্যাগ

হিজরতের পর মুসআব (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) এর ঘনিষ্ঠ সাহাবিদের একজন হয়ে ওঠেন এবং বদরের যুদ্ধেও অংশ নেন। কিন্তু তার জীবনের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী অধ্যায় রচিত হয় উহুদের যুদ্ধে। সেই যুদ্ধে তিনি ছিলেন মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহী। 

যুদ্ধের এক পর্যায়ে যখন শত্রুপক্ষ রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দিকে ধেয়ে আসে, তখন মুসআব (রা.) নিজের জীবন দিয়ে নবীজিকে (সা.) রক্ষা করার চেষ্টা করেন। একের পর এক আঘাতে তার দুই হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তবুও তিনি পতাকা মাটিতে পড়তে দেননি, বুক দিয়ে আঁকড়ে ধরে রাখেন। শেষ পর্যন্ত শাহাদাত বরণ করেন তিনি।

তার মৃত্যুর পর সাহাবিরা তাকে কাফন দেওয়ার জন্য একটি চাদরও পর্যাপ্ত পাননি এত ছোট চাদর ছিল যে তা দিয়ে মাথা ঢাকলে পা খোলা থাকত, আর পা ঢাকলে মাথা। 

এই দৃশ্য দেখে রাসুলুল্লাহ (সা.)  গভীর বেদনায় স্মরণ করিয়ে দেন, একদিন মক্কায় এই মানুষটির চেয়ে সুবেশী কেউ ছিল না, অথচ আজ তার কাফনের কাপড়টুকুও পর্যাপ্ত নয়।

ইতিহাসে যে উত্তরাধিকার রেখে গেলেন

মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) জীবন ইসলামের ইতিহাসে দাওয়াত ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, বংশমর্যাদা বা বয়স নয়, বরং জ্ঞান, বিনয় ও নিষ্ঠাই একজন মানুষকে ইতিহাস বদলে দেওয়ার যোগ্যতা দিতে পারে। 

মদীনায় তার নিরলস দাওয়াতী প্রচেষ্টাই পরবর্তীতে হিজরতের পথ সুগম করেছিল এবং সেখানে প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি রচনা করেছিল। আজও মুসলিম বিশ্বে তাকে স্মরণ করা হয় এক আদর্শ দাঈ, একনিষ্ঠ সৈনিক এবং আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে।

তথ্যসূত্র: ইবনে ইসহাকের সিরাতুন্নবী, ইমাম ওয়াকিদির কিতাবুল মাগাজি, ইবনে সাদের আত-তাবাকাতুল কুবরা, এবং ইবনে হিশামের আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ। 

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর

Advertisement

Advertisement

সম্পর্কিত খবর

১০ বছর বয়সের পর দুই ভাই-বোন কি একই বিছানায় ঘুমাতে পারবে?

১০ বছর বয়সের পর দুই ভাই-বোন কি একই বিছানায় ঘুমাতে পারবে?

নবীজিকে (সা.) ভালোবাসার উপায়, যাতে পূর্ণতা পায় ইমান

নবীজিকে (সা.) ভালোবাসার উপায়, যাতে পূর্ণতা পায় ইমান

দেখতে কেমন ছিলেন আমাদের প্রিয় নবীজি

দেখতে কেমন ছিলেন আমাদের প্রিয় নবীজি

শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কায় নবীজি (সা.) যে দোয়া পড়তেন

শত্রুর আক্রমণের আশঙ্কায় নবীজি (সা.) যে দোয়া পড়তেন

জুমার নামাজের কোনো রাকাত না পেলে কি চার রাকাত পড়তে হবে?

জুমার নামাজের কোনো রাকাত না পেলে কি চার রাকাত পড়তে হবে?

মুহূর্তেই নবীজির (সা.) দোয়া কবুলের বিস্ময়কর ঘটনা

মুহূর্তেই নবীজির (সা.) দোয়া কবুলের বিস্ময়কর ঘটনা

আরও পড়ুন

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

ইমামের আগে দাঁড়ালে কি মুক্তাদির নামাজ হবে?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? ইসলামের বিধান কী?

শেষ রাতের যে ৫ আমল বদলে দিতে পারে জীবন

শেষ রাতের যে ৫ আমল বদলে দিতে পারে জীবন

ধূমপানের কারণে কি অজু ভেঙে যায়?

ধূমপানের কারণে কি অজু ভেঙে যায়?

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম