খেলায় হার-জিত নয়, আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টিই মুমিনের পরিচয়: মুফতি মেন্ক
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১০:১৩ পিএম
ড. মুফতি ইসমাইল ইবনে মুসা মেন্ক। ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
খেলাধুলা মানুষের বিনোদন, সুস্থ প্রতিযোগিতা এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধির একটি মাধ্যম। কিন্তু কখনো কখনো এই আনন্দই উন্মাদনা, বিদ্বেষ ও সংঘাতের রূপ নেয়। প্রিয় দলের হার-জিতে সম্পর্ক নষ্ট হয়, সৃষ্টি হয় তর্ক-বিতর্ক, এমনকি সহিংসতাও। এমন বাস্তবতায় বিশ্বখ্যাত ইসলামি চিন্তাবিদ ও দাঈ ড. মুফতি ইসমাইল ইবনে মুসা মেন্ক (মুফতি মেন্ক) মুসলমানদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন— একজন মুমিনের পরিচয় হলো আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, ধৈর্য ধারণ করা এবং জীবনের ছোট-বড় সব পরিস্থিতিতে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলা।
ড. মুফতি ইসমাইল ইবনে মুসা মেন্ক, যিনি মুফতি মেন্ক নামে অধিক পরিচিত, একজন খ্যাতিমান মুসলিম শিক্ষাবিদ, ইসলামি বক্তা ও দাঈ। তিনি জিম্বাবুয়ের প্রধান মুফতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জর্ডানের রয়্যাল আল আল-বাইত ইনস্টিটিউট ফর ইসলামিক থট ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৭ সালে তাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ৫০০ মুসলমানের অন্যতম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।
সম্প্রতি জুমার পূর্বের এক আলোচনায় আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে তিনি খেলাধুলার হার-জিত নিয়ে অতিরিক্ত আবেগ, উত্তেজনা ও বিবাদে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। ১৭ জুলাই ২০২৬ তার ভেরিফায়েড ইউটিউব চ্যানেলে ‘Why Did Allah Do This?’ শিরোনামে বক্তব্যটি প্রকাশিত হয়। নিচে তার বক্তব্যের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো—
আল্লাহর কাছেই সব চাওয়া
মুফতি মেন্ক বলেন, ‘আপনার যা কিছু প্রয়োজন, আল্লাহর কাছেই চান। জান্নাত চান, রিজিক চান, সুস্থতা চান, বিয়ে করতে চান কিংবা চাকরি চান—সবকিছুর জন্য একমাত্র আল্লাহর দরজায় কড়া নাড়ুন। তিনি চাইলে অবশ্যই তা দান করবেন। আর যদি কোনো কিছু পেতে বিলম্ব হয়, তবে বুঝতে হবে এর পেছনে এমন কোনো কল্যাণ রয়েছে, যা আপনি এখনো জানেন না। হয়তো পরবর্তীতে আল্লাহ আপনাকে বুঝিয়ে দেবেন কেন তিনি সেটি বিলম্বিত করেছিলেন। আল্লাহর সঙ্গে যার সম্পর্ক দৃঢ়, সে প্রতিটি অবস্থাতেই তার প্রশংসা করে এবং কৃতজ্ঞ থাকে।’
প্রতিটি বিলম্বেই থাকে কল্যাণ
তিনি বলেন, ‘আরবিতে একটি সুন্দর প্রবাদ রয়েছে— প্রত্যেক বিলম্বের মধ্যেই কোনো না কোনো কল্যাণ নিহিত থাকে। এমন অনেক ভালো বিষয় সেখানে লুকিয়ে থাকে, যা মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না। ধরুন— আপনি একটি ফ্লাইট মিস করলেন। অধিকাংশ মানুষ তখন ক্ষোভে নানা আপত্তিকর কথা বলে। কিন্তু একজন মুমিনের মুখে থাকবে শুধু একটি বাক্য— ‘আলহামদুলিল্লাহ’।’
খেলায় হার-জিত নিয়ে বিভেদ নয়
মুফতি মেন্ক আরও বলেন, ‘ধরা যাক, আপনার প্রিয় দল খেলায় হেরে গেছে। তখনও বলুন, ‘মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ।’ যে দলই জিতুক বা হারুক, আল্লাহর প্রশংসা করুন। কারণ এটি কেবল একটি খেলা।
খেলায় আবেগ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই আবেগ যেন কখনো ঘৃণা, শত্রুতা কিংবা দাঙ্গা-হাঙ্গামায় রূপ না নেয়। কোনো দলের সমর্থনের কারণে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করবেন না।
আর কখনো বলবেন না— ‘আল্লাহ কেন আমার দলকে হারালেন? বাস্তবতা হলো, সেদিন তারা ভালো খেলতে পারেনি কিংবা প্রতিপক্ষই ভালো ছিল। এটিই স্বাভাবিক।’
আল্লাহকে কখনো দোষ দেওয়া নয়
তিনি বলেন, ‘জীবনে যা-ই ঘটুক না কেন, আল্লাহকে কখনো দোষ দেবেন না। বরং তার ফয়সালাকে মেনে নিন। একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনে প্রকৃত অর্থে কোনো অকল্যাণ নেই। সুখ এলে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে—এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর কষ্ট এলে ধৈর্য ধারণ করে—এটিও তার জন্য কল্যাণকর ও উত্তম।’
ধৈর্যের প্রতিদান সীমাহীন
মুফতি মেন্ক বলেন, ‘যারা কঠিন পরিস্থিতিতেও ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাদের জন্য হিসাবহীন প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন। তিনি মানুষের অন্তরের সব কষ্ট ও সংগ্রাম সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। আল্লাহ আমাদের সবার পথ সহজ করে দিন, আমাদের জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দিন এবং ইহকাল ও পরকালের সর্বোত্তম কল্যাণ দান করুন। আমিন।’
কুরআনের আলোকে
১. আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি ও ধৈর্য
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
‘ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা বিপদে পতিত হলে বলে, নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয়ই তাঁর কাছেই ফিরে যাব।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৫–১৫৬)
২. আল্লাহর সিদ্ধান্তের পেছনে কল্যাণ থাকে
وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ
‘হতে পারে তোমরা কোনো একটি বিষয় অপছন্দ করছ, অথচ সেটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২১৬)
৩. ধৈর্যশীলদের জন্য সীমাহীন প্রতিদান
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
‘ধৈর্যশীলদের প্রতিদান অবশ্যই পূর্ণরূপে, হিসাবহীনভাবে দেওয়া হবে।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ১০)
হাদিসের আলোকে
১. মুমিনের প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ لَهُ خَيْرٌ...
‘মুমিনের অবস্থা সত্যিই বিস্ময়কর। তার প্রতিটি বিষয়ই তার জন্য কল্যাণকর। সুখ এলে সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে—এটি তার জন্য কল্যাণকর। আর কষ্ট এলে সে ধৈর্য ধারণ করে—এটিও তার জন্য কল্যাণকর।’ (মুসলিম ২৯৯৯)
২. শক্তিশালী মুমিন হতাশ না হয়ে আল্লাহর সাহায্য কামনা করে
احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجِزْ
‘যা তোমার উপকারে আসে, তা অর্জনে সচেষ্ট হও। আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা কর এবং কখনো দুর্বলতা বা হতাশা প্রকাশ কর না।’ (মুসলিম ২৬৬৪)
একজন মুসলমানের জীবনের সৌন্দর্য কেবল ইবাদতে নয়, বরং প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহর প্রতি আস্থা, সন্তুষ্টি ও কৃতজ্ঞতায় প্রকাশ পায়। খেলাধুলা আনন্দের জন্য, বিভেদ সৃষ্টির জন্য নয়। কোনো দলের জয়-পরাজয় আমাদের ঈমান, চরিত্র বা পারস্পরিক সম্পর্কের চেয়ে বড় হতে পারে না। তাই খেলার মাঠে যেমন সুন্দর প্রতিযোগিতা থাকবে, তেমনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই থাকবে ধৈর্য, শোকর, ভ্রাতৃত্ব ও আল্লাহর ফয়সালার প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্টি। এটাই একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার অন্যতম ভিত্তি।

