সন্তানকে ত্যাজ্য করা ও হেবা করা সম্পত্তি ফেরত নেওয়া যাবে কী?
Advertisement
ইসলাম ও জীবন ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:১১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলাম একটি ন্যায়ভিত্তিক ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এতে বাবা-মা ও সন্তানের অধিকার এবং সম্পর্কের পারস্পরিক মর্যাদা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক সময় পারিবারিক টানাপোড়েন বা সন্তানের অবাধ্যতার কারণে বাবা অতিষ্ঠ হয়ে সন্তানকে 'ত্যাজ্যপুত্র' ঘোষণা করেন কিংবা পূর্বে হেবা বা দান করা সম্পত্তি ফিরিয়ে নিতে চান। কিন্তু আবেগ বা ক্ষোভের বশে নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে কতটুকু গ্রহণযোগ্য?
আসুন, কুরআন, হাদিস ও প্রখ্যাত ফিকহগ্রন্থের আলোকে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বিষয়টি জেনে নিই—
১. হেবা বা দানকৃত সম্পত্তি কি সন্তান থেকে ফেরত নেওয়া যাবে?
যদি কোনো বাবা সুস্থ মস্তিষ্কে ও নিজ ইচ্ছায় তার কোনো সম্পত্তি সন্তানকে পূর্ণভাবে হেবা (দান) করে দেন এবং সম্পত্তিটি সন্তান হস্তগত বা দখলভুক্ত করে নেয়, তবে সন্তান পরবর্তীতে অবাধ্য বা খারাপ আচরণ করলেও বাবা সেই হেবা আর ফেরত নিতে পারেন না। ইসলামি শরিয়তে কোনো কিছু দান করার পর তা ফেরত নেওয়া অত্যন্ত গর্হিত ও নিন্দনীয় কাজ।
নবিজি (সা.)-এর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি
দান করা বস্তু ফেরত নেওয়ার নিকৃষ্টতা বোঝাতে নবিজি (সা.) কঠোর উপমা দিয়েছেন—
العَائِدُ فِي هِبَتِهِ كَالعَائِدِ فِي قَيْئِهِ
‘যে ব্যক্তি কাউকে দান করার পর তা আবার ফেরত নেয়, সে ওই ব্যক্তির মতো যে বমি করে আবার তা ভক্ষণ করে।’ (বুখারি ২৬২১)
সাহাবিদের ফয়সালা
হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তার খেলাফতকালে এ বিষয়ে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিয়ে বলেন— ‘যে ব্যক্তি তার কোনো নিকটাত্মীয়কে (যাদের সঙ্গে বিবাহ চিরতরে হারাম, যেমন সন্তান) কোনো কিছু হেবা করে দেয়, তার জন্য তা আর ফেরত নেওয়ার কোনো অধিকার নেই।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ ২১৭৫৮)
হেবা ফেরত না নেওয়ার ফিকহি আইনি ভিত্তি
হানাফি ফিকহের প্রামাণিক ও নির্ভরযোগ্য বিশ্বকোষগুলোতে রক্তসম্পর্কীয় মাহরাম আত্মীয়কে দেওয়া হেবা ফেরত না নেওয়ার মূলনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগিনানি (রহ.) তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ 'আল-হেদায়া'-তে লিখেছেন—
وَإِنْ وَهَبَ هِبَةً لِذِي رَحِمٍ مَحْرَمٍ مِنْهُ فَلَا رُجُوعَ فِيهَا، لِقَوْلِهِ عَلَيْهِ السَّلَامُ: "إِذَا كَانَتِ الْهِبَةُ لِذِي رَحِمٍ مَحْرَمٍ مِنْهُ لَمْ يَرْجِعْ فِيهَا"؛ وَلِأَنَّ الْمَقْصُودَ فِيهَا صِلَةُ الرَّحِمِ وَقَدْ حَصَلَتْ، وَكَذَلِكَ مَا وَهَبَ أَحَدُ الزَّوْجَيْنِ لِلْآخَرِ
‘যদি কেউ এমন কোনো রক্তসম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়কে দান করে যার সঙ্গে তার বিবাহ চিরতরে নিষিদ্ধ (মাহরাম, যেমন সন্তান), তবে সে আর তা ফিরিয়ে নিতে পারবে না। কারণ রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন দান এমন মাহরাম আত্মীয়কে করা হয়, তখন তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।’ তাছাড়া এই দানের মূল উদ্দেশ্যই ছিল আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা, যা চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমেই অর্জিত হয়ে গেছে। ঠিক তেমনি স্বামী-স্ত্রীর একজন অপরজনকে যা দান করে, তাও ফেরত নেওয়া যায় না।’
ইমাম ইবনে নুজাইম আল-মিশরি (রহ.) হেবা ফেরত না নেওয়ার প্রতিবন্ধকতাগুলো (موانع الرجوع) আলোচনা করতে গিয়ে 'আল-বাহরুর রায়েক' কিতাবে উল্লেখ করেন—
وَالْقَافُ الْقَرَابَةُ فَلَوْ وَهَبَ لِذِي رَحِمٍ مَحْرَمٍ مِنْهُ لَا يَرْجِعُ، لِحَدِيثِ الْحَاكِمِ مَرْفُوعًا: "إِذَا كَانَتِ الْهِبَةُ لِذِي رَحِمٍ مَحْرَمٍ لَمْ يَرْجِعْ فِيهَا" وَصَحَّحَهُ وَقَالَ عَلَى شَرْطِ الشَّيْخَيْنِ
‘ক্বাফ (ق) বর্ণ দ্বারা ‘কারাবাত’ বা নিকটাত্মীয়তা বোঝানো হয়েছে। সুতরাং কেউ যদি মাহরাম আত্মীয়কে দান করে, সে তা আর ফিরিয়ে নিতে পারবে না। এর প্রমাণ ইমাম হাকিম কর্তৃক মারফু সূত্রে বর্ণিত হাদিস— ‘যখন দান কোনো মাহরাম আত্মীয়কে করা হয়, তখন তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না।’ ইমাম হাকিম হাদিসটিকে বুখারি ও মুসলিমের মানদণ্ডে সহিহ বলেছেন।’
উপমহাদেশের সর্বজনগ্রাহ্য ফিকহগ্রন্থ 'ফাতাওয়া হিন্দিয়া'-তে বলা হয়েছে—
وَمِنْهَا الْقَرَابَةُ النَّسَبِيَّةُ فِي مَحْرَمٍ فَلَا رُجُوعَ فِي الْهِبَةِ لِلْوَلَدِ وَإِنْ سَفَلَ وَلِلْآبَاءِ وَالْأُمَّهَاتِ وَإِنْ عَلَوْا
‘হেবা ফেরত না নেওয়ার অন্যতম বাধা হলো মাহরামের সঙ্গে বংশগত রক্তের সম্পর্ক থাকা। সুতরাং নিজের সন্তান বা তার নিচের বংশধর এবং মা-বাবা অথবা তাদের ওপরের বংশধরদের যা হেবা করা হয়, তা কোনোভাবেই ফেরত নেওয়া যাবে না।’
২. সন্তানকে ‘ত্যাজ্যপুত্র’ করা এবং মিরাস থেকে বঞ্চিত করার শরয়ি বিধান
আমাদের সমাজে সন্তান অবাধ্য হলে তাকে মুখে বা এফিডেভিট করে ‘ত্যাজ্যপুত্র’ করার যে প্রথা রয়েছে, ইসলামি শরিয়তে তার কোনো ভিত্তি নেই। কোনো বাবা তার জন্মদাতা সন্তানকে ত্যাজ্য ঘোষণা করলেই রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন হয় না এবং সে উত্তরাধিকার (মিরাস) থেকেও বঞ্চিত হয় না। ইসলামে কোনো ওয়ারিসকে অন্যায়ভাবে সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও কবিরা গুনাহ।
মিরাস থেকে বঞ্চিত করার পরিণতি
হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন—
مَنْ فَرَّ مِنْ مِيرَاثِ وَارِثِهِ، قَطَعَ اللَّهُ مِيرَاثَهُ مِنَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
‘যে ব্যক্তি তার ওয়ারিসকে তার প্রাপ্য মিরাস বা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তাকে জান্নাতের মিরাস থেকে বঞ্চিত করবেন।’ (ইবনে মাজাহ ২৭০৩)
জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টন ও মালিকানার নিয়ম
জীবিত ও সুস্থ থাকা অবস্থায় একজন ব্যক্তি তার সম্পত্তির পূর্ণ মালিক থাকে। তাফসিরুল বায়জাবিতে এসেছে—
والمالك هو المتصرف فى الأعيان المملوكة كيف شاء
‘মালিক তার মালিকানাধীন বস্তুতে যেভাবে ইচ্ছা হস্তক্ষেপ করতে পারে।’
তাই কোনো বাবা যদি জীবদ্দশায় নিজ সমুদয় সম্পত্তি কাউকে লিখে দিয়ে হস্তান্তর করে দেন, তবে আইনিভাবে সেটি কার্যকর হয়ে যাবে এবং মৃত্যুর পর অন্য ওয়ারিসরা তা থেকে বঞ্চিত হবে। তবে অন্য সন্তানদের ঠকানো বা বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে এমন অন্যায় বণ্টন করলে কাজটি কার্যকর হলেও আখেরাতে সেই বাবাকে আল্লাহর দরবারে চরম গুনাহগার ও জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে।
আত্মসংযম ও সচেতনতার আহ্বান
অভিভাবকদের উচিত ক্ষোভের বশে ত্যাজ্যপুত্র করার মতো অবাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে অথবা একবার হেবা করার পর তা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা না করে ধৈর্য ও হেকমতের সঙ্গে সমস্যার সমাধান করা। সন্তান অবাধ্য হলেও তার জন্য হেদায়াতের দোয়া করা এবং মৃত্যুর আগে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সুষম পন্থায় ধন-সম্পদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়াই একজন ইমানদারের বৈশিষ্ট্য।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের পারিবারিক জীবনে শরিয়তের সঠিক সীমারেখা মেনে চলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

